ডিসেম্বরের মধ্যেই যে তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন, তা সাম্প্রতিক অতীতে বার বার জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। গত ৫ অগস্ট ভারতের মাটিতে তাঁর প্রথম সাংবাদিক বৈঠকেও প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি জোরালো হয়। এ বার হিন্দুস্তান টাইম্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দেশে ফেরা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের কার্যকলাপ নিয়ে ফের মুখ খুললেন বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী।
আসন্ন ব্রিক্স সম্মেলনে ভারতে আসার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে তিনি ভারতে আসবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কয়েকটি সূত্রের দাবি, তারেকের দিল্লি সফরের বদলে হাসিনার প্রত্যর্পণের শর্ত রেখেছে ঢাকা। প্রশ্ন উঠছে, সেই কারণেই কি ডিসেম্বরের মধ্যে হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরার কথা ঘোষণা করতে হয়েছে? মাথায় মৃত্যুদণ্ডের খাঁড়া নিয়ে না হলে কেন দেশে ফিরতে চাইছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী? হাসিনা নিজে অবশ্য সেই সমস্ত জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘‘আমি আন্তর্জাতিক মঞ্চে যে সাংবাদিক সম্মেলন করেছি, দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেটা কী ভাবে সমস্যার কারণ হতে পারে? ২০০৭ সালে তারেক রহমান যখন ব্রিটেনে যান, তিনি একটি স্ট্যাম্প পেপারে সই করেছিলেন। রাজনীতি না-করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু লন্ডন থেকে তিনি রাজনীতিই করেছেন। তাঁর মা খালেদা জিয়ার জায়গায় নিজে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব সামলেছেন। ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে জনসভা করেছেন। দলীয় বৈঠকে যোগও দিয়েছেন। আমি কি কখনও ব্রিটিশ সরকারকে আমার দেশের একজন পলাতক ব্যক্তিকে এ ধরনের সভা করতে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেছি? আমি এমন কোনও অভিযোগ করিনি।’’ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ করে হাসিনার বক্তব্য, ‘‘এই পরিস্থিতিতে আমার প্রত্যাবর্তন কী ভাবে শর্ত হতে পারে, সেটাই বুঝতে পারছি না।’’
দু’বছরের বেশি সময় পর আবার বাংলাদেশের ফেরার নেপথ্যে তাহলে কী কারণ? হাসিনা বলেন, ‘‘বাংলাদেশকে উন্নয়ন, গণতন্ত্রের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সেই কারণে আমি বাংলাদেশে ফিরতে চাই। উন্নয়ন থমকে গেলে কর্মসংস্থানও থেমে যায়। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। চরমপন্থী চক্রগুলি আবার সক্রিয় হলে সেটা বাংলাদেশে আঞ্চলিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’’
হাসিনা জানান, হুমকি বা হামলার সম্মুখীন হতে তিনি ভয় পান না। অতীতের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘‘আমার জীবনের উপর হুমকি নতুন নয়। ১৯৭৫ সালে আমি পরিবারকে হারিয়েছিলাম। সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, ষড়যন্ত্র দেখেছি। হত্যার চেষ্টা বার বার করা হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ অগস্ট আমাকে খুনের উদ্দেশ্যে ঢাকায় একটি জনসভায় গ্রেনেড ছোড়া হয়। আমি বেঁচে গেলেও অনেক সহকর্মী বাঁচেননি। সেই হামলা তখন আমাকে থামতে পারেনি, আর এখনও কোনও হুমকি আমার কর্তব্য নির্ধারণ করতে পারবে না।’’ হাসিনার আরও সংযোজন, ‘‘আমি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নই। ক্ষমতার জন্য বাংলাদেশে ফিরতে চাইছি, তা নয়। আমার ফেরার একমাত্র কারণ বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানো।’’ ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান, তবে ঠিক কবে ফিরবেন, তা এখনও প্রকাশ করেননি। বলেছেন, ‘‘তারিখ ও সময় যথাসময়ে জানিয়ে দেওয়া হবে।’’
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই সে দেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়নি। সে প্রসঙ্গ টেনে হাসিনার প্রশ্ন, ‘‘কেন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হল? আওয়ামী লীগ যদি খারাপ কিছু করে থাকে, তবে বাংলাদেশের জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। নির্বাচনে জনগণ তার উত্তর দেবে। যারা ক্ষমতা দখল করেছে, তাদের কি আমাদের দলকে নিষিদ্ধ করার অধিকার আছে?’’ ২০২৪ সালে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই সেই দলের অনেক নেতা দেশছাড়া। আবার অনেকে বাংলাদেশে থাকলেও ‘আত্মগোপন’ করে রয়েছেন। হাসিনার কথায়, ‘‘আওয়ামী লীগের ছোট-বড় বহু নেতার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ছ’লাখের বেশি মামলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে কি কেউ মুখ খুলবে না?’’ পাশাপাশি এ-ও প্রশ্ন তোলেন, ‘‘২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে যে আগুন লাগানো, হামলা, হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তার বিরুদ্ধে কেন কোনও মামলা হবে না? কেন অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেওয়া হল?’’ হাসিনার মতে, ‘‘বাংলাদেশে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীরা বিচরণ করছে।’’
হাসিনা মনে করেন, কোনও নিষেধাজ্ঞাই আওয়ামী লীগের মতো প্রাচীন রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যতে ইতি টানতে পারবে না। তাঁর কথায়, ‘‘আওয়ামী লীগ ছিল, আছে আর ভবিষ্যতেও থাকবে। ওরা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে পারে বা যে কোনও ধরনের পদক্ষেপ করতে পারে, কিন্তু দলের জনসমর্থন থেকে যাবে। আমি আমার নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলি। দলীয় নেতাকর্মীদের উপর অত্যাচারের পরেও যদি কোনও দল জনগণের কাছে জনপ্রিয় থাকতে পারে তবে সেটা হল আওয়ামী লীগ।’’
হাসিনার অগস্টের সাংবাদিক সম্মেলন নিয়ে প্রথম থেকেই আপত্তি করেছিল ঢাকা। ঢাকার তরফে এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছিল, হাসিনাকে এই কর্মসূচির অনুমতি দিলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তার পরেও ভারতের মাটি থেকে এমন আয়োজনের অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার হতাশা প্রকাশ করে। যদিও ভারত বার বার স্পষ্ট করেছে, ওই কর্মসূচির সঙ্গে সরকারের কোনও সম্পর্ক নেই। ওই মঞ্চ থেকে যা যা কথা হয়েছে তা সমর্থন করে না নরেন্দ্র মোদীর সরকার।