E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

দুর্নীতির নালিশে ব্যতিব্যস্ত, গগৈকে নিশানা করেও চাপে হিমন্ত

হিমন্তের অনুগামীরা বলে থাকেন, হিমন্তের আত্মবিশ্বাস হিমালয় প্রমাণ। গত পাঁচবছরে শুধু অসমই নয়, গোটা উত্তর-পূর্বেই তাঁকে চাণক্যের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অগাধ ভরসাও ছিল তাঁর উপরে।

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৬
হিমন্তবিশ্ব শর্মা।

হিমন্তবিশ্ব শর্মা। — ফাইল চিত্র।

পাঁচ বছর আগে তিনিই ছিলেন বিজেপির জয়ের চাণক্য। এ বারে পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। হিমন্তবিশ্ব শর্মা একাধারে চাণক্য ও চন্দ্রগুপ্ত। নিজেকে জিতিয়ে আনার কৌশল তিনি নিজেই তৈরি করছেন এখন। আর তাতে ‘মিয়াঁ’ মুসলমানদের বিরুদ্ধে লাগাতার তোপ দেগে ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা বহু দিনের অস্ত্র। ক্রমাগত কংগ্রেসকে ভেঙে বিজেপিকে শক্তিশালী করতে চাইছেন।ভূপেন বরার যোগদান যার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ। নিজেই দাবি করেন, প্রধান প্রতিপক্ষের অন্দরের সব খবর তাঁর কাছেই সব থেকে আগে পৌঁছয়। এমনকি, রাহুল গান্ধী বা গৌরব গগৈয়ের আগেও। তার পরেও হিমন্তবিশ্ব কি চাপে? কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও কি চাইছেন তাঁকে আরও বেশি করে অসমের দিকে নজর দিতে? যে কারণে, পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি বিশেষ আসা-যাওয়া নেই হিমন্তের? যদি সেটা হয়েই থাকে, তার কারণ কী?

হিমন্তের অনুগামীরা বলে থাকেন, হিমন্তের আত্মবিশ্বাস হিমালয় প্রমাণ। গত পাঁচবছরে শুধু অসমই নয়, গোটা উত্তর-পূর্বেই তাঁকে চাণক্যের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অগাধ ভরসাও ছিল তাঁর উপরে।

তা হলে চাপ কোথায়? রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ১০ বছরের শাসনে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা তো আছেই। তার উপর তাঁর পরিবারের বিপুল জমি দখল ও দুর্নীতির অভিযোগ জনমানসে বিরক্তি বাড়াচ্ছে। গৌরব গগৈকে গত ৬ মাস ধরে নাগাড়ে ‘পাকিস্তানের চর’ বলে, পরে তা প্রমাণ করতে না-পারা বুমেরাং হতে পারে বলও রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি। উজানি অসমের ২৬টি আসন ক্ষমতার ভিত্তি গড়ে দেয় বরবার। লোকসভায় পূর্ণশক্তিতে লড়েও উজানির ভোট না মেলায় গৌরবকে হারাতে পারেননি তিনি। আর এখন, আহোমসন্তান ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈয়ের পুত্রকে ‘আইএসআইএজেন্ট’ তকমা দেওয়ায় উজানি অসমেক্ষোভ আরও বেড়েছে। তাই নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের নিয়ে বার বার উজানিতে সভা করছেন তিনি। ১৭ শতাংশ চা-বাগান ভোটও তাঁর বড় চিন্তা। বাগান কর্মীদের জমির পাট্টা দিয়ে ও মজুরি বৃদ্ধি করে ভোট ধরে রাখারচেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশি তাড়ানোর স্লোগান ও ‘মিয়াঁ’ মুসলিম-বিরোধী মেরুকরণ রাজনীতি তাঁর প্রধান অস্ত্র। কিন্তু এনআরসি বা ভোটার তালিকা সংশোধনে রাজ্যের ‘লক্ষ লক্ষ বহিরাগত’র উপস্থিতি প্রমাণে বিজেপি পুরো ব্যর্থ। উল্টে কোপ পড়েছে বহু বাঙালি ও ভূমিপুত্রের উপরে। যে বাঙালি ভোট বিজেপির মেরুদণ্ড, তারাও এ বার বলছে, প্রতিশ্রুতির তুলনায় প্রাপ্তি কম। এমনকি, বসুন্ধরা প্রকল্পে বাঙালিরা জমির পাট্টা পেয়েছেন হাতে গোনা। মেরুকরণের বাড়াবাড়িতে সচেতন বাঙালিরাও বিরক্ত। তার পরেও হিমন্তর আশা, বরাক ও ব্রহ্মপুত্রের বাঙালির বড় অংশের ভোটতিনিই পাবেন।

হিমন্তর হিসেব অনুযায়ী, মুসলিম ভোট ৪০ শতাংশ। সীমানা পুনর্বিন্যাসে মুসলিম প্রধান আসন ৩২ থেকে কমে এখন ২২। কংগ্রেস ভাঙিয়ে মুসলিম বিধায়কদের রাইজর দলে পাঠানো, ভূমিপুত্র ও বাংলাদেশি মুসলিম আলাদা করার সমীক্ষা—সবই ভোট অঙ্কের অংশ। তার পরেও হিমন্ত জানিয়ে দিয়েছেন, মুসলিম প্রধান ২২ আসনে প্রার্থীই দেবে না বিজেপি।

তাঁকে সব চেয়ে বেকায়দায় ফেলেছে জ়ুবিন গর্গের মৃত্যু-তদন্ত। বেঁচে থাকতে বিজেপিকে বেজায় গালমন্দ করা জ়ুবিন সিঙ্গাপুরে মারাও গেলেন একেবারে সরকার-ঘনিষ্ঠদেরবৃত্তে। তড়িঘড়ি অভিযুক্তদের জেলে পাঠিয়েছিলেন হিমন্ত। দাবি করেছিলেন, ‘খুন হয়েছেন জ়ুবিন’। অথচ, সিঙ্গাপুর পুলিশের তদন্ত, জোড়া ময়না তদন্ত, ফরেন্সিক পরীক্ষায় কোথাও হত্যার চিহ্ন নেই। তবু তাঁর গড়া বিশেষ তদন্তদল ১২ হাজার পাতার চার্জশিট জমা দিয়েছে হত্যার ধারা যোগ করেই। অথচ পরিবারের দাবি মেনে গড়া হচ্ছে না ফাস্ট ট্র্যাক আদালত। হত্যা প্রমাণ হবে, এমনসম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ।

যদিও হিমন্ত শিবিরের বক্তব্য, ভোটবাক্সে এর কোনওটাই বিশেষ প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। উন্নয়ন ও প্রকল্পভিত্তিক বিপুল সুবিধাভোগী ভোটব্যাঙ্ক গড়েছেন হিমন্ত। পেয়েছেন কেন্দ্রের উপুড় হস্তও। এর পাশাপাশি অসমের অস্মিতা, বাঙালি হিন্দুদের একটা বড় অংশের ভরসার জায়গা তো আছেই। কংগ্রেসকে লাগাতার ভাঙার পরে বিরোধীপক্ষও ছন্নছাড়া এবং অন্তর্দ্বন্দ্বে দীর্ণ। ফলে দুর্নীতির অভিযোগ, পুরনো বিজেপি শিবিরের অসন্তোষ বা আরএসএসের বিরক্তি—সব উড়িয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, আপাতত তাঁর বিকল্প নেই।

চাপের মধ্যে লড়াইয়ে এটাই তাঁর অস্ত্র।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Assam Gaurav Gogoi

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy