‘গ্রেট নিকোবর প্রকল্পে’র জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং স্থানীয়দের অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কার্যক্রমকে চ্যালেঞ্জ করে কলকাতা হাই কোর্টে আগেই একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছিল। এ বার সেই মামলায় যুক্ত হতে চেয়ে হাই কোর্টের পোর্ট ব্লেয়ার বেঞ্চে আবেদন করল ‘লিটল অ্যান্ড গ্রেট নিকোবর ট্রাইবাল কাউন্সিল’। তবে তাদের এই আবেদনের বিরোধিতা করল কেন্দ্র। প্রশ্ন তুলেছে, এত দিন পর কেন আবেদন করা হচ্ছে? এতে মামলার অগ্রগতিও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে বলে দাবি কেন্দ্রের।
ওই কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বার্নাবাস মঞ্জু-সহ চার জন হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁদের দাবি, জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত চলমান জনস্বার্থ মামলায় পক্ষ হতে চান। কেন এই সিদ্ধান্ত? তাঁদের মতে, নিকোবরি জনজাতি সম্প্রদায় কখনওই জমির রূপ বদলে মত দেয়নি। বন অধিকার আইনের অধীনে জনজাতি সম্প্রদায়ভুক্তদের নিয়ে কখনও কোনও গ্রামসভা ডাকা হয়নি। তাঁরা সবসময় চান, দক্ষিণ-পূর্ব এবং পশ্চিম উপকূলে পৈতৃক জমিতে ফিরে যেতে।
প্রায় ৮১০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কেন্দ্রীয় সরকার গ্রেট নিকোবর প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। ১৬৬ বর্গকিমি জমিতে সুবিশাল প্রকল্প গড়ে উঠবে। গ্রেট নিকোবরে নির্মিত হবে জাহাজের বন্দর, বিমানবন্দর, উপনগরী, বিলাসবহুল শহর, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, পর্যটন কেন্দ্র ইত্যাদি। অর্থাৎ, দ্বীপপুঞ্জের এক বিশাল অংশের চরিত্রগত পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। সম্প্রতি খসড়া নীলনকশায় গ্রেট নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের মেরুদণ্ড হিসেবে পর্যটনকে বর্ণনা করা হয়েছে। আর সেই কথা মাথায় রেখেই দ্বীপপুঞ্জের উন্নতির লক্ষ্যে এই প্রকল্প।
২০১৩ সালের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী, প্রকল্পের জন্য কোনও জমি নিতে হলে ‘সামাজিক প্রভাবের মূল্যায়ন’ ও যাঁদের জমি নেওয়া হবে তাঁদের সম্মতি আবশ্যক। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের সময় স্থানীয় জনজাতি গোষ্ঠীর বক্তব্য শোনা হয়নি বলে দাবি। এ ক্ষেত্রে সামাজিক প্রভাবের মূল্যায়ন করার আগেই স্থানীয় বন ও আদিবাসী উন্নয়ন দফতর প্রকল্পের পক্ষে তাদের সম্মতি জানিয়ে দিয়েছে।
২০২২ সালে ১৮ অগস্ট এই প্রকল্পের জন্য মহকুমা পর্যায়ের কমিটি গঠন এবং জমি হস্তান্তরের বিষয়ে বন অধিকার সনদ দেওয়া হয়েছিল। সেই সনদে বলা হয়েছিল, বন অধিকার আইনের অধীনে প্রকল্পের জন্য বনভূমি ব্যবহারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে। যদি মামলাকারীদের অভিযোগ, ওই সনদ অসত্য। যে গ্রামসভাগুলির কথা বলা হয়েছে সেখানে নিকোবরি সম্প্রদায়ের কোনও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। ফলে প্রস্তাবে সায় দেওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নাধীন। আবেদনকারীদের দাবি, এই প্রকল্প, প্রস্তাব বা জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনও তথ্যই দেওয়া হয়নি ‘লিটল অ্যান্ড গ্রেট নিকোবর ট্রাইবাল কাউন্সিল’ চেয়ারম্যানকে। গ্রামসভাগুলির উদ্দেশ্য কী, তা-ও জানানো হয়নি।
আরও পড়ুন:
বন অধিকার আইন অনুযায়ী, গ্রামসভা থেকে যে দাবিগুলি পাঠানো হয়, তা যাচাইয়ের জন্য মহকুমা পর্যায়ের কমিটির ভূমিকা অপরিসীম। ওই কমিটিই খসড়া প্রস্তুত করে। আবেদনকারীদের অভিযোগ, এই সংক্রান্ত কোনও আইনি নিয়ম মানা হয়নি। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতে ‘ট্রাইবাল কাউন্সিল’ স্থানীয় প্রশাসনকে বেশ কয়েকটি চিঠিও লেখে। তাদের আপত্তির কথাও জানায়।
হাই কোর্টে এই মামলায় হলফনামা দিয়ে কেন্দ্র এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসন জানিয়েছে, যে সনদে আপত্তি জানিয়ে আবেদন করা হয়েছে, সেটা চার বছর পুরনো। মামলা দু’বছর ধরে চলছে। এত দিন পর কেন পক্ষ হতে চেয়ে আবেদন? মামলার পরিধি বাড়ানো ছাড়া আর কোনও উদ্দেশ্য নেই। ‘ট্রাইবাল কাউন্সিল’-এর আবেদন খারিজের আর্জিও জানিয়েছে কেন্দ্র।