মূলত পূর্ব ভারতের সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশ একেবারে শূন্যে নামিয়ে আনতে ‘স্মার্ট বর্ডার’ ব্যবস্থা চালু করতে চলেছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। সব ঠিক থাকলে আগামী ১৭-১৮ জুলাই উত্তরবঙ্গ সফরে যেতে পারেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সূত্রের দাবি, সেই সফরে এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত ঘোষণা করতে পারন তিনি।
মোদী সরকার মনে করে গত কয়েক দশকের ধারাবাহিক অনুপ্রবেশের ফলে পাল্টে গিয়েছে পূর্ব ভারতের সীমান্তবর্তী জেলাগুলির জনবিন্যাস। যা খতিয়ে দেখতে ডেমোগ্রাফি মিশনের আওতায় একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। আগামী দিনে যে কোনও মূল্যে অনুপ্রবেশ রুখতে বদ্ধপরিকর কেন্দ্র। অনুপ্রবেশ রোখার মূল শর্ত হল নিশ্ছিদ্র সীমান্ত ব্যবস্থা। পূর্ব ভারতের সীমান্ত যখন অনেকটাই নদী দ্বারা চিহ্নিত, তখন এই পরিস্থিতিতে মানুষ থেকে গরু পারাপার রুখে দিয়ে, সীমান্ত সুরক্ষিত করতে ওই ‘স্মার্ট বর্ডার’ ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হল একটি নিরবচ্ছিন্ন ও বহুস্তরীয় ইলেকট্রনিক নজরদারি পরিকাঠামো গড়ে তোলা। যা প্রথাগত টহলদারির চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী। মূলত দুর্গম, অরক্ষিত ও অনুপ্রবেশ বেশি হয়, এমন নদী সীমান্তে এ ধরনের প্রযুক্তি বেশি ব্যবহৃত হয়। যাকে বলা হয়ে থাকে ‘কম্প্রিহেনসিভ ইন্টিগ্রেটেড বর্ডার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম’ (সিআইবিএমএস)। এই ব্যবস্থায় আধুনিক সেন্সরকে কাজে লাগিয়ে যে কোনও বিপদকে ‘রিয়েল টাইমে’ শনাক্ত করে, তা প্রতিহত করার প্রশ্নে বাহিনীকে সাহায্য করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থায় নজরদারির জন্য রেডার, থার্মাল ইমেজার ছাড়াও সীমান্ত জুড়ে লেজার নির্মিত দেওয়াল থাকবে। অদৃশ্য ওই দেওয়াল পার হওয়ার চেষ্টা হলেই যা বার্তা পাঠিয়ে সতর্ক করে দেবে সংশ্লিষ্ট কম্যান্ড কেন্দ্রকে। ব্যবহার হবে অ্যারোস্ট্যাট বা মানববিহীন বিমান। পঞ্জাবের মতোই পূর্ব সীমান্তে বসানো হবে অ্যান্টি ড্রোন প্রযুক্তি, জ্যামার। আকাশপথে যে কোনও বিপদ রুখতে প্রস্তুত রাখা হবে কিলার ড্রোন। এ ছাড়া সীমান্ত জুড়ে যে কাঁটাতারের বেড়া থাকবে তাতে প্রযুক্তি বসানো থাকবে যা ওই কাঁটাতারের বেড়াতে হওয়া যে কোনও কম্পন, বেড়া কেটে ফেলার বা লাফ দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টাকে চিহ্নিত করতে সক্ষম।
এ ছাড়া জমিতে পাতা থাকবে ফাইবার অপটিক সেন্সর। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক কর্তার ব্যাখ্যা, জম্মু-কাশ্মীর বা পঞ্জাবে সুড়ঙ্গের মাধ্যমে যেমন জঙ্গিরা যাতায়াত করে, তেমনি ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে অস্ত্র-মাদকের চোরাচালান হয়ে থাকে। পূর্ব ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে কিছু স্থানে এ ধরনের সুড়ঙ্গের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। জমিতে পাতা ফাইবার অপটিকাল মাটির নীচে হওয়া যে কোনও গতিবিধি সম্পর্কে নজরদারি দলকে সতর্ক করে দেবে। পরবর্তী ধাপে, যেখানে গতিবিধি হচ্ছে তার নিকটবর্তী ক্যামেরার মাধ্যমে পরিস্থিতি যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবে বাহিনী। গোটা বিষয়টি নজরদারি চালানোর জন্য সীমান্তের নির্দিষ্ট দূরত্ব অন্তর কমান্ড কেন্দ্র গঠন করা ও কুইক রেসপন্স দল মোতায়েন করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রের ব্যাখ্যা, ওই কাজের জন্য সীমান্ত ঘেঁষে জমির প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তৃণমূল সরকার জমি না দেওয়ায় ওই পরিকাঠামোগত কাজ আটকে গিয়েছিল। যা রাজ্যে পালাবদলের পরে ফের শুরু হয়েছে।
ইতিমধ্যেই পাইলট প্রকল্পের অঙ্গ হিসেবে ভারত-পাকিস্তান ও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৭১ কিলোমিটার অংশ ওই প্রযুক্তি বসে গিয়েছে। ওই প্রযুক্তি যেমন অনুপ্রবেশ রুখতে সাহায্য করছে তেমনি বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করে নিচ্ছেন-গোটা ব্যবস্থাটি যথেষ্ট খরচ সাপেক্ষ। স্থল সীমান্তে ওই ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর, জল সীমান্তে ততটা কার্যকর নয়। তা ছাড়া পূর্ব ভারতে টানা বর্ষা, বন্যার মতো পরিবেশগত কারণে ওই প্রযুক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, সারা দিন সীমান্ত জুড়ে ধারাবাহিক নজরদারি সীমান্তের স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যক্তি পরিসরে অধিকারের হস্তক্ষেপ হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেননা বিশেষজ্ঞরা।