বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পার করে ভারতে ঢোকার সময়ে বিএসএফের গুলিতে জখম হওয়ার ঘটনা আগেও ঘটেছে। কিন্তু এ বার দুই ভারতীয় গ্রামবাসীকে গুলিতে জখম করে, বাংলাদেশি বলে দাবি করে সীমান্তের ও পারে ফেলে আসার অভিযোগ উঠল বিএসএফের বিরুদ্ধে। আহত দুই ভারতীয় নাগরিক আপাতত বাংলাদেশের রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কী ভাবে তাঁরা দেশে ফিরবেন, তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় দুই পরিবার।
অসম পুলিশ সূত্রের খবর, ওই দুই ব্যক্তি হলেন দক্ষিণ শালমারা-মানকাচর জেলার সুখচরের বড়বালু গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন (৩৫) এবং দেওয়ানের আলগা গ্রামের আব্দুল আলিম মণ্ডল (৩৯)। ইসমাইল ও আব্দুলের পরিবার সূত্রের খবর, রবিবার বিকেলে চরতে যাওয়া গরু ফেরত আনতে গিয়েছিলেন তাঁরা। অভিযোগ, সুখচর সীমান্ত এলাকায় বিএসএফ তাঁদের আটক করে ট্রলারে উঠিয়ে, সুখচরেরই শালাপাড়া এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করে। সেখানে একটি চরে নামিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের। সেই সময়ে তাঁরা বিএসএফের ট্রলারে উঠতে গেলে বিএসএফ তাঁদের লক্ষ্য করে ছররা গুলি ও ককটেল বোমা ছোড়ে বলে অভিযোগ। এক জনের হাতে, অন্য জনের পাঁজরে গুলি লাগে। জখম অবস্থায় বাংলাদেশের আইরমারি চর থেকে ইসমাইল ও আব্দুলকে উদ্ধার করেন সেখানকার জেলেরা।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আহতদের দাবি, তাঁরা সীমান্ত এলাকায় গরু নিয়ে ফেরার সময়ে বিএসএফের সামনে পড়েন। বাংলাদেশি নাগরিক সন্দেহে বিএসএফ তাঁদের লক্ষ্য করে ককটেল বোমা ও শটগানের গুলি ছোড়ে এবং বাংলাদেশের চর এলাকায় ফেলে যায়। পুলিশি পাহারায় দুই ভারতীয়কে হাসপাতালের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ ওই দু’জনের বিরুদ্ধে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে। তাঁরা সুস্থ হওয়ার পরে ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্ত করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে কুড়িগ্রাম সীমান্তের বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহাবুবউল হক জানান, সীমান্তেগুলিচালনার কোনও তথ্য তাঁদের কাছে নেই।
ঘটনাচক্রে, রংপুরের রেডিয়ো ক্লাবের সদস্যেরা প্রথমে কলকাতায় পশ্চিমবঙ্গ রেডিয়ো ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাসের কাছে সুখচরের বাসিন্দা দুই ব্যক্তির গুলিতে আহত হওয়ার খবর জানান। অম্বরীশ বলেন, ‘‘আমরা অসমের সুখচরের সদস্যদের মাধ্যমে ইসমাইল ও আব্দুলের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ওখানকার পুলিশের সঙ্গে কথাও বলেছি। কী ভাবে ওই দু’জনকে দেশে ফেরানো যায়, তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে।’’
রংপুরের রেডিয়ো ক্লাবের সদস্য জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘‘দুই ভারতীয় ব্যক্তির এখানে চিকিৎসা চলছে। শারীরিক ভাবে তাঁরা খুব দুর্বল হয়ে পড়েছেন।’’
ইসমাইল হোসেনের ভাই আসমত আলি জানিয়েছেন, বিষয়টি নিয়ে তারা সুখচর থানার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। চলতি সপ্তাহে দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে ফ্ল্যাগ মিটিং হতে পারে এবং সেখানেই আহত দুই ভারতীয় নাগরিককে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে বলে তাঁদের কাছে খবর। দক্ষিণ শালমারা-মানকাচর জেলার এসপি রেণুকুন্তলা শীতল কুমার অবশ্য জানান, বিষয়টি নিয়ে এখনও কথা সে ভাবে এগোয়নি। তাঁরা সব দিক পর্যালোচনা করছেন।
দুই পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় বিএসএফের তৎপরতা বেড়েছে এবং গবাদিপশু পালনকারী ও স্থানীয় গ্রামবাসীদের তাড়া করা ও বোমা ছুড়ে ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটছে।
সারা অসম সংখ্যালঘু ছাত্র সংগঠনের সভাপতি এমতিয়াজ হুসেন এই ঘটনার নিন্দা করে বলেন, ‘‘অসমে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কথায়-কথায় বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া,দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ বার এক ধাপ এগিয়ে, সীমান্ত এলাকার ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশি সন্দেহে গুলি করা হল এবং পরে তাঁদের মরার জন্যবাংলাদেশে ফেলে আসা হল। এই ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও দায়ী বিএসএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। ভুক্তভোগীদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং অবিলম্বে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হবে।’’
এ বিষয়ে গুয়াহাটি ফ্রন্টিয়ার বিএসএফের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁরা কোনও মন্তব্য করেননি। বিএসএফের ডিজি প্রবীণ কুমারের কাছে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হলেও জবাব মেলেনি।