হড়পা বান আসার পরে কাদার স্রোতে ভেসে যাচ্ছে একের পর এক বাড়ি, গাড়ি, বাস। তাঁদের বাঁচিয়ে রেখেছিল শুধু একটা শাড়ি। আর তার জোরেই কাঠমান্ডু থেকে শুক্রবার চেন্নাইয়ে ফিরতে পেরেছেন সেই ২১ জন পর্যটক। ফিরে তাঁরা সকলেই একযোগে বলে ওঠেন, ‘‘নতুন জন্ম আমাদের।’’
তামিলনাড়ুর কুম্বাকোনামের একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে সে রাজ্য থেকে ৫৭ জন গিয়েছিলেন কৈলাস যাত্রা। সকলের বয়সই ৫০ বছরের বেশি। চেন্নাই থেকে গিয়েছিলেন ৪৯ জনের আলাদা একটি দল। ৫৭ জনের ওই দলেরই ২১ জন নিরাপদে ঘরে ফিরেছেন। ওই দলের বাকি ৩৬ জনের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা যায়নি।
চেন্নাইয়ে ফিরে ভেলাচেরির বাসিন্দা নবু কবীরদাস এবং তাঁর স্ত্রী বিজয়া ভুবনেশ্বরী জানান সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা। বুধবার সকালে তাঁদের দলের ৫৭ জন তিনটি বাসে চেপে রাসুয়া দিয়ে যাচ্ছিলেন। গন্তব্য ছিল চিনের অভিবাসন দফতর। পথেই বিপত্তি। বাসের কনভয়ের দ্বিতীয়টিতে সওয়ার ছিলেন কবীরদাসেরা। আচমকাই কাদায় গেঁথে যায় বাসের চাকা। অগত্যা সেই বাসের চাকা টেনে তোলার চেষ্টা করছিলেন খালাসিরা। কবীরদাস জানান, তখন বিরক্ত হয়েছিলেন খুব। কিন্তু প্রাণটা বাঁচে সেই দেরির কারণেই। হঠাৎ তাঁরা শোনেন বিকট এক শব্দ। কবীরদাসের কথায়, ‘‘শুনে ভাবলাম বিস্ফোরণ হয়েছে। তার পরেই দেখি কাদামাটির স্রোত নামছে পাহাড় থেকে।’’
ভুবনেশ্বরী জানান, কী পরিণতি হতে পারে, তা বুঝে সতর্ক করে দেন তাঁদের বাসের নেপালি চালক। সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের উচু কোথাও গিয়ে দাঁড়াতে বলেন। কিন্তু বললেই তো আর সঙ্গে সঙ্গে পালানো যায় না। দলের সকলের বয়স ৫০-এর বেশি। পায়ে অত জোর কোথায়? কিছু দূরে ছিল একটা মাটির টিলা। উচ্চতা প্রায় একতলা বাড়ির সমান। কোনও মতে তাতেই ওঠার চেষ্টা করেন ২১ জন। কিন্তু বার বার পিছলে পড়তে থাকেন।
সবার আগে কোনও মতে সেই টিলার মাথায় চড়েন পুনগোড়ি নামে এক মহিলা। তিনি আর সময় নষ্ট করেননি। টিলার মাথায় উঠেই নিজের পরনের শাড়িটা খুলে ঝুলিয়ে দেন নীচে। সেই শাড়ি ধরে এক এক করে টিলার মাথায় উঠতে থাকেন বাকিরা। ভুবনেশ্বরী জানান, সেই শাড়ি ধরেও এক মহিলা কোনও মতেই আর উঠতে পারছিলেন না। বার বার তিনি পড়ে যাচ্ছিলেন। শেষে তাঁকে কোমরে শাড়িটা পেঁচিয়ে নিতে বলা হয়। তিনি শাড়ি কোমরে জড়িয়ে নিলে তাঁকে টেনে টিলার উপরে তোলেন বাকিরা।
আরও পড়ুন:
টিলায় ওঠার সময়েই ভুবনেশ্বরীরা দেখেন, তাঁদের বাস ভেসে যাচ্ছে কাদামাটির স্রোতে। পিছনের বাসগুলিও একে একে ভেসে যাচ্ছে। তার পরে আর সে দিকে তাকাননি তাঁরা। কাঞ্চিপুরমের এক স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা সত্যা বলেন, ‘‘সেই দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল যেন কোনও ইংরেজি সিনেমা! কাদামাটির উচ্চতা মনে হল যেন ৭০ ফুট।’’ তার পরে কোনও মতে সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর একটি শিবিরে গিয়ে পৌঁছোন ওই ২১ জন। সেখানে তাঁদের জল এবং বিস্কুট দেন জওয়ানেরা। তখনও যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না যে, তাঁরা বেঁচে আছেন।
পরের দিন, বৃহস্পতিবার প্রায় তিন ঘণ্টা পায়ে হেঁটে একটি হেলিপ্যাডে পৌঁছোন তাঁরা। সেই পথও সহজ ছিল না। কাঁটাঝোপ, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হাঁটতে থাকেন তাঁরা। কবীরদাস বলেন, ‘‘সরু পথের একপাশে খাদ। একটু এদিক-ওদিক হলেই ৫০ ফুট গভীর সেই খাদে পড়তে হবে।’’ এক নেপালি ব্যক্তি তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন হেলিপ্যাডে। সেখান থেকে হেলিকপ্টারে করে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় কাঠমান্ডু। তার পর পৌঁছোন দিল্লি। তার পরে শুক্রবার পৌঁছে যান চেন্নাই।
কবীরদাসদের দলের বাকিদের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা যায়নি। তামিলনাড়ুর মন্ত্রী এ রাজমোহন জানিয়েছেন, সে রাজ্য থেকে ৪০০ জন গিয়েছিলেন নেপালে। ৯০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়ের নির্দেশে দু’জন মন্ত্রী গিয়েছেন দিল্লি। সেখানে বসেই খোঁজ নিচ্ছেন নেপালের পরিস্থিতি নিয়ে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
- ত্রাণ যেমন পাঠানো হচ্ছে, তেমনই আর্থিক সাহায্যও পাঠানো হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
- বিপর্যস্ত নেপালকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসছে অনেকেই। বিভিন্ন সংস্থা তো বটেই, ব্যক্তিবিশেষও সাহায্য পাঠাচ্ছেন নেপালে।
- হড়পা বানে বিপর্যস্ত নেপালে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ল। এখনও নিখোঁজ দেড় হাজারের বেশি মানুষ।
-
নিজের এক মাসের বেতন একটি পরিবারকে দেবেন মুখ্যমন্ত্রী! নেপালে নিখোঁজদের পরিজনকে সব রকম সহায়তারও আশ্বাস
-
চিনে নিরাপদ শিবিরে পশ্চিমবঙ্গের পর্যটকেরা? নেপালে হড়পা বানে নিখোঁজ ৩৭ জনের সন্ধানে নবান্নের দ্বারস্থ পরিবার
-
নিখোঁজদের পরিবারকে ডিএনএ নমুনা দিয়ে যেতে বলল কেন্দ্র! গভীর রাতে তিব্বতে ভূমিকম্প, কাঁপল নেপালও
-
হড়পা বানে ভেসে গিয়েছে খামার, ক্ষতিগ্রস্ত চাষজমি, সব হারিয়ে দিশাহারা নেপালের কৃষকেরা
-
নেপালের হড়পা বানে অনিশ্চিত চিনের স্বপ্নের প্রকল্প, রেলপথে নেপাল এবং তিব্বতকে আর জোড়া যাবে কি? সংশয়ে বেজিং