Advertisement
E-Paper

নয়া নজির! দেশের প্রথম রূপান্তরকামী পিজি চিকিৎসক হলেন রুথ জন পল, যেতে হয়েছিল আদালত পর্যন্ত

ভর্তির নিয়মে স্পষ্ট নির্দেশিকা না-থাকায় দ্বারস্থ হয়েছিলেন আদালতের। অবশেষে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শনিবার দেশের প্রথম রূপান্তরকামী হিসেবে চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে ইতিহাস গড়লেন হায়দরাবাদের কোয়ালা রুথ জন পল।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ১৪:৩৯
চিকিৎসক রুথ জন পল।

চিকিৎসক রুথ জন পল। ছবি: সংগৃহীত।

এক সময় পেট চালানোর জন্য হন্যে হয়ে কাজ খুঁজতে হত। জুটত না দু’বেলার খাবারও। রূপান্তরকামী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর পরিবারও মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু দমে যাননি চিকিৎসক কোয়ালা রুথ জন পল। শুধু যে নিজের লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন তা-ই নয়, চিকিৎসাশাস্ত্রে স্নাতকোত্তরে ভর্তির নিয়মে রূপান্তরকামীদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা না-থাকায় আদালতের দরজাতেও কড়া নেড়েছিলেন তিনি। অবশেষে শনিবার তাঁর সেই দীর্ঘ অধ্যবসায় এক ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁল।

সম্প্রতি প্রকাশিত এমডি/এমএস পরীক্ষার ফলাফলে সব ক’টি বিষয়ে উত্তীর্ণ হয়ে ভারতের প্রথম রূপান্তরকামী ব্যক্তি হিসেবে স্নাতকোত্তর মেডিক্যাল কোর্স সম্পন্ন করার নজির গড়লেন রুথ। ২০২৩-২৬ শিক্ষাবর্ষে হায়দরাবাদের সনৎনগরের ইএসআইসি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে ‘ইমার্জেন্সি মেডিসিন’-এ এই ডিগ্রি লাভ করেছেন তিনি। সাফল্যের পর রুথ বলেন, “আমি ভীষণ আনন্দিত। এটা আমার এবং আমাদের সম্প্রদায়ের জন্য এক পরম গর্বের বিষয়। জীবনের এক বিরাট প্রাপ্তি।”

হারানো শৈশব ও পরিবারের প্রত্যাখ্যান

‘দ্য হিন্দু’র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, খম্মাম জেলার এক দরিদ্র পরিবারের সন্তান রুথ তিন ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। মাত্র আট বছর বয়সে বাবাকে হারান। তার পর মায়ের কাছেই বড় হয়ে ওঠা। নিজের জেলা থেকেই স্কুল ও ইন্টারমিডিয়েট শিক্ষা সম্পন্ন করে নিট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে স্নাতক স্তরের মেডিক্যাল শিক্ষায় ভর্তি হন তিনি। স্নাতক স্তরে পড়ার সময়ই তিনি একজন রূপান্তরকামী নারী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। আর এর জেরে তাঁর পরিবার তাঁকে মেনে নিতে অস্বীকার করে। পরিবারের সঙ্গে প্রায় ছয় বছরের জন্য সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় রুথের।

চরম অভাব ও আইনি লড়াই

পরবর্তী সময়টা কেটেছে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে। রুথের কথায়, “এমন সময়ও গিয়েছে, যখন আমার কাছে খাওয়ার মতো কিছু ছিল না। বেঁচে থাকার জন্য আমাকে রীতিমতো লড়াই করতে হয়েছে এবং কাজের খোঁজ করতে হয়েছে।” ২০২১ সালে ভারতের প্রথম রূপান্তরকামী ক্লিনিক ‘মিত্র ক্লিনিক’ (বর্তমানে ‘সতরঙ্গ ক্লিনিক’)-এ প্রায় দু’বছর কাজ করেন। পাশাপাশি, পিজি প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতিও চালিয়ে যান রুথ।

তবে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও লড়াই শেষ হয়নি তাঁর। স্নাতকোত্তর মেডিক্যালের কাউন্সেলিংয়ের সময় তিনি চরম বাধার মুখে পড়েন। কারণ, রূপান্তরকামী প্রার্থীদের ভর্তির বিষয়ে তখন কোনও স্পষ্ট ‘প্রোটোকল’ ছিল না। এই পরিস্থিতিতে রূপান্তরকামী অধিকার কর্মী বৈজয়ন্তী বসন্ত মোগলির সাহায্য নিয়ে তিনি তেলঙ্গানা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। আইনি লড়াই চলে প্রায় দু’বছর ধরে। অবশেষে হাই কোর্টের এক অন্তর্বর্তিকালীন নির্দেশে তাঁর ভর্তির রাস্তা প্রশস্ত হয়। ২০২৩ সালে সনৎনগরের ইএসআইসি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ইমার্জেন্সি মেডিসিনে আসন পান তিনি।

ভর্তি হওয়ার পর কাজের ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। ইমার্জেন্সি মেডিসিনের ট্রেনি হিসেবে মুমূর্ষু রোগীদের চিকিৎসার করতে গিয়ে তাঁকে রূপান্তরকামী হিসেবে নানাবিধ কুসংস্কারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। রুথ জানান, প্রথমে তাঁকে দেখে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করতেন বা ভয় পেতেন। তিনি বলেন, “প্রথমে কিছু মানুষ ভয় পেত, বুঝতে পারত না কী ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। কিন্তু যখন আমি রোগীদের সঙ্গে কথা বলি এবং যত্ন সহকারে তাঁদের চিকিৎসা করি, তখন তাঁরা আমার প্রশংসা করতে শুরু করেন। যে মানুষেরা প্রথমে সন্দিহান ছিলেন, তাঁরাই এখন আমার সঙ্গে অনেক স্বচ্ছন্দ।”

স্নাতকোত্তর কোর্স সম্পন্ন করার পর রুথ জন পল এখন তাঁর এই শিক্ষাকে মানুষের সেবায় কাজে লাগাতে চান। বিশেষ করে যে সমস্ত রূপান্তরকামী মানুষের জরুরি ও নিবিড় পরিচর্যা প্রয়োজন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই তাঁর মূল লক্ষ্য। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে রুথ বলেন, “আমি সকলের সেবা করতে চাই, বিশেষ করে সেই রূপান্তরকামীদের, যাঁরা গুরুতর চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থার সম্মুখীন হন। লিঙ্গপরিচয় বা যৌনতার ভিত্তিতে কোনও রকম বৈষম্য ছাড়াই আমি চিকিৎসা পরিষেবা দিতে চাই।”

Transgender NEET PG Hyderbad

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy