নিজের ৭৭তম জন্মদিনে দিল্লির দ্বারকার যশোভূমিতে ‘সেমিকন ইন্ডিয়া ২০২৬’-এর সূচনা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। আর বৃহস্পতিবার সেই মঞ্চ থেকে তাঁর দাবি, আত্মনির্ভর এবং বিকশিত ভারত গড়ে তোলাই তাঁর লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্যপূরণের পথে দেশ বেশ কয়েক ধাপ এগিয়েছে। পাশাপাশি, বিশ্বে ভারতের ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক শক্তির ছবি তুলে ধরেন তিনি। ইঙ্গিত দেন, নয়াদিল্লির সদ্যসমাপ্ত ব্রিক্স শীর্ষবৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার দুই যুযুধান দেশ— ইরান ও সংযুক্ত আরর আমিরশাহির পার্শ্ববৈঠকের আয়োজনে ভূমিকা ছিল ভারতেরও।
আমেরিকা-ইরান সংঘাতপর্বে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় প্রত্যক্ষ ভাবে রয়েছে পাকিস্তান। এ বার পশ্চিম এশিয়ার কূটনৈতিক দৌত্যে ভারতের ভূমিকার বার্তাও মিলল প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায়। ‘সেমিকন ইন্ডিয়া ২০২৬’-এ প্রধানমন্ত্রী জানান, বর্তমান বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি, আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র এবং উন্নত প্রযুক্তি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজের প্রায় ৯০ শতাংশই নিয়ন্ত্রণ করে চিন। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের জেরে বেশ কিছু খনিজ রফতানির উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বেজিং। ফলে বিশ্ববাজারে ওই সকল খনিজের ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। চিনের উদ্দেশ্য ছিল, এই খনিজগুলি আটকে দিয়ে আমেরিকার উপর চাপ সৃষ্টি করা। কিন্তু তার রেশ গোটা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়ে।
এই মুহূর্তে বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টার সেক্টর অনেকটা চিনের নিয়ন্ত্রণে। সেমিকন ইন্ডিয়ার সূচনা মঞ্চ থেকে মোদীর বার্তা, “ভারতের উপর বিশ্বের আস্থা বাড়ছে। ভারত সফল ভাবে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন সম্পন্ন করেছ। সেমিকন ইন্ডিয়ার এই আয়োজন আরও গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রথম পর্ব ২০২২ সালে হয়েছিল। এ বছর আমরা ব্যবসায়ীর চিপ উৎপাদন শুরু করেছি। ভারতের চিপ এখন গোটা বিশ্বে পৌঁছে যাচ্ছে।” প্রশাসনের প্রধান হিসাবে তাঁর ২৫ বছরের কার্যকালকে (১৩ বছর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী এবং ১২ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে) স্মরণে রাখতে বৃহস্পতিবার থেকেই দেশ জুড়ে উদ্যাপন অনুষ্ঠান (বিজেপি যার নাম দিয়েছে, ‘সেবা সংকল্প অভিযান’) শুরু হয়েছে। এই আবহে মোদীর দাবি, গোটা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দার আবহেও ভারতের জিডিপি ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধি এটাই প্রমাণ করছে যে, ভারতের প্রতি আস্থা এবং ভরসা বেড়েছে বিশ্বের। তাঁর কথায়, ‘‘এক দিকে ভারতের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে, অন্য দিকে, ভারতের উপর বিশ্বের ভরসা ক্রমশ বাড়ছে। আর এই ভরসার সেই ছবি ধরা পড়েছে কয়েক দিন আগে অনুষ্ঠিত হওয়া ব্রিক্স শীর্ষ সম্মেলনেই। সর্বসম্মত ভাবে নয়াদিল্লির ঘোষণা গ্রহণ করা ভারতের প্রতি বিশ্বের আস্থার আরও একটি বড় প্রমাণ।’’
আরও পড়ুন:
বাংলায় আর নেই কাটমানি, দাবি মোদীর
মোদী জন্মদিনে বৃহস্পতিবার রাজ্যের প্রায় দেড় কোটি মহিলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা। সেই উপলক্ষে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুরে পালিত হল ‘অন্নপূর্ণা দিবস’। সেখানে মহিলা কল্যাণের ‘মার্কশিট’ তুলে ধরল রাজ্যের বিজেপি সরকার। আর ভার্চুয়াল মাধ্যমে বক্তৃতা করলেন মোদী স্বয়ং। সেখানে তাঁর নিশানা হল প্রাক্তন শাসকদল তৃণমূল।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় জানান, গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গে যে পালাবদল হয়েছে, তাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মা-বোনেদের। তাই এ রাজ্যে বিজেপি সরকারের ‘প্রথম পরীক্ষা’-ই ছিল মহিলাদের উন্নয়ন। তাঁর দাবি, ‘‘মহিলাদের সংসারের খরচের চিন্তা কমলে তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। প্রতি মাসে এই ৩,০০০ টাকা তাঁদের বড় সম্বল।’’ মোদীর কথায়, ‘‘(এই পরীক্ষায়) বিজেপির মূলমন্ত্র ছিল কথা কম, কাজ বেশি। অন্নপূর্ণা যোজনার সূচনা সেই ভাবনাচিন্তা থেকেই।’’ রাজ্যে নতুন সরকার এসেই যোজনার কাজ শুরু করেছে। এর পরেই পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে ‘কাটমানি’ ইস্যুতে নিশানা করে তাঁর মন্তব্য, ‘‘আজ এত মহিলা সরাসরি ব্যাঙ্কে টাকা পাচ্ছেন। কোনও কাটমানি নেই। এখন বাংলায় কাটমানি চলে না।’’
এ রাজ্য-সহ গোটা দেশের মহিলাদের জন্য কী কী করেছে তাঁর সরকার, তা-ও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, অন্তঃসত্ত্বা এবং স্তন্যদায়ী মহিলাদের জন্য মাতৃবন্দনা যোজনা চালু করা হয়েছে। কন্যাভ্রূণ হত্যা বন্ধ করতে এবং মেয়েদের শিক্ষা ও সুরক্ষার জন্য ‘বেটি বঁচাও বেটি পড়াও’ শুরু হয়েছে। মেয়েরা বড় হলে যাতে স্কুলছুট না হয়, তাই স্কুলে শৌচালয় তৈরি করানো হয়েছে। মেয়েদের ভবিষ্যৎ ও শিক্ষার জন্য ‘সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা’ চালু করা হয়েছে। উজ্জ্বলা যোজনায় মহিলাদের গ্যাস সংযোগ, সৌভাগ্য যোজনায় বিদ্যুৎহীন পরিবারগুলিকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে, আয়ুষ্মান ভারত যোজনায় স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। মহিলারা যাতে বাড়ির মালিকানা থেকে বঞ্চিত না হন, তাই পিএম আবাস যোজনায় তাঁদের নামে বা যৌথ মালিকানায় বাড়ি দেওয়ার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এর পরেই পূর্বতন তৃণমূল সরকারের দিকে আঙুল তুলেছেন মোদী। তিনি বলেন, ‘‘বাংলার লোকজনের বড় সমস্যা হল, কেন্দ্রের অনেক যোজনার সুবিধা থেকে তাঁরা দীর্ঘদিন বঞ্চিত হয়েছেন। বিজেপি ক্ষমতায় এসে সব থেমে থাকা যোজনার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’’ ৫০ লক্ষেরও বেশি পরিবারকে চিহ্নিত করে তাঁদের পাকা বাড়ি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মোদী। তাঁর কথায়, ‘‘সবাই মিলে গড়ব নতুন বাংলা।’’
‘মোদীজি বিশ্বের এক নম্বর নেতা’, দাবি শুভেন্দুর
প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে মোদীর নিরবচ্ছিন্ন সিকি শতক পূর্তি উপলক্ষে হাওড়ার বাজে কদমতলা ঘাটে রাজ্য সরকার আয়োজিত ‘আশীর্বাদের প্রদীপ’ জ্বালানোর কর্মসূচিতে বৃহস্পতিবার বক্তৃতা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। সেখানে মোদীকে ‘বিশ্বের এক নম্বর নেতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। সম্প্রতি ব্রিক্স সম্মেলনের মঞ্চে পহেলগামের ঘটনার নিন্দা সূচক প্রস্তাব গ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করে শুভেন্দুর মন্তব্য— “পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদীরা যে ভাবে পহেলগাঁওয়ে আমাদের ভাই-বোনেদের হত্যা করেছে, তার নিন্দা করে এক দিকে রাশিয়া অন্য দিকে চিন সই করেছে। এর থেকে প্রমাণ হয় নরেন্দ্র মোদী এখন বিশ্বের এক নম্বর নেতা।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, অতিমারি-পর্বে মোদীর নেতৃত্বে ভারতের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসক মোদীর ২৫ বছরের স্মরণে রাজ্য সরকার ১২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে জানিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ভারতকে বিশ্বগুরু হিসেবে দেখতে চাই। দল, মত, বর্ণ, ধর্ম, সম্প্রদায় নির্বিশেষে দেশ পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী হোক, এই প্রার্থনা আমরা করব। এই ১২টি কর্মসূচিতে শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সরকার নয়, সমাজ এবং জনগণকেও যুক্ত করা হয়েছে।’’ এর পরেই তাঁর মন্তব্য, ‘‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী যিনি ‘ভোকাল ফর লোকাল’, যিনি ২০১৪ সালে অর্থনৈতিক ভাবে ১২তম স্থানে থাকা ভারতকে ইতিমধ্যে চতুর্থ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করেছেন, আগামী এক বছরের মধ্যে তৃতীয় অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ হিসেবে পরিণত করবেন, তাঁর দীর্ঘায়ু, সফলতা প্রার্থনা করব। সামরিক শক্তিতে এখন আমরা বিদেশ থেকে অস্ত্র আনি না। ভারতবর্ষের সামরিক শক্তি এত উন্নত জায়গায় গেছে, আমাদের দেশ থেকে আমাদের দেশের বিজ্ঞানীদের তৈরি করা সামরিক সম্ভার আজকে আন্তর্জাতিক বাজারে সমাদৃত। ৬১টি দেশের সঙ্গে ফ্রি ট্রে(মুক্ত বাণিজ্য) এবং ভারতীয় টাকা রুপিকে একাধিক দেশে চালু করার মধ্য দিয়ে ভারতবর্ষকে বিশ্বের সর্বোচ্চ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কাজ যশস্বী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজি করেছেন।’’
উপহারের ই-নিলাম
মোদীর উপহার পাওয়া স্মারক ও উপহার সামগ্রীর অষ্টম দফার ই-নিলাম শুরু হল তাঁর ৭৭তম জন্মদিনে। চলবে আগামী ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত। টানা দেড় মাস চলে এই ই-নিলাম প্রক্রিয়ার বৃহস্পতিবার সূচনা করেন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও জনসভা থেকে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া মোট ১,৪৯৮টি উপহার এ বার সাধারণ মানুষের জন্য নিলামে রাখা হচ্ছে। আমজনতা থেকে শুরু করে স্মারক-সংগ্রাহক— যে কেউ প্রধানমন্ত্রীর স্মারক নিজের সংগ্রহে রাখতে এই ই-নিলামে যোগ দিতে পারবেন। এই ই-নিলাম থেকে সংগৃহীত সমস্ত অর্থ গঙ্গা নদীকে দুষণমুক্ত করার উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের চালু করা ‘নমামি গঙ্গে’ প্রকল্পে দান করা হবে।
নেতানিয়াহুর শুভেচ্ছাবার্তা
৭৭তম জন্মদিনে মোদী শুভেচ্ছাবার্তা পেলেন ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর থেকে। বৃহস্পতিবার নিজের এক্স-হ্যান্ডলে নেতানিয়াহু লেখেন, ‘‘শুভ জন্মদিন, নরেন্দ্র! আপনার নেতৃত্ব ভারতকে একটি বিশ্বশক্তিতে রূপান্তরিত করেছে। আমরা একসঙ্গে আমাদের দু’টি মহান গণতন্ত্রের মধ্যে এক অভূতপূর্ব অংশীদারি গড়ে তুলেছি। ইজ়রায়েল ও ভারতের বন্ধুত্ব এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিবিড়। আমরা তার আরও নিবিড় করব। আমি আপনার দীর্ঘ নেতৃত্ব, সুস্বাস্থ্য ও পরিপূর্ণতা কামনা করছি।’’ মোদী বৃহস্পতিবার রাতে দেশ-বিদেশ থেকে পাওয়া শুভেচ্ছাবার্তার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘সব জায়গা থেকে থেকে যে শুভেচ্ছা, স্নেহ ও আশীর্বাদ অঝোরে এসে পৌঁছেছে, তার জন্য আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আমি উষ্ণতার প্রতিটি শব্দ গভীর ভাবে, সযত্নে ধারণ করি এবং তা মানুষের সেবা করার জন্য আমাকে নতুন শক্তি দেয়। সারাদিন সেবা কাজে নিয়োজিত সকলের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। আসুন, আমরা একসঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে বিকশিত ভারত গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই।’’