বুধবার সকালে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদন নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলল নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাকে। সেই সঙ্গে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানের অন্দরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশীর তোলা অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ বিতর্কের ঝড় তুলল দেশের রাজনীতিতে। যদিও প্রত্যাশামতোই সমস্ত অভিযোগ খারিজ করে নিজেদের অপাপবিদ্ধ বলে দাবি জ্ঞানেশের কমিশনের।
বেআইনি ভাবে নিয়োগ, পক্ষপাতদুষ্টতা, বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) সংক্রান্ত অনিয়ম, অসদাচরণ-সহ সাত দফা অভিযোগ তুলে ছ’মাস আগেই জ্ঞানেশকে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে সরানোর জন্য সংসদে প্রস্তাব এনেছিল ঐক্যবদ্ধ বিরোধী শিবির। কিন্তু গত এপ্রিলে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সিপি রাধাকৃষ্ণণ তা খারিজ করে দিয়েছিলেন। বুধবার নির্বাচন কমিশনের অন্দরের কলহ প্রকাশ্যে আসার পরেই নতুন করে সুর চড়িয়েছে কংগ্রেস, তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি, বামেরা। সকলেই জ্ঞানেশের ইস্তফা দাবি করেছে। এক ধাপ এগিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের গ্রেফতারি এবং নতুন করে ভোটের দাবি করেছেন তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও আম আদমি পার্টির প্রধান কেজরীওয়াল।
প্রতিবেদন অনুসারে, গত ১০ মাসে ১৪ বার কমিশনের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার সঁধু এবং জোশী। কমিশনের একটি সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশিকা নিয়ে এক দিনেই চার বার আপত্তি জানিয়েছেন তাঁরা! কিন্তু কোনও বারেই তাঁদের আপত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। দুই কমিশনারের বক্তব্য, এসআইআর প্রক্রিয়ায় তাঁদের অন্ধকারে রেখে ভোটার তালিকায় নতুন নাম সংযোজন এবং বাদ দেওয়ার কাজ হয়েছে। নতুন ভোটারদের নাম যুক্ত করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের একটি সিদ্ধান্তকে ‘অবৈধ এবং অননুমোদিত’ বলে দাবি করেছেন দুই নির্বাচন কমিশনার। মূলত ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা রক্ষা, এসআইআর-এর পর ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং যুক্ত করা সংক্রান্ত একাধিক বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন সঁধু এবং জোশী। প্রতিবেদনের এক অংশে বলা হয়েছে, সঁধু অভিযোগ করেছেন যে, দুই কমিশনারের লিখিত প্রস্তাবের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচন কমিশন ‘অবৈধ’ পদক্ষেপ করছে।
বিরোধীদের ৭, সঁধু-জোশীর ৪
গত মার্চ মাসে ১৯৩ জন বিরোধী সাংসদ (লোকসভার ১৩০ জন এবং রাজ্যসভার ৬৩ জন) জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে সাত দফা অভিযোগ তুলে অপসারণের নোটিস স্বাক্ষর করে জমা দিয়েছিলেন। সেই অভিযোগগুলি হল— ১. জ্ঞানেশের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে ২. তিনি পক্ষপাত ও বৈষম্য করছেন ৩. নির্বাচনী প্রতারণার তদন্তে বাধা দিয়েছেন ৪. বিহারে এসআইআর-এ বহু মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে ৫. সেই বিহার মডেল পশ্চিমবঙ্গ-সহ গোটা দেশে পক্ষপাতদুষ্ট ভাবে প্রয়োগ হচ্ছে ৬. সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য করছেন ৭. কমিশনের স্বাধীনতা রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে তিনি শাসকের অঙ্গুলিহেলনে কাজ করছেন।
ঘটনাচক্রে, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুই নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে মূল যে চারটি অভিযোগ নিয়ে সরব হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে, তার সঙ্গে বিরোধীদের তোলা অভিযোগের প্রভূত মিল রয়েছে। চারটি অভিযোগ হল—
১. একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ— সঁধু এবং জোশীর অভিযোগ, তাঁদের অজান্তে বা সম্মতি ছাড়াই প্রধান নির্বাচন কমিশনার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নির্দেশিকা জারি করেছেন। ২০২৩ সালের আইন অনুযায়ী কমিশনের সমস্ত কাজ সর্বসম্মতিক্রমে হওয়া উচিত হলেও, অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের না জানিয়েই ফাইল পাস করা হয়েছে।
২. ভোটার তালিকায় বেআইনি বদল (৬ নম্বর ফর্ম সংক্রান্ত বিতর্ক)— নতুন ভোটার নিবন্ধনের আবেদনপত্র বা ‘ফর্ম ৬’-তে দুই কমিশনারের সম্মতি ছাড়া বেআইনি ভাবে একটি নতুন প্রশ্ন যুক্ত করা হয়। নতুন আবেদনকারীদের কাছে জানতে চাওয়া হচ্ছিল যে, তাঁদের বা তাঁদের বাবা-ঠাকুরদার নাম পূর্ববর্তী এসআইআর-এর সময় ভোটার তালিকায় ছিল কি না। নির্বাচন কমিশনার সঁধু একে ‘অননুমোদিত এবং বেআইনি’ বলে অভিহিত করেন এবং এটি প্রত্যাহারের দাবি জানান।
৩. ভোটার ডেটাবেসের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ— কমিশনের আইটি (তথ্যপ্রযুক্তি) বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল (তথা ন্যাশনাল ইনফরমেটিক্স সেন্টার বা এনআইসি-র ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল) সীমা খন্নার মাধ্যমে ভোটার তালিকার ডিজিটাল ডেটাবেসের উপর একক নিয়ন্ত্রণ বা কেন্দ্রীয়করণ করার চেষ্টা নিয়ে আপত্তি তোলেন সঁধু-জোশী। তাঁদের অভিযোগ, এর ফলে নিচুতলার নির্বাচনী আধিকারিকদের (ইআরও) ক্ষমতা খর্ব হচ্ছে এবং কেন্দ্রীয় সফ্টওয়্যার ব্যবস্থার মাধ্যমে যোগ্য ভোটারদের নাম বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এমনকি আইনত মুখ্য নির্বাচন কমিশনের সমান ক্ষমতাপ্রাপ্ত দুই নির্বাচন কমিশনারের কাছেও সব ডেটাব্যাঙ্কের ‘অ্যাক্সেস’ (প্রবেশাধিকার) ছিল না বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ইঙ্গিত!
৪. ভোটার তালিকার অনিয়ম— নতুন নাম অন্তর্ভুক্তি এবং ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম, এসআইআরের মাধ্যমে দেশে ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ এমনকি, গোয়ায় সফটওয়্যার সংক্রান্ত ত্রুটির কারণে সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও ৯৭ জন যোগ্য নাগরিকের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে সঁধু ও জোশীর সঙ্গে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের মতবিরোধ হয়েছে।
এমনিতে প্রতিটি নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটার তালিকা তৈরি এবং সংরক্ষণের কাজের দায়িত্ব থাকে নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-দের কাছে। আগে ‘ইআরওনেট’ সফ্টওয়্যারে ভোটার তালিকা থাকত। এখন তা থাকে ‘ইসিআইনেট’-এ। ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন এবং বাদ দেওয়ার কাজে ইআরও-দের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে একাধিক বার প্রশ্ন তুলেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার। অগস্টে দেশের অন্যতম নির্বাচন কমিশনার সঁধু জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী আধিকারিকদের ‘ইআরওনেট’ পোর্টালে ঢোকার অধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সীমা খন্নার ভূমিকা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সঁধু বলেন, “আইন অনুযায়ী তিনি এটি (পোর্টাল) নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।”
জ্ঞানেশের গ্রেফতারি, নতুন ভোট চান মমতা-কেজরী
বুধবার ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আসার পরেই নির্বাচন কমিশন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়েছে বিরোধী দলগুলি। তাতে শামিল হয়েছেন তৃণমূলনেত্রী মমতাও। কমিশনের বিরুদ্ধে ফের ‘এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটচুরি এবং ইভিএম হাইজ্যাক’-এর অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেফতারি চেয়েছেন মমতা। এর পাশাপাশি সম্প্রতি হওয়া সমস্ত নির্বাচন বাতিল করে পুরনো ভোটার তালিকায় নতুন করে ভোটের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
আগাম ঘোষণা করে বুধবার বিকেল ৪টেয় ফেসবুক লাইভ করেন মমতা। সেখানেই তিনি ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর ওই প্রতিবেদনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “এত বড় দুর্নীতি জীবনে দেখিনি। নৈতিকতার দিক থেকে ওঁর (জ্ঞানেশ) পদে থাকার অধিকার নেই।” তার পরেই সুর চড়িয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমার প্রথম দাবি, জ্ঞানেশ কুমারকে গ্রেফতার করতে হবে। ওঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা শুরু করতে হবে। সরকারের তরফে যারা মদতদাতা, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে।” পরেই নিজের দ্বিতীয় দাবির কথা জানান মমতা। বলেন, “অনেকের নাম বাদ দিয়েছে। পুরনো ভোটার তালিকা ফিরিয়ে দিতে হবে। এসআইআর-এর নামে দখল করে, ইভিএম মেশিন দখল এবং হাইজ্যাক করে জ্ঞানেশ কুমার যে যে রাজ্যে জিতেছে, সেই সমস্ত রাজ্যে পুরনো ভোটার তালিকায় পুনরায় নির্বাচন করাতে হবে।” মমতার সুরেই জ্ঞানেশকে গ্রেফতার করার দাবি জানিয়ে তিনি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার থাকাকালীন হওয়া সমস্ত নির্বাচন বাতিল করে পুনর্ভোটের দাবি জানিয়েছেন আপ প্রধান কেজরীবালও।
মমতা তৃণমূলের দাবি, অভিষেক গত ডিসেম্বরেই সীমার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ২৭ ডিসেম্বর একটি সাংবাদিক বৈঠকে অভিষেক বলেছিলেন, “আমার কাছে স্ক্রিনশট রয়েছে। সীমা খন্না নামে একজন মহিলা রয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কী? দিল্লিতে কার নির্দেশে তিনি কাজ করছেন? তাঁর কথোপকথনের সমস্ত স্ক্রিনশট রয়েছে।” দুই নির্বাচন কমিশনার সঁধু এবং জোশী সেই সীমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলায় মমতা তৃণমূলের দাবি, তারা যে অভিযোগ তুলেছিল, তাতেই সিলমোহর পড়ল। মমতা তৃণমূলের সাংসদ মহুয়া মৈত্রের কথায়, “আমরা যথাযথ ভাবে জানতাম, কী ভাবে জ্ঞানেশ কুমার (সীমা) খন্না এবং সফ্টওয়্যারের ব্যাক এন্ডকে ব্যবহার করে তালিকা বিকৃত করেছেন।”
সমাজমাধ্যমে ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদনটি শেয়ার করে মমতা তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, “মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে এখনই বরখাস্ত করা উচিত। একই সঙ্গে আদালতের তত্ত্বাবধানে তদন্ত হওয়া দরকার। একটি রাজনৈতিক দলের সুবিধার জন্য লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।” অভিষেকের সংযোজন, “পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের পর বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-তে থাকা সমস্ত বিরোধী দল এই বিষয়ে উদ্বেগপ্রকাশ করে দেশের প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু সেই সমস্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়নি।” পোস্টের শেষে অভিষেকের প্রশ্ন, “প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ কি এই বিষয়ে পদক্ষেপ করবে?” বিদেশ থেকে শহরে ফিরে জ্ঞানেশকে বিঁধে অভিষেক বলেন, প্রধানমন্ত্রী যাঁকে মনোনীত করেছেন, তিনি যে বিজেপির কথায় কাজ করবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। আজ ঝুলি থেকে বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে। বাংলার অভিশাপ লেগে গিয়েছে। জোর করে বাংলা দখল করতে এসেছিল। গোটা দেশে বিজেপির অবস্থা খুব খারাপ। আগামী দিনে আরও খারাপ হবে।”
বিরোধিতার এক সারিতে রাহুল, উদ্ধব, অখিলেশেরা
মমতার সুরেই বুধবার নির্বাচনী ব্যবস্থায় কারচুপির অভিযোগ তুলে মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু এবং পশ্চিমবঙ্গে ব্যালটে পুনরায় নির্বাচন করানোর দাবি তুলেছেন শিবসেনা (ইউবিটি)-র প্রধান উদ্ধব ঠাকরে। অন্য দিকে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধী লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল সমাজমাধ্যমে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করে লেখেন, “ভোটচুরি ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে হওয়া একটি অপরাধ। এটা আমাদের সংবিধানকেও সরাসরি আক্রমণ। বিজেপি, আরএসএস এবং নির্বাচন কমিশন— যারা এসবের উদ্যোক্তা, তারা বিশ্বাসঘাতকতা করছে।” একই সঙ্গে হুঁশিয়ারির সুরে রাহুল বলেন, “আমি নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচনী আধিকারিকদের পরিষ্কার বলে দিতে চাই যে, আপনারা যা করেছেন, ভুল করেছেন। এটা বিশ্বাসঘাতকতা, দেশদ্রোহিতা। সময় চলে এসেছে। আমরা আপনাদের ধরবই। রক্ষা পাবেন না।”
সমাজবাদী পার্টির সমর্থনে রাজ্যসভায় নির্বাচিত নির্দল সাংসদ এবং প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বলও বিরোধী দলগুলির সুরে জ্ঞানেশের পদত্যাগ এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বন্ধ করার দাবি তুলেছেন। কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সিব্বল বলেন, “এখনও পর্যন্ত (এসআইআর-এ) ১৩ কোটি নাম বাদ গিয়েছে। আমরা প্রতিদিন বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে উত্থাপিত করছি। কিন্তু আদালত আমাদের কথা শুনছে না। নির্বাচন কমিশনের আর বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।” ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র সৌরভ দাসের তোপ— “জ্ঞানেশ কুমার ভারতবাসীর এক নম্বর শত্রু।” ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচির পরে এ বার ‘নির্বাচন কমিশন ঠিক করো’। এমনই এক কর্মসূচির ঘোষণা করতে চলেছে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি। দলের মুখপাত্র সৌরভ দাস বুধবার নিজের এক্স-হ্যান্ডলে লেখেন, ‘‘আমরা আগামিকাল আমাদের আগের সমস্ত কর্মসূচি বাতিল করছি এবং দিল্লিতে একটি বড় সাংবাদিক সম্মেলন করছি। নির্বাচন কমিশন ঠিক করো।’’
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে তামিলনাড়ুর বিধানসভা ভোটে অনিয়মের অভিযোগ তুলে জ্ঞানেশের ইস্তফা চেয়েছেন ডিএমকে প্রধান তথা সে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিনও। আরজেডি প্রধান তথা বিহারের প্রাক্তন উপমুখ্যমন্ত্রী তেজস্বী যাদব বলেন, ‘‘বিহার বা মহারাষ্ট্র, দিল্লি, হরিয়ানা, কিংবা পশ্চিমবঙ্গের যে ফলাফলই নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করুক—বিরোধীরা হারেনি। ওই রাজ্যগুলিতে বিজেপির জয় নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে অপব্যবহার করা হয়েছে। নিজেদের স্বার্থে, মোদীজি এবং অমিত শাহজি সমস্ত নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে তাঁদের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করিয়েছেন। আর এই প্রক্রিয়া এখনও চলছে। এটি বেশ কয়েকটি রাজ্যে চলছে, এবং ইচ্ছামতো তা করা হচ্ছে। দুই নির্বাচন কমিশনারেরও আপত্তি রয়েছে।’’ আগে ভোটগ্রহণ ও গণনার রেকর্ড এবং নথি সংরক্ষণের সময়সীমা এক বছর পর্যন্ত ছিল। তাঁরা সেটি বাতিল করে ৪৫ দিনে কমিয়ে দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে লালুপ্রসাদ-পুত্রের মন্তব্য— ‘‘অর্থাৎ, যখন আর কোনও প্রমাণ অবশিষ্ট থাকবে না, তখন বিরোধীরা কী করতে পারে? যখন তারা আদালতে যাবে, তখন কোনও প্রমাণ থাকবে না, ফলে কোনও লাভও হবে না। এ ভাবেই অত্যন্ত কৌশলে তাঁরা সমস্ত নিয়ম লঙ্ঘনের জন্য কাজ করেছ।’’
তেজস্বী বলেন, ‘‘মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নির্বাচন ও নিয়োগের ক্ষেত্রে, আগে ভারতের প্রধান বিচারপতি প্যানেলের অংশ থাকতেন। এখন, একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ হল, মোদীজি চাইলেই এক জন জ্ঞানেশজিকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে, আরেক জন জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে আসা হতে পারে। বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে একটি অবৈধ নির্বাচন হয়েছে।’’ অন্য দিকে, উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশনকে গণতন্ত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আমরা আশা করি এটি নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রত্যাশা করি যে একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানটি নিরপেক্ষ থাকবে বলে আশা করা হয়, সেটি আর নিরপেক্ষ নেই।’’
এসআইআর স্থগিতের দাবি বামেদের
নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতবিরোধ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরে এসআইআর প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করার দাবি তুলেছে সিপিএম। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন বলেও তাদের দাবি। নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে রাখার যে আইন কেন্দ্রের বিজেপি সরকার এনেছিল, তা বাতিল করে কমিশনার নিয়োগের দায়িত্বে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে ফের যুক্ত করার দাবিও তুলেছে তারা। সিপিএম পলিটব্যুরোর তরফে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘শুধু এসআইআর বা নির্দিষ্ট কোনও নির্বাচনের প্রশ্ন নয় এটা। নির্বাচন কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সততা, গণতান্ত্রিক কার্যপদ্ধতি, নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সর্বজনীন ভোটাধিকার রক্ষা—এই সব বিষয়ই এখন প্রশ্নের মুখে। নির্বাচন কমিশনের উপরে মানুষ আস্থা হারিয়েছেন এবং তার জন্য মুখ্য নির্বাচন কমিশনারই দায়ী। তিনি আর পদে থাকতে পারেন না।’’ আর এক বাম দল সিপিআইএমএল লিবারেশনের বক্তব্য, কমিশনের অভ্যন্তরীণ কলহের ফলে ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে এসআইআর পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ। লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম অবৈধ ভাবে বাদ পড়েছে তালিকা থেকে। তাই সেই ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকার ভিত্তিতে কোনও অবস্থানেই নির্বাচন হতে পারে না।
কী সাফাই কমিশনের?
ঘরে-বাইরে প্রবল বিতর্কের মধ্যেই বুধবার ‘ব্যাখ্যা’ দিয়েছে জ্ঞানেশের নির্বাচন কমিশন। দিল্লির নির্বাচন সদনের তরফে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বিভিন্ন বিষয়ে নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনের বিবৃতিতে যাবতীয় বিতর্কে জল ঢেলে বলা হয়েছে, “কোনও বিষয়ে সদস্যদের মধ্যে ভিন্ন মত থাকা অস্বাভাবিক নয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে এই ধরনের আলোচনা ও মতবিনিময় হয়। শুধু কমিশনের তিন সদস্যই নয়, কমিশনের অন্যান্য আধিকারিকও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারেন।” কমিশনের দাবি, গত ১০ মাসের কিছু অভ্যন্তরীণ নোট বা পর্যবেক্ষণ আলাদা করে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। এই সময়ে কমিশন বহু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্দেশ দিয়েছে এবং প্রায় ৪০টি নতুন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং এসআইআর-ও রয়েছে। তাদের দাবি, গত এক বছরে এই সিদ্ধান্তগুলি কমিশনের ফুল বেঞ্চের (তিন কমিশনারের) সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনের দাবি, কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কমিশনের সদস্যেরা বিভিন্ন মতামত, পরামর্শ বা আপত্তি জানাতে পারেন। এটি কমিশনের স্বাভাবিক কাজের অংশ। এর উদ্দেশ্য হল ভোটারদের অধিকার রক্ষা করা এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও ভাল করা।”
পাল্টা দাবি বিজেপির
জ্ঞানেশের কার্যকলাপ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের অন্দরে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রতিবেদনে দাবি করার পরে বিজেপির বিরুদ্ধে আরও এক বার ভোট চুরির অভিযোগ তুলেছে বিরোধীরা। এর পাল্টা জবাবও দিয়েছে পদ্মশিবির। দলের মুখপাত্র তথা সাংসদ সম্বিত পাত্রের দাবি, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতানৈক্য গণতন্ত্রেরই প্রতিফলন ঘটায়। তিনি বলেন, ‘‘এটা তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের অন্দরে আনুষ্ঠানিক আলোচনার বিষয়। এর থেকে আমরা কী বুঝি? বিজেপি তো সংবাদমাধ্যমে গিয়ে এই বলে কোনও খবর ছড়ায়নি যে, তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এ ধরনের আলোচনা আসলে একটি সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এসআইআর সম্পর্কে কমিশনে ঐকমত্য ছিল।