E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

টাকা ফেরত চাইলে হুমকি মিলছে বাস্তুছাড়া ছাত্রদের

ব্যক্তি নাম নিষ্প্রয়োজন। ছবিটি কম-বেশি প্রযোজ্য বিহারের ঈশিতা থেকে মুসকান কিংবা মণিপুরের অক্ষিতা— প্রায় সকলেরই জন্য। সত্য নিকেতনের ভেঙে পড়া ‘হস্টেল ডেজ়’ বাড়িটির আশেপাশের হস্টেলগুলির সামনে সকাল থেকে মাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় পড়ুয়ারা।

অনমিত্র সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৫:৪১
এমসিডির নোটিসের পরে সত্য নিকেতনের আশপাশে থাকা বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছেন পড়ুয়ারা। মঙ্গলবার।

এমসিডির নোটিসের পরে সত্য নিকেতনের আশপাশে থাকা বাড়ি ছেড়ে যাচ্ছেন পড়ুয়ারা। মঙ্গলবার। ছবি: পিটিআই।

আতঙ্কের অন্য নাম এখন সত্য নিকেতন!

সকাল থেকেই শুরু গোছগাছ! হাতের কাছে পাওয়া ট্রলি ব্যাগ, সুটকেস, পলিথিনের বড় প্যাকেট ফুলে উঠছে বাসনকোসনে, জামাকাপড়, বইপত্র, বিছানার চাদরে! কোনও ভাবে সেগুলিকে টানতে টানতে সরু সিঁড়ি বেয়ে নীচে নিয়ে আসা। হঠাৎ মনে পড়ল শংসাপত্র ভর্তি ফোল্ডারটাই আনা হয়নি। দুদ্দাড় দৌড় ফের পতনোন্মুখ বাড়ির উপরের তলায়। হারানিধি পেয়ে হাসিমুখে নীচে নেমে আসা। গাছের ছায়ায় বসেই স্বেচ্ছাসেবকদের বিলি করা জলের বোতল গলায় ঢেলেই, নীচে রেখে যাওয়া মালপত্র আড়চোখেই মিলিয়ে নিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস।

এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি নাম নিষ্প্রয়োজন। ছবিটি কম-বেশি প্রযোজ্য বিহারের ঈশিতা থেকে মুসকান কিংবা মণিপুরের অক্ষিতা— প্রায় সকলেরই জন্য। সত্য নিকেতনের ভেঙে পড়া ‘হস্টেল ডেজ়’ বাড়িটির আশেপাশের হস্টেলগুলির সামনে সকাল থেকে মাল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় পড়ুয়ারা। যাঁরা এত দিন নিরাপদ ভেবে থাকছিলেন, তাঁরাই এখন যত দ্রুত পালাতে পারলে বাঁচেন।

‘হস্টেল ডেজ়’-এর ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজে গত কাল সন্ধ্যায় সরকারি ভাবে ক্ষান্ত দিয়েছে জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ)। কিন্তু ওই এলাকায় বাড়িগুলি একটির সঙ্গে অন্যটি লাগোয়া হওয়ায় ‘হস্টেল ডেজ়’ বাড়িটির বেসমেন্টে খোঁড়ার কাজ বন্ধ রেখেছেন কর্তৃপক্ষ। যার নীচে একাধিক ব্যক্তির মৃতদেহ পাওয়ার সম্ভাবনা এখনও রয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে আজ সকালে ‘হস্টেল ডেজ়’-এর লাগোয়া জরাগ্রস্ত পাঁচতলা বাড়িটির ভবিতব্য নির্ধারণ করে দিয়ে গিয়েছে পুরসভা। জানানো হয়েছে, মহিলাদের ওই হস্টেলটি আজ রাতের মধ্যেই ভাঙা শুরু হতে পারে।

দিল্লিতে আসার পরে যে দেশলাই খোপের কামরায় অস্থায়ী সংসার পেতেছিলেন মুসকানেরা, সেই সব গুটিয়ে নিয়ে বাড়ি ছাড়ছেন আবাসিকেরা। পটনার বাসিন্দা স্নাতক স্তরের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী বন্দনার কথায়, ‘‘বিকেলে বাড়ি ভাঙা হবে শুনছি। তাই সকলেই মালপত্র নিয়ে নেমে এসেছে। তা ছাড়া বাড়ির লোকও চিন্তিত। ওঁরা চাইছেন অন্যত্র যাতে চলে যাই।’’ আপাতত ওই এলাকার এক বন্ধুর হস্টেলে থাকবেন বন্দনা। তার পরে অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। ‘হস্টেল ডেজ়’-এর ভেঙে পড়া ও সংলগ্ন মহিলা হস্টেলটির ভাঙার সিদ্ধান্তে অনাগত বিপদের আশঙ্কায় অন্য হস্টেলগুলি ছেড়েও মালপত্র নিয়ে পথে পড়ুয়ারা। সাতনার রাহুল থাকেন ‘হস্টেল ডেজ়’ থেকে তিন-চারটি বাড়ির পরে। তাঁদের হস্টেলটির যা দশা, তাতে তাঁরাও আর ভরসা পাচ্ছেন না। তাই দুপুরের মধ্যে হস্টেল খালি করে নীচে নেমে এসেছেন তাঁরাও। তাঁরও গন্তব্যবন্ধুর হস্টেল।

সব মিলিয়ে সত্য নিকেতনের ‘হস্টেল ডেজ়’ সংলগ্ন ছাত্রাবাসগুলি এখন ভাঙা হাট। বিদেশ-বিভূঁইয়ে আসা পড়ুয়াদের যখন এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়তে হচ্ছে, তখন তাঁদের সঙ্গে অসহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে হস্টেল মালিকদের বিরুদ্ধে। অধিকাংশ পিজি মালিক বাড়ি ভাড়া বাবদ নেওয়া দু’মাসের ‘সিকিয়োরিটি ডিপোজ়িট’ ফেরত দিতে অস্বীকার করেছেন। হিসারের বাসিন্দা কৌশলেন্দ্র কুমার বলেন, ‘‘জমা টাকা তো দূর, কেন চুক্তি শেষের আগে হস্টেল খালি করছি, তার জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন অনেক মালিক। নেহাত সংবাদমাধ্যম ও জনতার ভিড় আছে বলে আমাদের আটকাতে পারেনি। না হলে লোক লাগিয়ে টাকা আদায় করত। টাকা ফেরত চাইলে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেও কোনওলাভ হবে না।’’

এ দিকে, মাঝ বছরে নতুন হস্টেলে থাকতে গেলে ফের ডিপোজ়িটের নামে এক কাঁড়ি অতিরিক্ত টাকা গুনতে হবে পড়ুয়াদের। যা পরোক্ষে আর্থিক চাপ বাড়াবে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পড়ুয়াদের পরিবারের উপরে। উপরন্তু কোথায় মাথা গুঁজবেন, তা কলেজ থেকে কত দূরে হবে, দূরে হলে যাতায়াতের বাড়তি খরচ— এ সব প্রশ্ন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ঘরছাড়াদের। পড়ুয়াদের চরম অব্যবস্থা নিয়ে সরব হয়েছেন আম আদমি পার্টির স্থানীয় নেতা বিশাল যাদব। তাঁর কথায়, ‘‘কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিজেপি-আরএসএসের সদর দফতর তৈরি হয়েছে দিল্লিতে। নর্থ ব্লক, সাউথ ব্লক, শাস্ত্রী ভবনের মতো সরকারি দফতর ভাল অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও জনগণের টাকায় কর্তব্য ভবন বানানো হয়েছে। আজই গুজরাতের নবসারিতে বিজেপির ঝাঁ-চকচকে একটি দফতরে উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী। দিল্লিতে দু’লক্ষ পড়ুয়া রয়েছেন বিভিন্ন কলেজে। হস্টেলের সুযোগ পান খুব বেশি হলে ৮-১০ হাজার জন। সরকারি ভবনের টাকায় কি পড়ুয়াদের হস্টেল বানানো যেত না?’’ বাড়ি ভাঙা নিয়ে হইচই শুরু হওয়ায় সত্য নিকেতনের বেশ কিছু হস্টেল তাদের বাড়ির সামনে থাকা হস্টেলের নামে ব্যানার খুলে রেখেছে। পড়ুয়াদের কথায়, ‘‘এক মাস যেতেই ফের আগের পরিস্থিতিফিরে আসবে।’’

আজ একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে তারা সারা দেশে পড়ুয়াদের থাকার স্থানের নিরাপত্তার বিষয়টি খতিয়ে দেখবে। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর মামলাটির শুনানি। আজ সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত অ্যামিকাস কিউরি তথা আইনজীবী অজিতকুমার সিংহ সত্য নিকেতন ভবন ধসে পড়া নিয়ে একটি রিপোর্ট জমা দেন শীর্ষ আদালতে। কোর্টের পর্যবেক্ষণ, অবৈধ নির্মাণ এবং নিরাপত্তা লঙ্ঘনের বৃহত্তর সমস্যাটি জাতীয় পর্যায়ে বিবেচনা হওয়া উচিত। প্রয়োজনে বিষয়টি দিল্লি হাই কোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্টে স্থানান্তর করা হতে পারে।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Delhi threat

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy