চার রাজ্যের ২৮টি বিধান পরিষদের আসনের মধ্যে ১৬টিই জিতেছে বিজেপি এবং তার জোটসঙ্গীরা। বিজেপি একাই জিতেছে ১৩টি আসন। কিন্তু তার পরেও অস্বস্তির কাঁটা খচখচ করছে তাদের গলায়। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সদর দফতর নাগপুরের একটি আসন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর লোকসভা কেন্দ্র বারাণসীর দু’টি আসন তারা পুনরুদ্ধার করতে পারেনি।
বিধান পরিষদ অনেকটা রাজ্যসভার মতো। পশ্চিমবঙ্গ-সহ বেশির ভাগ রাজ্যে বিধান পরিষদ নেইও। মোট ২৮টি রাজ্যের মধ্যে রয়েছে মাত্র ৬টিতে। উত্তরপ্রদেশ, বিহার, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা এবং মহারাষ্ট্র। বিধানপরিষদের সদস্য সংখ্যা বিধানসভার সদস্য সংখ্যার এক তৃতীয়াংশের বেশি হবে না। আবার ৪০-এর কমও হবে না। রাজ্যসভার মতোই বিধান পরিষদের সদস্যপদের মেয়াদ ৬ বছর। প্রতি দু’বছর অন্তর এক তৃতীয়াংশ আসনের জন্য ভোট হয়। এক তৃতীয়াংশ সদস্যকে নির্বাচন করেন বিধানসভার সদস্যরা, এক তৃতীয়াংশ নির্বাচিত হন পুরসভা বা পঞ্চায়েতের প্রতিনিধিদের ভোটে, ১২ ভাগে এক ভাগ করে নির্বাচিত করেন শিক্ষক এবং গ্র্যাজুয়েট ভোটদাতারা, বাকি ৬ ভাগের এক ভাগ সদস্যকে মনোনয়ন দেন রাজ্যপাল।
এ দফায় উত্তরপ্রদেশের ১১টি, বিহারে আটটি, মহারাষ্ট্রে পাঁচটি এবং কর্নাটকের চারটি আসনে ভোট হয়েছে। সবই শিক্ষক এবং গ্র্যাজুয়েটদের জন্য নির্দিষ্ট আসনে। শিক্ষক বা স্নাতক হলেই এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অধিকার অর্জন করা যায় না। কমপক্ষে তিন বছর মাধ্যমিক বা তার চেয়ে উঁচু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। স্নাতক হতে হয় অন্তত তিন বছর আগে। ভোট দিতে চাইলে নাম নথিভুক্ত করাতে হয় নির্বাচন কমিশনের কাছে।
ফলে বিধান পরিষদের নির্বাচনে ভোট দেন গোট রাজ্যের ভোটদাতাদের খুবই নগণ্য একটি অংশ। রাজ্যের আমজনতার মনোভাবের কোনও প্রতিফলন এই ভোটে পাওয়া যায়, এমনটা প্রায় কোনও রাজনৈতিক বিশ্লেষকই মনে করেন না। তবু এই ভোটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মর্যাদার প্রশ্ন। আর সেখানেই হোঁচট খেয়েছে বিজেপি, নাগপুর এবং বারাণসীতে হেরে। কংগ্রেসের অবস্থাও ভাল নয়। তারা জিতেছে মাত্র একটি আসনে। ক্ষমতায় থাকা কর্নাটকের চারটি আসনেই হেরেছে। তার পরেও দিনের শেষে মোদীকে খানিক কটাক্ষ করার সুযোগ পাওয়ার শ্লাঘা অনুভব করছে রাহুল গাঁধীর দল।
বুধবার রাতটা অবশ্য ছিল মোদীর। তখনও কংগ্রেস একটা আসনও জেতেনি। জিতবে এমন আশাও ছিল না। মোদী সমাজ মাধ্যমে লেখেন, “চার বড় রাজ্যের ২৮ আসনে বিধান পরিষদ নির্বাচন হল। ব্যালট পেপারেই ভোট হয়েছে। বলুন তো কংগ্রেস কটা আসনে জিতল?” সঙ্গে চোখে আতশকাচ ধরা একটি ‘ইমোজি’ও জুড়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। কেউই তখন খেয়াল করেননি যে, নাগপুরের স্নাতক কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা তখনও বাকি। গভীর রাতে সেই আসন ধরে রাখতে সমর্থ হন কংগ্রেসের অভিজিৎ ওয়াংজারি। বিজেপি প্রার্থী সুধাকরকে হারিয়ে দেন ৩২৭১ ভোটে। তার পরেই বিজেপিকে খোঁচা দিয়ে কংগ্রেস নেতারা পোস্ট করতে থাকেন, ‘বলুন তো নাগপুরে কে জিতল!’
সংঘের সদর দফতর নাগপুরের বিধান পরিষদ আসন পুনরুদ্ধার করতে বিজেপি এ বার উঠেপড়ে লেগেছিল। নাগপুর মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসের নিজের শহর। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নিতিন গডকড়ী ১৯৯০ থেকে ২০১৪ একটানা ২৪ বছর এই আসন থেকে বিধান পরিষদের সদস্য ছিলেন। এ বার দু’জনেই সুধাকরের হয়ে ব্যাপক প্রচার করেছিলেন।
শুধু নাগপুর নয়, মহারাষ্ট্রের পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটিতেই হেরেছে বিজেপি-শিন্দে সেনার শাসক জোট। বিজেপি এবং একনাথ শিন্দের দল পেয়েছে একটি করে আসন। দু’টি আসন জিতেছে শরদ পওয়ারের এনসিপি।
নাগপুরের মতোই ছবি বারাণসীতে। স্নাতক এবং শিক্ষক দুটো আসনই ধরে রেখেছে সমাজবাদী পার্টি। শিক্ষকদের আসনে বুধবারই হেরে গিয়েছিল বিজেপি। স্নাতকদের আসনে ভোটগণনা চলে বৃহস্পতিবার অনেক বেলা পর্যন্ত। বিজেপি প্রার্থী কেদারনাথ সিংহ অবশ্য অনেক আগেই সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে হার স্বীকার করে নেন। লেখেন, “বারাণসী কেন্দ্রের যে সমস্ত বিশিষ্ট স্নাতক ভোটার আমার উপর বিশ্বাস রেখেছেন, আমায় ভোট দিয়েছেন, তাঁদের সকলকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।” আশানুরূপ ফল না-হওয়ার জন্য দুঃখপ্রকাশ করে বিজেপির কর্মী-সমর্থকদেরও ধন্যবাদ জানান। বলেন, ভোটে জেতা কিংবা ক্ষমতার আসনে বসাই শেষ কথা নয়। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাই একজন জনপ্রতিনিধির কর্তব্য।
আরও পড়ুন:
উত্তরপ্রদেশে আগামী বছর বিধানসভা ভোট। তার আগে মোদীর কেন্দ্রে জয়কে বড় করেই দেখাতে চাইছে সমাজবাদী পার্টি। ৬ বছর আগের নির্বাচনে বিজেপির হার তেমন নজর কাড়েনি, কারণ এক বছর আগেই বারাণসীতে বিপুল ব্যবধানে জিতেছিলেন মোদী। গত লোকসভা ভোটে তাঁর জয়ের ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছে। রাজ্যের ৮০টি আসনের মধ্যে ৩৭টিতে জিতে একক বৃহত্তম দল হয়েছে সপা। বিজেপির আসন ৩৩। সব মিলিয়ে রাজ্যে বিধান পরিষদের ভোট বেশ খানিকটা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সপা প্রধান অখিলেশ যাদব সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘বিজেপির অবস্থা খারাপ, বারাণসীতে বিধান পরিষদ ভোটে হেরে ওরা হতাশ। লখনউয়ের লোকেরা আর দিল্লির লোকেদের ফোন ধরছেন না। ঘটনা হল, উত্তরপ্রদেশের বিধান পরিষদের ভোটে বিজেপি একেবারে ধুয়েমুছে গিয়েছে।’’ সেটা অবশ্য সত্যি নয়। রাজ্যের ১১টি আসনের মধ্যে বিজেপি পেয়েছে ছ’টি, সমাজবাদী পার্টি পাঁচটি। কিন্তু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ভোটারেরা বিজেপির প্রতি বিরূপ হচ্ছেন, এমন ইঙ্গিত বিধান পরিষদের ভোট দিয়ে গেল বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের অভিমত। তাঁদের আস্থা ফিরে পাওয়ার জন্য খুব বেশি সময় কিন্তু যোগী আদিত্যনাথের হাতে নেই।
আদিত্যনাথের মতো একই দুশ্চিন্তা ডি কে শিবকুমারের। কর্নাটকে সিদ্দারামাইয়াকে সরিয়ে সবে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেছেন। তার পর প্রথম ভোটেই বড় ধাক্কা। রাজ্যে চারটে আসনেই হেরেছে কংগ্রেস। জনগণ যে তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে, এই ফল তারই নিদর্শন, বলছেন রাজ্য বিজেপি সভাপতি বিওয়াই বিজয়েন্দ্র। রাজ্য বিধানসভা ভোট ২০২৮-এ। তার আগে এনডিএ-র এই জয় পরিষ্কার একটা বার্তা দিল, দাবি বিজেপির জোটসঙ্গী জেডি (এস) নেতা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এইচডি কুমারস্বামীর। নাগপুর নিয়ে উল্লসিত কংগ্রেস নেতারা কর্নাটকে বলছেন, এই ফল সরকারের বিপক্ষে কোনও রায় নয়। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা রাজ্যে একটাও আসনে জিততে না পারাটা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও নয়।