গত জুলাই মাসে দিল্লির যন্তর মন্তরে হওয়া ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর আন্দোলনে দিল্লি পুলিশ যখন অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগে বিদ্ধ, তখন আজ পুলিশ স্মরণ দিবসে সেই পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। আজ দিল্লির চাণক্যপুরীর জাতীয় পুলিশ স্মৃতিসৌধে হওয়া অনুষ্ঠানে অমিত শাহ বলেন, ‘‘সারা দেশে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে যেখানে পুলিশকর্মীরা অসাধারণ ধৈর্য, সংযমের পরিচয় দিয়ে দেশের সুরক্ষাকে নিশ্চিত করেছেন।’’ তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে দিল্লিতে সাম্প্রতিক সরকার-বিরোধী আন্দোলনের পিছনে ‘অশুভ শক্তি’ ও ‘পশ্চিম থেকে আসা ঝড়’-এর প্রভাব দেখতে পেয়েছিলেন সঙ্ঘপ্রধান মোহন ভাগবত। কিন্তু আজ এ নিয়ে প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়েছেন ভারত সফররত আমেরিকান বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো। ভারতে তরুণদের আন্দোলন দমনে পুলিশের বাড়াবাড়ির সমালোচনা করেছিলেন রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞেরা। তা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে রুবিয়োর কটাক্ষ, ‘‘রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষজ্ঞ। হ্যাঁ, এঁরাই আমার সবচেয়ে পছন্দের। এঁরা আসলে সোনার পাথরবাটি।’’
২০ জুলাই মাসে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছিল তাতে বিক্ষোভকারীদের রুখতে পুলিশের বিরুদ্ধে লাঠি চালানো, কাঁদানে গ্যাসের ব্যবহার ছাড়াও ছররা বন্দুক বা পেলেট গান ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ছররা বন্দুকের ব্যবহারে আহত হন একাধিক আন্দোলনকারী। আন্দোলনকারীরা মূলত ছিলেন পড়ুয়া ও তরুণ। কেন দেশের যুব সমাজের বিরুদ্ধে ছররা বন্দুকের মতো অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে তা নিয়ে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়ে দিল্লি পুলিশ তথা দিল্লি পুলিশকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। পুলিশের ওই অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগের সমালোচনা করে আরএসএস-ও।
যদিও পুলিশের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ তাতেই থেমে যায়নি। বিরোধীদের মতে, তারপর থেকে দিল্লিতে যে একাধিক জনবিক্ষোভ দেখা গিয়েছে তাতে ছররা বন্দুক ব্যবহার না হলেও, আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে বিভিন্ন সময়ে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে অতিমাত্রায় বলপ্রয়োগ যে করেছে সেই ছবি উঠে এসেছে সংবাদমাধ্যমে। ধারাবাহিক সমালোচনার মুখে পড়ে যাতে বাহিনীর মনোবল নষ্ট না হয় সে জন্য আজ পুলিশবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসায় সরব হন শাহ। তিনি বলেন, ‘‘দেশের জনগণকে বলতে চাই যে সব ধরনের সরকারি চাকরির মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে শ্রমসাধ্য হল পুলিশবাহিনীর চাকরি। দেশের নাগরিকেরা যখন পুজো, দীপাবলির মতো বিভিন্ন উৎসব উদযাপন করেন তখন পুলিশকর্মীরা কোনও ছুটি পান না। যে দিনগুলিতে আমরা পরিবারের সঙ্গে উৎসব পালন করি, সেই দিনগুলিতে পুলিশকর্মীরা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে, নিজের পরিবার থেকে দূরে থেকে জীবনের শ্রেষ্ঠ বছরগুলি দেশের জন্য উৎসর্গ করে দেশের সেবা করেন।’’
বিরোধীরা পুলিশের বলপ্রয়োগ ও মারমুখী মনোভাবের অভিযোগে সরব হলেও, আজ পাল্টা পুলিশের সংযমের প্রশংসা করেছেন শাহ। তিনি বলেন, ‘‘পুলিশকর্মীরাই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রথম ও শেষ প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে থাকেন। সারা দেশে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে যেখানে পুলিশকর্মীরা অসাধারণ ধৈর্য, সংযম, শৃঙ্খলা, বীরত্ব এবং নিষ্ঠার মনোভাব প্রদর্শন করে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করেছেন।’’
প্রথমে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ও পরে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যে ‘বিদেশি শক্তি’-র মদত রয়েছে, সেই ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে শাসক বিজেপির ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন শিবির থেকে। বাংলাদেশ ও নেপালে যে বিক্ষোভে শাসন ব্যবস্থা বদলে গিয়েছে তার এই আন্দোলনের তুলনা করেছেন অনেকে। সে সব বিক্ষোভের পিছনেও বিদেশি শক্তির মদতের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু আজ ভারত সফররত আমেরিকান বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়ো এ নিয়ে প্রশ্ন উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ‘‘ওটা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়। এ নিয়ে আমি মন্তব্য করব না। এখানে গণতন্ত্র রয়েছে। নির্বাচন হয়। আমেরিকায় প্রতি দিন বিক্ষোভ হয়।’’ তবে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও দাঙ্গাহাঙ্গামার মধ্যে পার্থক্য আছে তা মনে করিয়ে দিয়েছেন রুবিয়ো। সম্প্রতি ফ্রান্সে সরকার-বিরোধী আন্দোলন হিংসাত্মক রূপ নিয়েছে। রুবিয়ো বলেন, ‘‘ইউরোপে যে দাঙ্গা হাঙ্গামা দেখা যাচ্ছে তেমন ঘটনার কথা আমি বলছি না। কিন্তু শান্তিপূর্ণ ভাবে ভিন্নমত প্রকাশের ক্ষমতা গণতান্ত্রিক সমাজগুলির বৈশিষ্ট্য।’’
রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষজ্ঞদের সমালোচনার বিরুদ্ধে ভারতের কূটনীতিক বরখা তামারকর মনে করিয়ে দিয়েছেন, ভারতে মানবাধিকার রক্ষার জন্য সাংবিধানিক রক্ষাকবচ আছে। তাঁর কথায়, ‘‘বেছে বেছে কোনও দেশকে নিশানা করার জন্য মানবাধিকারকে ব্যবহার করাউচিত নয়।’’