২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশ জুড়ে জনপ্রতিনিধিদের দলবদলের ফায়দা মূলত তুলেছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন এনডিএ-ই। নির্বাচনী নজরদারি সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস’ (এডিআর) এবং ‘ন্যাশনাল ইলেকশন ওয়াচ’-এর প্রকাশিত একটি রিপোর্টে উঠে এসেছে এ কথা। ১৯৮৫-র দলত্যাগবিরোধী আইনকে কার্যত ভোঁতা করে দিয়ে বিরোধীদের ভাঙানোর ক্ষেত্রে রিপোর্টে প্রশ্ন তোলা হয়েছে স্পিকারদের ভূমিকা নিয়েও।
সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, এই চার বছরে নির্বাচন এবং উপ-নির্বাচনে জয়ী ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ৪৮৭৬ জন জনপ্রতিনিধির মধ্যে মোট ১১১ জন দল বদলেছেন। সাত রাজ্যসভা সাংসদ এবং ২২ জন বিধায়ক মিলিয়ে ২৯ জন সরাসরি বিজেপিতে গিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল ছেড়ে নতুন এনসিপিআই-তে যোগ দিয়ে ২০ জন লোকসভা সাংসদ কেন্দ্রে এনডিএকে সমর্থন করেছেন। মহারাষ্ট্রের ছ’জন লোকসভা সাংসদ ও রাজস্থানের দু’জন বিএসপি বিধায়ক গিয়েছেন এনডিএ-র শরিক একনাথ শিন্দের শিবসেনায়।
নাগাল্যান্ডে এনডিপিপি এবং এনসিপি ছেড়ে ৩২ বিধায়ক মিশেছেন এনডিএ-শরিক এনপিএফে। মেঘালয়ে কংগ্রেস ও পিডিএফ-এর ছ’জন বিধায়ক যোগ দিয়েছেন এনডিএ-শরিক এনপিপিতে। অর্থাৎ বিজেপির সঙ্গী এবং এনডিএ-র আঞ্চলিক সহযোগী জোট মিলিয়ে ৯৫ জনই বিজেপি-শিবিরে গিয়েছেন।
কংগ্রেস কোনও সাংসদ খোয়ায়নি। তাদের দলছুট ১৯ বিধায়কের মধ্যে ১৫ জন সরাসরি বিজেপিতে, চার জন মেঘালয়ে এনডিএ-শরিক এনপিপিতে গিয়েছেন। জনপ্রতিনিধিদের দলছুটের হিসেবে এনডিপিপি এবং তৃণমূলের পরেই, তিন নম্বরে কংগ্রেস। আর চার নম্বরে বিআরএস। তাদের তেলঙ্গানার ন’জন বিধায়ক কংগ্রেসে এসেছেন। বিজেপিতে যুক্ত হওয়া সাত রাজ্যসভা সাংসদের সবাই এসেছেন আপ ছেড়ে। তারা যুগ্ম ভাবে পঞ্চম স্থানে আছে নাগাল্যান্ডের এনসিপির সঙ্গে।
১৯৮৫ সালে সংবিধানের দশম তফসিলে আনা হয় দলত্যাগবিরোধী আইন। কিন্তু জনপ্রতিনিধিত্ব ছেড়ে দলবদল করেছেন বা দলবদলের পরে আইনে আটকে জনপ্রতিনিধিত্ব খুইয়ে নতুন করে নির্বাচনে জিতে এসেছেন মাত্র আট জন, যাঁদের মধ্যে ছ’জনই কংগ্রেসত্যাগী। আইনের ফাঁক গলে বেরিয়েছেন ১০৩ জন। নাগাল্যান্ডে আস্ত দলকেই অন্য দলের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে লোকসভার ২০ জন সাংসদ তৃণমূল ছেড়ে নব্যগঠিত এনসিপিআইতে যোগ দিয়ে সমর্থন করেছেন এনডিএ-কে।
দশম তফসিলের অধীনে কোনও জনপ্রতিনিধির অযোগ্যতার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা স্পিকারের হাতে। এবং আদালত এবং স্পিকারের দরবারে বছরের পর বছর সেই প্রক্রিয়া ঝুলে থাকায় আইনি ফাঁকফোকরগুলি এত সহজে ব্যবহার করা যাচ্ছে বলে এডিআরের পর্যবেক্ষণ। দেখা যাচ্ছে, এ ভাবেই ছোট আঞ্চলিক দলগুলি অস্তিত্বের সঙ্কটে পড়ছে। খেলো হয়ে যাচ্ছে সাধারণ ভোটারের রাজনৈতিক রায়। তাদের সুপারিশ, অযোগ্যতার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা স্পিকারের বদলে নির্বাচন কমিশনের পরামর্শ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি অথবা রাজ্যপালকে নিতে দেওয়া হোক। বাধ্যতামূলক করা হোক অযোগ্যতা সংক্রান্ত আবেদনের ছ’মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি। পরবর্তী ভোট পর্যন্ত দলত্যাগীদের রাজ্যসভা, বিধান পরিষদ অথবা পিছনের দরজা দিয়ে পুনর্বাসনের পথ পুরোপুরি বন্ধ হোক।