প্রথমে ছিল ইন্ডিয়া গেট। তার পরে রাজপথের উপরে থাকা বোট ক্লাব, আর আজ ধর্নাস্থলের মর্যাদা হারাল দিল্লির যন্তর মন্তর। পরিবর্তে সরকার জানিয়েছে, ভবিষ্যতে বিক্ষোভকারীরা রামলীলা ময়দান, বুরাড়ি মাঠ অথবা পূর্ব দিল্লির সিবিডি মাঠে বিক্ষোভ দেখাতে পারবেন। বিরোধীদের মতে, প্রতিবাদের অধিকার কেড়ে নিতেই এই চাল চেলেছে সরকার। সে কারণেই ক্ষমতার প্রাণকেন্দ্র থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে থাকা যন্তর মন্তরের পরিবর্তে বিক্ষোভকারীদের দূরে পাঠানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ হল, আজ ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) নেতৃত্ব যখন যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতির জন্য দিল্লি পুলিশের কাছে গিয়েছিলেন, সে সময়েই যন্তর মন্তরকে ধর্নাস্থল হিসাবে ‘ডিনোটিফাই’ করার সিদ্ধান্ত সামনে আনে প্রশাসন।
লোকপাল ও লোকায়ুক্ত আইনের দাবিতে ২০১১ সালে অণ্ণা হজারের আন্দোলন, ২০১৯ সালের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে আন্দোলন, ২০২৩ সালে মহিলা কুস্তিগিরদের বিক্ষোভ কিংবা হালের জুলাই মাসে নিট প্রশ্ন ফাঁস কেলেঙ্কারি আন্দোলন— নানা সময়েই সরকার-বিরোধী আন্দোলনের সাক্ষী থেকেছে যন্তর মন্তর। সংসদ থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরে যন্তর মন্তরে হওয়া আন্দোলনগুলি যেমন সংবাদমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়ে এসেছে, তেমনই বেশ কিছু আন্দোলন যারপরনাই বিব্রতও করেছে সরকারকে। বিশেষ করে গত ২০ জুলাই প্রশ্ন ফাঁস আন্দোলনে আন্দোলনকারীরা পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সংসদ ভবনের উদ্দেশে এগোনোর পরে বিকল্প ধর্নাস্থল খোঁজার কাজ শুরু করে অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। আজ দিল্লি পুলিশ বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, যন্তর মন্তরের বিকল্প খোঁজার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি দিল্লির তিনটি স্থানকে বেছে নিয়েছে। সেগুলি হল— ১. রামলীলা ময়দান, যা যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ৩.২ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু এখন সেখানে নবরাত্রির উৎসব চলায় এই মুহূর্তে ধর্না-বিক্ষোভ করা সম্ভব নয়। পড়ে থাকছে ২. বুরাড়ি ও ৩. সিবিডি-এলাকার মাঠ। এর মধ্যে বুরাড়ি এলাকাটি যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ২১ কিলোমিটার দূরে। তুলনায় পূর্ব দিল্লি সিবিডি (সেন্ট্রাল বিজনেস ডিস্ট্রিক্ট) মাঠটি কিছুটা কাছে। যন্তর মন্তর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে ওই মাঠটির অবস্থান পূর্ব দিল্লিতে।
স্বাভাবিক ভাবেই এ ভাবে যন্তরমন্তরের ধর্নাস্থলের মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার পিছনে এক দিকে যেমন সরকারের ভীত চেহারা সামনে এসে পড়েছে, তেমনই ওই সিদ্ধান্ত সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদকে লঙ্ঘন করেছে বলে সরব হয়েছেন বিরোধীরা। তাঁদের মতে, সংবিধানের ১৯(১)(খ) ধারায় শান্তিপূর্ণ ভাবে সমাবেশ ও অস্ত্র ছাড়া জড়ো হওয়ার অধিকার রয়েছে প্রত্যেকের। কিন্তু সরকার লাঠি না ভেঙে সাপ মারার কৌশল নিয়ে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে ভবিষ্যতে যে কোন ধর্নার সম্ভাবনাকেই শেষ করে দিতে চেয়েছে বলে মনে করছেন বিরোধীরা। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকের কটাক্ষ, ‘‘আজ মোদী যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিলেন। কাল তিনি গণতন্ত্রকেই তালিকা থেকে বাদ দেবেন। স্বৈরাচারীদের সমস্যা কখনওই প্রতিবাদস্থল ছিল না। মানুষের প্রতিবাদ এদের কাছে সমস্যা।’’
তাৎপর্যপূর্ণ হল, গত শনিবার যন্তর মন্তরে ধর্না দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি সিজেপিকে। তাই আজ ফের অনুমতি চাইতে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় গিয়েছিলেন সিজেপি নেতা সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা। দিল্লি পুলিশের কাছে প্রশাসনের সুবিধা মতো যে কোনও দিনে যন্তর মন্তরে ধর্না দেওয়ার অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়। সিজেপি নেতারা থানায় থাকার সময়েই যন্তর মন্তর সংক্রান্ত ওই বিজ্ঞপ্তি জারি করে দিল্লি পুলিশ। কংগ্রেস নেতা অভিষেক মনু সিঙ্ঘভির মতে, ‘‘ওই সিদ্ধান্ত সরকারি ক্ষমতা অপব্যবহার। যখন যন্তর মন্তর ধর্নাস্থল হিসাবে চিহ্নিত ছিল, তখন সেখানে বসতে দেওয়া হয়নি।’’ এ দিকে আজই শান্তিপূর্ণ ভাবে বিক্ষোভ দেখানোর জন্য যন্তর মন্তরকে বন্ধ করে রাখার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে একটি আবেদন করা হয়েছিল। আগামিকার ওই মামলাটির শুনানি হবে দিল্লি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে। অন্য দিকে আর একটি মামলায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ প্রদর্শনের অনুমতি চেয়ে যুব কংগ্রেস যে আবেদন করেছে, দিল্লি পুলিশের আইনজীবীর আবেদনের ভিত্তিতে সেই মামলাটিরও শুনানি আগামিকাল হবে।