প্রশ্ন: ছাব্বিশে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে আপনাদের অংশ নিতে দেওয়া হল না। এই ভোট নিয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
শেখ হাসিনা: মুহাম্মদ ইউনূস অবৈধ ভাবে, অগণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা দখলের পর আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করলেন। প্রতিষ্ঠার লগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত ১৩ বার ভোটে লড়েছে আমার দল, ৯ বার জয়ী হয়ে সরকার গড়েছে। আমি এ বারে অনুরোধ করেছিলাম, আমি সাজাপ্রাপ্ত, নিজে দাঁড়াব না, কিন্তু দলকে ভোটে অংশ নিতে দেওয়া হোক। দুর্ভাগ্যবশত কেউ শুনল না। কোনও গণতান্ত্রিক দেশ, আন্তর্জাতিক সংস্থা সরব হল না, শুধু ‘সবাইকে সঙ্গে নিয়ে’ ভোটের দাবি তুলে ছেড়ে দিল। আওয়ামী লীগের ভোটার ৫০ শতাংশেরও বেশি। তাদের ভোট থেকে বঞ্চিত করা হল। অথচ সবাই বাহবা দিয়ে ভোটের ফলাফল মেনে নিলেন। জামাত ৭০টি আসন নিয়ে সংসদে বসল। তা হলে এই গণতান্ত্রিক শক্তিই তো প্রকারান্তরে জামাতের প্রসার ঘটাল। আন্তর্জাতিক সংগঠন যদি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে চাপ দিতে পারত, তা হলে আজ জামাতের এই প্রসার হত না। এখন আর হাহাকার করে লাভ কী!
প্রশ্ন: স্পষ্টতই বাংলাদেশে ভারত বিদ্বেষ বাড়ছে। সোনালি অধ্যায় এখন অতীত। কী বলবেন?
শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগ সরকারের বিদেশ নীতি ছিল স্পষ্ট, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব। শত্রুতা নয়। বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সদ্ভাব তৈরি করে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো। যাতে বাংলাদেশের মানুষের আর্থ সামাজিক বিকাশ ঘটানো যায়। আর মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান আমরা ভুলি না। সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনও বিশেষ রাষ্ট্রের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি হলে, যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করে, তাদের দায়িত্ব থেকেই যায়। তারাই যদি বিদ্বেষ উস্কে দেয়, তা হলে কী হয় ভেবে দেখুন।
প্রশ্ন: বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের খবর ইউনূস সরকারের সময় প্রতিনিয়ত শোনা গিয়েছে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ চোখে পড়ছে। কী ভাবে দেখছেন?
শেখ হাসিনা: শুধু ইউনূসের সময় নয়, এই ঘটনা এখনও নিত্যদিন ঘটছে। শুধু সংবাদ পরিবেশিত হয় না। সংবাদমাধ্যমের সেই স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কিছু দিন আগেই রংপুরে একটি হিন্দু পরিবারের সদস্যদের হত্যা করে মিথ্যা বয়ান দেওয়া হয়েছে। আমাদের সময়ে এই বিদ্বেষ ছিল না। স্লোগান ছিল, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সকলের’। এত সদ্ভাব ছিল যে, ইদের জমায়েতে হিন্দু ভলান্টিয়ার থাকতেন। আবার পুজোয় মুসলমান ভলান্টিয়ার থাকতেন। বিদ্বেষ কেন এত ছড়াল, তার শিকড়ের অনুসন্ধান করলেই তথ্য পাওয়া সম্ভব।
প্রশ্ন: দলকে রাজনীতির মূল স্রোতে ফেরানোর লড়াইয়ের পাশাপাশি কোনও শুদ্ধিকরণের কথা ভাবছেন কি? আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
শেখ হাসিনা: আমাদের দল গণতান্ত্রিক পথে চলে, সব সময়ই শুদ্ধিকরণের মধ্যে থাকে। পর্যালোচনা নিয়মিত ভাবে হয়ে থাকে। এটা নতুন করে বা ঘটা করে করার বিষয় নয়। যে সব দুর্নীতির অভিযোগ মুখে তোলা হচ্ছে, তার ক’টা প্রমাণ করা গিয়েছে? দু’বছরের বেশি হল। এত কথা বলা হল, প্রমাণ করতে পেরেছে কি? আমরা ইউনূসকে ভাল মানুষ বলে জানতাম। ’৯০ সালে তিনি গ্রামীণ ব্যাঙ্কের এমডি হন ৬ হাজার টাকা বেতনে। আজ বিশ্বব্যাপী তাঁর এই বিপুল সম্পত্তি হল কেমন করে? আজ চরম দুর্নীতিবাজ যারা, তারা আমাদের দুর্নীতির বিচার করছে। এখন তৈরি হওয়া দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের অতীতে চাকরি চলে গিয়েছিল দুর্নীতির কারণে।
প্রশ্ন: প্রথমে যেখানে শুরু করেছিলাম শেষে সেই প্রসঙ্গেই আসি। বাংলাদেশ সরকার বার বার প্রত্যর্পণের কথা বলছে। আর আপনি নিজেই ফিরতে চাইছেন…
শেখ হাসিনা: সে দেশের সরকার বার বার এটা বলছে। এখন আমি নিজেই ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এখন তো ওদের আমাকে বাধা দেওয়ার কথা নয়। আমি বরাবর মৃত্যুকে কাছ থেকে দেখেছি, মৃত্যুর দোরগোড়া থেকে ফিরে এসেছি। এ বার যদি মরতে হয়, দেশের মাটিতেই ফিরেই মরব (গলা ধরে আসে)। মানুষ তো মরণশীল। ফলে যত বাধা আসুক, আমায় যেতেই হবে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। আমাদের নেতাকর্মীদের কারাগারে নির্যাতন করে মেরে ফেলা হচ্ছে, বাইরেও এক অবস্থা। যদি মরেই যাই, তা হলে এ সব দেখতেও পাব না, বুঝতেও পারব না। কিন্তু বেঁচে থেকে নিজের চোখে এ সব দেখে প্রতিবাদ না করে থাকতেপারব না। (শেষ)