ভাষা ভিন্ন। জাত, ধর্ম, পোশাক ও সামাজিক শ্রেণি বিবিধ। কিন্তু ক্রোধ একই। যা আজ আছড়ে পড়ল উজ্জ্বল বিপণিতে মোড়া কনট প্লেসে। আর সেই ক্রোধের মুখ, ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দীপকে এবং আইসা নেত্রী নেহা বোরাকে নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হল রাত বাড়তেই। দিল্লি পুলিশ নেহাকে একা গাড়িতে তুলে নিয়ে কোথায় রেখেছে প্রথমে জানায়নি। নেহা এবং দীপকের খবর জানতে যাওয়া প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দেখাও করেনি। যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বার্তা দেন ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের নেতারা। মধ্যরাত পর্যন্ত নেহার খোঁজ না পেয়ে প্রথমে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় যায় আইসা-র প্রতিনিধি দল। কারণ, মান্ডি হাউস ও টলস্টয় মার্গের যে এলাকা থেকে নেহাকে আটক করা হয়েছিল তা পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার এলাকাভুক্ত। পরে আইসা জানায়, নেহাকে প্রায় গোটা দিল্লি ঘোরানোর পরে আর কে পুরম থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পুলিশ অফিসারদের উপস্থিতিতে নেহার আইনজীবী তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পেরেছেন। তবে কেন তাঁকে রাতভর থানায় আটক রাখা হয়েছে তা জানায়নি পুলিশ। আইসা-র তরফে জানানো হয়েছে, যদি নেহাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে গ্রেফতার করা হয় তাহলে সকালে তাঁকে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে পেশ করা হবে।
আজ সকাল থেকে ভগৎ সিংহ, মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী, বাবাসাহেব অম্বেডকরের পোস্টার আর জাতীয় পতাকায় ছয়লাপ ছিল কনট প্লেস। একসঙ্গে বৃহত্তর সমাবেশ করলে গ্রেফতারির সমূহ আশঙ্কা। তাই দুপুরেই সমাজমাধ্যমে একটি পোস্টারে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) সতর্ক করেছিল, ‘‘কনট প্লেসে যান তেরঙা নিয়ে, কিন্তু পাঁচ জনের কম।’’ অথচ তারই মোকাবিলায় তৈরি ছিল শ’য়ে শ’য়ে বাস, হাজারে হাজারে সিআরপি, র্যাফ, দিল্লি পুলিশ বাহিনী!
সেই আবহে ‘জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ’— এই ছোট্ট কথার ফুলকি এসে পড়ল আজ বিকেলের কনট প্লেসে। রাজধানীর এই অভিজাততন্ত্রের ভিতরের বৃত্তপথ, মেট্রো স্টেশনের মুখ, পালিকা বাজারের গেট— উথালপাথাল হল ভীষণ রাগে। সিজেপি-র পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাথমিক ভাবে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে, প্রতিবাদের একাঙ্কে। তারপর খবর এল দীপকে এবং নেহাকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত আবেগে, আগে পিছে পুলিশের ভ্যান নিয়েই, ভিড় ঠেলে নামল ফুটপাথ থেকে রাজপথে। জাতীয় পতাকাকে কোথাও মাথায় রাখা হল। কেউ গায়ে জড়ালেন। গর্জন উঠল, ‘‘জ্ঞানেশ কুমারের এক ঠিকানা / জেলখানা, জেলখানা।’’ এর আগের আন্দোলনে মার খেয়ে পায়ে চোট পেয়েছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পাঠ নেওয়া সুপ্রিয়া পাটিল। পালিকার গেটের সামনে মুহুর্মুহু ধাক্কা সামলে এবং ভিড়ের স্রোতে ভেসে যাওয়ার আগে বললেন, ‘‘মণিপুর জ্বলছে, কিন্তু সেখানে নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহ বাহিনী পাঠাতে পারছেন না, সব রোষ এখানে। একটা সাংবাদিক সম্মেলন করতে ভয় পান। মহিলাদের ক্ষমতায়নের নামে পোস্টার লাগায়, আর এখানে হাজারে হাজারে মহিলা পুলিশ দিয়ে ঘিরেছে আমাদের কণ্ঠ রোধ করতে।”
আজ বিকেলে কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে 'লেহরা দো তিরঙা' কর্মসূচির ডাক দিয়েছিল সিজেপি। তার ঠিক পরেই দিল্লির পুরসভা তালা লাগায় পার্কে। দীপকে গত রাতেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে। আজ তাঁকে এবং মান্ডি হাউসে নেহাকে আগাম আটক করে পুলিশ। পুলিশকর্মীরা যখন শরদ পওয়ার পন্থী এনসিপি-র মুখপাত্র অনীশ গাওয়ান্ডের বাসভবনের বাইরে তাঁর পথ আটকে ঘিরে ধরেন, তখন দীপকে পুলিশকে প্রশ্ন করেন, “আমাকে আটকাচ্ছেন কেন? সম্পূর্ণ একা হেঁটে যাচ্ছি, কোনও ভিড় নেই। এই দেশে তেরঙা ওড়ানো কি অপরাধ? আমরা আনুষ্ঠানিক ভাবে কর্মী-সমর্থকদের ছোট ছোট দলে থাকতে, তেরঙার সঙ্গে একটি সাধারণ ছবি তুলতে এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে চলে যেতে বলেছি। তার পরেও আপনারা আমাদের নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন না।” ধাক্কাধাক্কি করে তাঁকে গাড়িতে তোলা হয়। পাশাপাশি মান্ডি হাউস ও সংলগ্ন টলস্টয় মার্গ এলাকা থেকে যখন নেহা ও অন্যান্যরা কনট প্লেসের দিকে মিছিল নিয়ে এগোচ্ছিলেন, তখনই পুলিশ নেহাকে আটক করে। তিনি যখন স্লোগান দিচ্ছিলেন, মাথা হাত দিয়ে ঠেসে পুলিশের গাড়িতে ঢোকানো হয়।
সিজেপি-র পক্ষ থেকে রাতে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘জাতীয় পতাকা হাতে নেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্ধারিত স্থানের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় অভিজিৎ দীপকেকে আটক করে কর্তৃপক্ষ প্রমাণ করেছেন যে, তাদের আশঙ্কা কোনও বিশৃঙ্খলা নিয়ে নয়; বরং সাধারণ নাগরিকদের হাতে তেরঙার নীরব অথচ অপ্রতিরোধ্য শক্তি নিয়েই। ককরোচ জনতা পার্টি প্রতিজ্ঞা করছে, কোনও শক্তিই নাগরিকদের হৃদয়ে তেরঙার প্রতি ভালোবাসাকে দমন করতে পারবে না, কিংবা নির্বাচনী ন্যায়বিচারের দাবিকে স্তব্ধ করতে পারবে না।’’ আইসার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘‘সিপিআইএমএল-এর সাধারণ সম্পাদক কমরেড দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং আইসা সভাপতি নেহা বোরার এবং অন্য মিছিলরত ছাত্র ছাত্রীদের উপর, যুবা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের উপর নির্মমভাবে পুলিশ আক্রমণ করেছে।’’
এ দিকে, পর পর আন্দোলনে উৎসবের মুখে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে চর্চা শুরু হয়েছে। যদিও আজ সকালেই সমাজমাধ্যম এক্স-এ দীপকে লেখেন, ‘‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয় না। ক্ষতি তখনই হয়, যখন সরকার নিজেই আস্ত শহরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, ইন্টারনেট বন্ধ করে, নিজের দেশের নাগরিকদের স্বাভাবিক গতিবিধিতে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে শহরকে রণক্ষেত্রেপরিণত করে।’’
দীপকের দাবি, গাঁধীজির দেখানো শান্তি ও অহিংসার পথেই চলছে ও চলবে সিজেপি। মুম্বই, পুণে, জয়পুর, লখনউ, বেঙ্গালুরু, নাগপুরে তাঁদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ছিল।
মোদী-বিরোধী হিসেবে পরিচিত ব্লগার ধ্রুব রাঠি সমাজমাধ্যমে জানিয়েছেন, তিনি লন্ডনে পৌঁছেছেন। ভারতের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরা উচিত। তাই আগামিকাল লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কোয়ারে মহাত্মা গাঁধীর মূর্তির কাছে সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়েছে। এ দিনও লন্ডনে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভ দেখায় এসএফআইয়ের ব্রিটেন শাখা।