কোথাও তাঁর ইস্তফা চেয়ে পথে নেমে চলছে বিক্ষোভ। কোথাও পোড়ানো হচ্ছে তাঁর কুশপুতুল। কেউ আবার পৌঁছে গিয়েছেন তাঁর বসতবাড়িতে। তার ফটকে লেখা হচ্ছে ‘গদ্দার’। সোমবারও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ চেয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলল প্রতিবাদ কর্মসূচি। সুপ্রিম কোর্টে জমা পড়ল পিটিশন। আর এ সবে পালে হাওয়া পেল বিরোধী কংগ্রেস। বুধবার এই ইস্যুতেই বৈঠকে বসছে বিরোধী দলগুলির ‘ইন্ডিয়া’ জোট। তার আগে মঙ্গলবার তাদের প্রস্তুতি ম্যাচ। পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক কী হবে, তা নিয়ে বৈঠকে বসতে চলেছে কংগ্রেসের কার্যকরী সমিতি (সিডব্লিইসি)।
কমিশন প্রসঙ্গে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদন ঘিরে তোলপাড় হচ্ছে জাতীয় রাজনীতি। রিপোর্টে দাবি করা হয়, এসআইআর চলাকালীন দেশের তিন নির্বাচন কমিশনার সর্বসম্মত ভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অনেক সিদ্ধান্তের সঙ্গেই বাকি দু’জন একমত হচ্ছেন না। গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার দুই কমিশনার জ্ঞানেশের সিদ্ধান্তে লিখিত ভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করা হয় ওই রিপোর্টে। কমিশনের অন্দরের এই ‘বিরোধ’ প্রকাশ্যে আসার পর গোটা দেশ তোলপাড়। বিরোধীরা একজোট হয়ে জ্ঞানেশের পদত্যাগ এবং গ্রেফতারির দাবি তুলেছেন। এই পরিস্থিতিতে শনিবারই তিন কমিশনার বৈঠকে বসেন। তাঁদের একত্রে বসার ছবি প্রকাশ করে নির্বাচন সদন।
কিন্তু তার পরেও বিক্ষোভ স্তিমিত হয়নি। জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে গত কয়েক দিন দিল্লি-সহ বিভিন্ন শহরে পথে নামেন কংগ্রেস-সহ অন্যান্য বিরোধী দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা। সোমবারও জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রতিবাদ কর্মসূচি চলে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বিহারের পটনায় প্রতিবাদে নামে বাম দলগুলিও।
জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে সুর চড়িয়েছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-ও। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ইস্তফা না-দিলে আগামী ২ অক্টোবর থেকে আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে তারা। ‘ককরোচদের’ নেতা অভিজিৎ দীপকে জানান, প্রথমে মুম্বই থেকে এই আন্দোলন শুরু হবে। তার পরে দেশের প্রতিটি শহরে এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এই পরিস্থিতি সোমবার আগরার বিজয়নগরে জ্ঞানেশের বাড়ির বাইরে বিক্ষোভ দেখান কংগ্রেসকর্মীরা। বাড়ির বাইরে জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন তাঁরা। বাড়ির মূলফটক এবং বাইরের দেওয়াল কালো কালি দিয়ে স্প্রে করে ‘গদ্দার’ লিখে দেন বিক্ষোভকারীরা।
জ্ঞানেশের বাড়ি
আগরায় জ্ঞানেশের বাড়ির সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি চলাকালীন হিন্দিতে ‘জ্ঞানেশ গদ্দার, জ্ঞানেশ চোর’ স্লোগান স্প্রে করে দেওয়া হয় বাড়ির মূলফটকে। পরে সেই বাড়ির দেওয়াল এবং মূলফটকে কালো কালি দিয়ে ওই লেখা সমাজমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। যুব কংগ্রেসের সমাজমাধ্যম হ্যান্ডলেও সেই ছবি পোস্ট করা হয়। সঙ্গে লেখা হয়, “আগরায় কংগ্রেসকর্মীরা ‘গদ্দার’ জ্ঞানেশের বাড়িতে কালি মাখিয়ে দিয়েছে।” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে জ্ঞানেশের আঁতাঁতের অভিযোগও তুলেছে যুব কংগ্রেস।
বৈঠকে কংগ্রেস
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই জ্ঞানেশের অপসারণ চেয়ে সোচ্চার কংগ্রেস। এই নিয়ে আগামী দিনে তাঁদের পদক্ষেপ কী হবে, কেন্দ্রীয় সরকারের উপরে কী ভাবে চাপ বাড়ানো হবে, তা নিয়ে মঙ্গলবার বৈঠকে বসছে কংগ্রেসের কার্যকরী সমিতি। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে অভিযোগ করেছেন, ভোটার তালিকা তৈরি, নতুন নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য ফর্ম ৬-এ পরিবর্তন এবং কেন্দ্রীয় ভাবে ভোটার তালিকার ডেটাবেস নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কমিশনের ভিতরেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। জ্ঞানেশেকে অপসারণ করতে হবে। কেরলের প্রাক্তন মুখ্যসচিবের দাবি তুলে ধরে তাঁর আরও অভিযোগ, জ্ঞানেশ নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের প্রচার করছেন। বুধবার বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র বৈঠক। সংসদে মুখ্যসচিবকে অপসারণের নোটিস দেওয়ার বিষয়ে ওই বৈঠকে যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ
এসআইআর বিতর্কের আঁচ আবার পৌঁছেছে সর্বোচ্চ আদালতে। রাকেশকুমার সিংহ নামে এক ব্যক্তি সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন দায়ের করে জানতে চেয়েছেন, কোন ক্ষমতাবলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একক ভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। আবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী সমস্ত সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে অথবা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে অন্য দুই কমিশনারের সায় ছাড়াই এসআইআর-সহ বেশ কিছু নির্দেশ জারি করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে এসআইআর প্রক্রিয়াকে ‘আইনবহির্ভূত’ বলে বাতিল ঘোষণার আর্জি জানানো হয়েছে।
কংগ্রেসের মিছিল
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জ্ঞানেশের ইস্তফা চেয়ে পছে নেমেছে কংগ্রেস। হাওড়া ময়দানে কংগ্রেসকর্মীরা বিক্ষোভ দেখান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমারের কুশপুতুল দাহ করা হয় বলে অভিযোগ। পশ্চিম বর্ধমানের জেলাশাসকের দফতরে বিক্ষোভ দেখানো হয়। সোমবারের এই কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায় সেখানে। মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপালে রাজ্য নির্বাচন কমিশন দফতরের উদ্দেশে মিছিলের ডাক দেয়। তা লক্ষ্য করে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে বলে অভিযোগ। সংঘর্ষে এক মহিলা-সহ তিন কংগ্রেস কর্মী আহত হন। রাজ্য কংগ্রেস সভাপতি জিতু পাটোয়ারির ঘোষণা, জ্ঞানেশের অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি জেলায় এই প্রতিবাদ চলবে। রাজস্থানের জয়পুরে সে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গহলৌত এবং প্রদেশ কংগ্রেস প্রধান গোবিন্দ সিংহ বিক্ষোভ দেখিয়ে পুলিশের হাতে আটক হন। একই ছবি বিহার ও ঝাড়খণ্ডেও। পটনায় সিপিআই এবং কয়েকটি বাম সংগঠনের মিছিলে পুলিশ কাদানে গ্যাস ছোড়ে বলে অভিযোগ। বিক্ষোভকারীরা রাজ্যপালের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং এসআইআর বাতিলের দাবি জানান। রাঁচিতে ঝাড়খণ্ড কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকেরা মুখ্য নির্বাচন আধিকারিকের (সিইও) দফতর ঘেরাও করেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং জ্ঞানেশের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয় বলে খবর। দিল্লিতে বিক্ষোভ দেখিয়েছে যুব কংগ্রেস। মহারাষ্ট্রের মুম্বই, নাগপুর, পুণে-সহ ২৬টি জেলায় প্রতিবাদ মিছিল হয়।
কংগ্রেস এবং বিরোধী দলগুলিকে এই ধারাবাহিক আক্রমণের জবাব দিয়েছে বিজেপি। বিজেপি সাংসদ রাজীবপ্রতাপ রুডি বলেন, ‘‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদায় আঘাত হানা কংগ্রেসের পুরোনো অভ্যাস। নির্বাচন কমিশনের সাফল্যকে যখন বিশ্ব স্বীকৃতি দিচ্ছে, তখন কংগ্রেস বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।’’ বিজেপি সাংসদ রবিশঙ্কর প্রসাদ মন্তব্য করেন, নির্বাচনে পরাজয় নিশ্চিত দেখলেই কংগ্রেস এসআইআরের মতো প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে কাঠগড়ায় তোলে।