বিতর্কের আবহে বন্দে মাতরম্ নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করল কংগ্রেস। বুধবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক গোষ্ঠী কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে স্থির হয়েছে, দলীয় কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানে জাতীয় গানের প্রথম দু’টি স্তবকই গাওয়া হবে। দলের তরফে এই সিদ্ধান্তের কারণও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিজেপি অবশ্য এই সিদ্ধান্তকে হাতিয়ার করে কংগ্রেসের দেশপ্রেম এবং দেশের প্রতি আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কংগ্রেসের বক্তব্য, ১৯৩৭ সালে কলকাতায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে মহাত্মা গাঁধী, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু, সর্দার বল্লভভাই পটেল-সহ একাধিক শীর্ষ নেতা বন্দে মাতরম্-এর প্রথম দু’টি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামতও নেওয়া হয়েছিল। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধান পরিষদের শেষ বৈঠকে বন্দে মাতরম্-কে জাতীয় গানের মর্যাদা দেওয়া হয় এবং জনগণমনের সমান সম্মান দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই দলের সমস্ত কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানে বন্দে মাতরম্-এর প্রথম দু’টি স্তবক গাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশ। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কেসি বেণুগোপাল বলেন, “দেশের জাতীয় সঙ্গীত জনগণমন এবং জাতীয় গান বন্দে মাতরম্ কংগ্রেসের কাছে এক আবেগের বিষয়। বিজেপি তা নিয়ে রাজনীতি করছে।”
বিজেপি অবশ্য বন্দে মাতরম্ বিতর্কে ফের কংগ্রেসকে নিশানা করেছে। বুধবার দলের সর্বভারতীয় মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদী বলেন, “কংগ্রেস দাবি করে স্বাধীনতা সংগ্রামে একমাত্র তাদেরই ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে (বন্দে মাতরমের প্রথম দুই স্তবক গাওয়া) তাদের সেই দাবি পুরোপুরি নস্যাৎ হয়ে যায়।” একই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, “কংগ্রেস মনে করে তারা দেশের সংবিধান, সংসদেরও ঊর্ধ্বে।”
বন্দে মাতরম্ বিতর্কের সূত্রপাত হয় শনিবার, স্বাধীনতা দিবসের দিন। দিল্লিতে কংগ্রেস সদর দফতর ইন্দিরা ভবনে জাতীয় গান বন্দে মাতরম্ পরিবেশিত হওয়ার সময় দলীয় কর্মীদের সঙ্গে কথা বলছিলেন সনিয়া। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিয়োয় দেখা যায়, বন্দে মাতরম্ গাইছেন কংগ্রেসের নেতা-কর্মীরা। রয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গাঁধীও। সেই সময়েই কিছু নির্দেশ দিতে দেখা যায় সনিয়াকে। (যদিও এই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম) শনিবারই বিজেপির তরফে দাবি করা হয়েছিল যে, সম্পূর্ণ বন্দে মাতরম্ গান পরিবেশিত হওয়ায় অস্বস্তি বোধ করছিলেন সনিয়া। দেশের সাংস্কৃতিক চেতনা, ঐতিহ্য এবং জাতীয়তাবোধ নিয়ে গাঁধী পরিবারের এই অস্বস্তি কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
রবিবার বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেসকে আরও কোণঠাসা করার কৌশল নেয় বিজেপি। ইতিমধ্যেই নৈহাটির বিজেপি বিধায়ক তথা বন্দে মাতরম্-এর স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পরিবারের সদস্য সুমিত্র চট্টোপাধ্যায় সনিয়াকে চিঠি দিয়েছেন। সম্পূর্ণ বন্দে মাতরম্ গাওয়ায় বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে সুমিত্র চিঠিতে লেখেন, “কংগ্রেস কর্মীরা যখন যুগর্ষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর সৃষ্টি বন্দে মাতরম্-এর পূর্ণাঙ্গ রূপ পরিবেশন করছিলেন, তখন আপনার (সনিয়া) শারীরিক ভাষায় যে দৃশ্যমান অস্বস্তি, বিরক্তি এবং বার বার থামানোর প্রয়াস প্রকাশ পেয়েছে, তা আমাকে গভীর ভাবে মর্মাহত করেছে।” চিঠিতে সনিয়াকে আত্মবিশ্লেষণ করা এবং নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ারও আর্জি জানান সুমিত্র। অন্য দিকে, স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপনের সময়ে কংগ্রেসের সদর দফতরে ঠিক কী ঘটেছিল, তার অনুসন্ধান শুরু করেছে দিল্লি পুলিশ। রবিবারই দিল্লির আইপি এস্টেট থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে সনিয়া এবং রাহুলের বিরুদ্ধে।
যদিও বিজেপির তোলা অভিযোগ শনিবারই অস্বীকার করেছিল কংগ্রেস। তাদের দাবি, বন্দে মাতরম্ সম্পূর্ণই গাওয়া হয়েছে ইন্দিরা ভবনের কর্মসূচিতে। কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশের দাবি, অসুস্থ খড়্গে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। সনিয়া তাঁর জন্য একটি চেয়ার আনতে বলছিলেন।