দুই নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধের খবর বেরোনোর পর থেকে প্রকাশ্যে আসেননি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। বৃহস্পতিবার উত্তরপ্রদেশের মিরাটে স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ‘ভোটার সাক্ষরতা ক্লাব’-এর আঞ্চলিক সম্মেলনে তাঁর যোগ দেওয়ার কথা ছিল। শনিবার তাঁর যাওয়ার কথা ছিল বারাণসীতে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর লোকসভা কেন্দ্রেও তাঁর জেন জ়ি-র সঙ্গে আলাপচারিতা ছিল। দু’টি কর্মসূচিই বাতিল করা হয়েছে।
দু’টি কর্মসূচিরই লক্ষ্য ছিল তরুণদের মধ্যে ভোটদান ও নির্বাচন কমিশনের ‘ইসিআইনেট’ অ্যাপ নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি। বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রের ৫০০ জন বিএলও-র সঙ্গেও বৈঠক নির্ধারিত ছিল দুই শহরেই। এমনকি, মিরাটের অনুষ্ঠানের জন্য প্রায় দেড় কোটি টাকা খরচও হয়ে গিয়েছিল বলে সূত্রের দাবি। এখন বিরোধী শিবির অভিযোগ তুলেছে, জ্ঞানেশ এখন দেশের তরুণদের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ, বুধবার ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর তদন্ত রিপোর্টে ইঙ্গিত রয়েছে যে, জেন জ়ি বা তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা যাতে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে না পারেন, নরেন্দ্র মোদী সরকারের সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমার সেই চেষ্টা করছেন। দু’বছর ধরে ভোটার তালিকায় নতুন ভোটারদের নাম যোগ করার জন্য রুটিন সংশোধন বা ‘স্পেশাল সামারি রিভিশন’ বন্ধ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ডিজি (তথ্যপ্রযুক্তি) সীমা খন্না ‘ইসিআইনেট’ অ্যাপের মাধ্যমে পুরো ভোটার তালিকা নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। বিএলও, ইআরও-রা যোগ্য ভোটারদের নাম ভোটার তালিকায় জুড়তে পারছেন না। জ্ঞানেশ কুমার এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটারদের নাম কেটে বিজেপিকে নির্বাচনে জিততে সাহায্য করেছেন। দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু ও বিবেক জোশী আপত্তি তুললেও জ্ঞানেশ শোনেননি।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে দাবি করা হয়েছে, বিভিন্ন কারণে অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ বদল করতে হয়। ভোটার সাক্ষরতা ক্লাবের সম্মেলনের দিন আগেও বদল হয়েছে। ২১ সেপ্টেম্বরই অর্থাৎ তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের আগে দু’টি অনুষ্ঠান স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল। কংগ্রেস নেতা পবন খেরার কটাক্ষ, ‘‘২২ সেপ্টেম্বর রিপোর্ট প্রকাশের আগে কমিশনের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছিল। জ্ঞানেশ কুমার তখনই বিপদ বুঝে অনুষ্ঠান বাতিল করে দিয়েছেন।’’
কংগ্রেস, বাম-সহ বিভিন্ন সংগঠন জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে দেশ জুড়ে শুক্রবার বিক্ষোভ দেখিয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টি বৃহস্পতিবার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞানেশ ইস্তফা না দিলে দেশ জুড়ে বিক্ষোভ শুরু হবে। এই সময়সীমা শনিবার শেষ হচ্ছে। ককরোচ-প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে শুক্রবার বলেছেন, ‘‘শনিবারের মধ্যে জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে, সিজেপি ২ অক্টোবর মুম্বই থেকে দেশজোড়া আন্দোলন শুরু করবে। আসুন,গান্ধী জয়ন্তীতে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার শপথ নিই।’’
শুক্রবার দুপুরে যন্তর মন্তরে আইসা নেত্রী নেহা বোরা-সহ বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠনের নেতা-কর্মী, সিপিআই-এমএল (লিবারেশন) -এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, যোগেন্দ্র যাদব, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের কর্মীরা জ্ঞানেশের ইস্তফা চেয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। তাঁদের আটক করে যন্তর মন্তর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে কাঞ্জাওয়ালাতে নিয়ে যাওয়া হয়। কংগ্রেসও দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন শহরে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। বিক্ষোভের ভয়ে অশোক রোডে নির্বাচন সদনের সামনে দিনভর ছিল কড়া নিরাপত্তা।
কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশের কটাক্ষ, ১৯৮৮ সালে রাজীব গান্ধী সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডেকে ভোটাধিকারের বয়স ২১ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ বছর করেছিলেন। এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আশাহত তরুণদের ভয় পাচ্ছেন। তাই তিনি জ্ঞানেশ কুমারকে দিয়ে ২০২৪ থেকে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল সামারি রিভিশন’ বন্ধ করে রেখেছেন। যাতে নতুন ভোটারদের নাম ভোটার তালিকায় যোগ না হয়। কমিশন সূত্রের পাল্টা দাবি, যে কেউ ১৮ বছর হলেই ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারেন। তার জন্য ভোটার তালিকার ‘সামারি রিভিশন’-এর প্রয়োজন নেই।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরীওয়াল, অখিলেশ যাদবের মতো বিরোধী নেতানেত্রীরা ইতিমধ্যেই জ্ঞানেশ কুমারের গ্রেফতারির দাবি তুলেছেন। জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা, এসআইআর-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদের এসআইটি-তদন্ত চেয়ে এ বার সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের হয়েছে। আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী ওই মামলায় আর্জি জানিয়েছেন, বাকি দুই নির্বাচন কমিশনারকে অন্ধকারে রেখে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের নেওয়া যাবতীয় সিদ্ধান্ত বাতিল হোক।