সিঁদুর অভিযানে বিপর্যস্ত হয়ে সংঘর্ষবিরতি চাইতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তান। তা আগেই বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছে। এ বার জানা গেল, সংঘর্ষবিরতিতে রাজি হওয়ার আগে পাকিস্তানকে বেশ কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়েছিল ভারত। কারণ তখনও পর্যন্ত পাকিস্তানকে উপযুক্ত জবাব দেওয়া হয়ে ওঠেনি। এমনটাই জানালেন ভারতের অবসরপ্রাপ্ত সেনা সর্বাধিনায়ক (চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ) অনিল চৌহান। সিঁদুর অভিযানের সময়ে বাহিনীর সমন্বয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
পহেলগাঁও জঙ্গিহানার জবাব দিতে গত বছরের ৭ মে পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটিগুলিতে ভারত হামলা করেছিল। প্রথমে পাকিস্তানের কোনও সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করেনি ভারত। কিন্তু পাকিস্তান ভারতে হামলা শুরু করলে, জবাব দেয় এ দেশের সামরিক বাহিনীও। চার দিন ধরে চলে ওই সংঘর্ষ। সংঘর্ষ চলাকালীন আকাশের দখল চলে এসেছিল ভারতীয় বায়ুসেনার হাতে। সেই কারণেই সংঘর্ষবিরতি চাইতে বাধ্য হয়েছিল পাকিস্তান। এ তথ্য আগেই প্রকাশ্যে এসেছে।
সংঘর্ষবিরতির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে কী ঘটেছিল, তা এ বার প্রকাশ্যে আনলেন অবসরপ্রাপ্ত সেনা সর্বাধিনায়ক জেনারেল চৌহান। সংঘর্ষের চতুর্থ দিন (১০ মে) সকালে পাকিস্তানি ডিজিএমও হটলাইনে যোগাযোগ করেন ভারতের সঙ্গে। অবিলম্বে সংঘর্ষবিরতির অনুরোধ করেন তিনি। কিন্তু ভারত সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যায়নি। দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করায় পাকিস্তানকে। জেনারেল চৌহানের কথায়, ‘‘পাকিস্তানকে অপেক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত ভেবেচিন্তেই নেওয়া হয়েছিল। কারণ, পাকিস্তানে যতটা প্রত্যাঘাতের পরিকল্পনা ছিল, তখনও তার অর্ধেক বাকি রয়ে গিয়েছিল।’’
অবসরপ্রাপ্ত সিডিএস জানান, ভারত চাইছিল সংঘর্ষবিরতিতে রাজি হওয়ার আগে বাকি থাকা কাজ সেরে ফেলতে। সেই কারণে ভেবেচিন্তেই পাকিস্তানকে অপেক্ষা করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেনারেল চৌহানের মতে, পাকিস্তান হয়তো ভেবেছিল তারা ভারতে হামলায় সফল হয়েছে। ওই হামলার পর দিল্লি জোরালো প্রত্যাঘাত করতে পারে আশঙ্কা করছিল তারা। সম্ভবত সেই কারণেই দ্রুত যুদ্ধবিরতি চাইছিল পাকিস্তান। তবে ওই দিন সকালে পাকিস্তান যখন হটলাইনে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে, তখন কিছুটা বিস্মিতই হয়েছিলেন জেনারেল চৌহান। তাঁর কথায়, “এটা বেশ অবাক করার মতো ঘটনা ছিল। কারণ, ৯ মে পাকিস্তান থেকে বলা হচ্ছিল— ওরা না কি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারতকে বুঝে নেবে।”
আরও পড়ুন:
বস্তুত, ৯ মে-র রাত থেকে পাকিস্তানের একের পর এক ঘাঁটিতে হামলা হয়। ওই রাত থেকে সংঘর্ষ থামা পর্যন্ত পাকিস্তানের ১১টি সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় ভারত। ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাকিস্তানি বাহিনীর বেশ কিছু হ্যাঙার, র্যাডার সাইট। পাকিস্তানের কিছু যুদ্ধবিমানেরও ক্ষতি হয়। চার দিনের ওই সংঘর্ষে পাকিস্তানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল ভারত। বুঝিয়ে দিয়েছিল, পাকিস্তানের কোনও সামরিক ঘাঁটিই ভারতের নাগালের বাইরে নয়। বিশেষ করে রাওয়ালপিণ্ডির নুর খান ঘাঁটি বা ভোলারির মতো এলাকায় পাকিস্তানের যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তাতে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে যায়। এ সব জায়গায় এখনও মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান।
জেনারেল চৌহানের কথায়, ‘‘পাকিস্তান খুব ভাল করেই বুঝে গিয়েছিল— এই সংঘর্ষ চলতে থাকলে তাদের পরাজয় অবধারিত। সংঘর্ষ চললে আরও দ্রুত, আরও বেশি ক্ষয়ক্ষতি হত পাকিস্তানের।’’
সিঁদুর অভিযানে ভারতের সাফল্যের নেপথ্যে আরও একটি বড় কারণ ছিল— বাহিনীর নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা। ভারত যে ভাবে সীমান্ত পার না করেই পাকিস্তানের ভিতরে দূরপাল্লার আক্রমণ করেছিল, তা-ও তুলে ধরেন অবসরপ্রাপ্ত সিডিএস। পাকিস্তানও তেমন কিছু করার পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু পাকিস্তান কোনও পদক্ষেপ করার আগেই পাক বিমানঘাঁটিগুলিতে হামলা শুরু করে দেয় ভারত। ফলে আকাশের দখল প্রায় ভারতের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এ অবস্থায় পাকিস্তানও সংঘর্ষবিরতির প্রস্তাব দেওয়াই শ্রেয় বলে মনে করে। জেনারেল চৌহানের কথায়, “১০ই মে সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ ওরা (পাকিস্তান) যে ফোন করেছিল, তার প্রধান কারণ ছিল ভারতের বায়ুসেনার শক্তি। ওরা ভেবেছিল, এখন আলোচনায় বসাই শ্রেয়। না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেত।”