পাকিস্তানের সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ঠতা এবং তাদের প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করল ভারত। ভারত সফররত আমেরিকার বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়োকে সেই নিয়ে স্পষ্ট বার্তাও দিয়েছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তবে পাল্টা যুক্তি দিয়ে রুবিয়ো দাবি করেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের এই সম্পর্কের ফলে ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনা করে এমন বেশ কিছু কার্যকলাপ রুখে দেওয়া যেতে পারে, যা নয়াদিল্লির চিন্তার কারণ হতে পারত।
রুবিয়ো এ-ও বলেন, “পাকিস্তান এমন একটি দেশ যার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রাখতেই হবে। এটি এমন একটি দেশ যার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকেও আমাদের তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে।” তবে তিনি এই আশ্বাসও দিয়েছেন যে, পাকিস্তান বা অন্য কোনও দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের প্রভাব কোনও ভাবেই ভারতের উপরে পড়বে না।
অন্য একটি সাক্ষাৎকারে রুবিয়ো আরও বলেছেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলকে ১৯৭০-এর দশকের নিক্সন-কিসিঞ্জার যুগের সঙ্গে তুলনা করাটা যথার্থ নয়, কারণ সেই সময় থেকে এখন বিশ্বব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। রিচার্ড নিক্সন প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন হেনরি কিসিঞ্জার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ার বিষয়ে আমেরিকার নীতিতে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের সামরিক শাসনের প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব দেখা গিয়েছিল।” তিনি এ-ও বলেন, “আমি ১৯৭০-এর দশককে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করব না, কারণ বর্তমান সময় সেই সময়ের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। তখন স্নায়ুযুদ্ধ-সহ এমন অনেক পরিস্থিতি ও সমীকরণ ছিল, যা এখন আর নেই।”
রুবিয়ো এমন এক সময়ে ভারত সফরে এসেছেন, যখন শুল্ক নিয়ে আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে টানাপড়েন চলছে। পাশাপাশি, ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে পাক সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের। এই পরিস্থিতিতে জয়শঙ্কর অবশ্য ২৬/১১-র মুম্বই হামলার কথা তথা পাক মদতপুষ্ট সন্ত্রাসবাদের কথা বার বার মনে করিয়ে দিয়েছেন রুবিয়োকে।
আজ রুবিয়ো ২৬/১১ স্মৃতিসৌধে গিয়েছিলেন। সেখানে এক প্রত্যক্ষদর্শী তথা তাজ হোটেলে সেই সময়ের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সুনীল কুডিয়াদির সঙ্গে রুবিয়োর আলাপ করিয়ে দেন জয়শঙ্কর। ৬০ ঘণ্টা ধরে চলা সেই হত্যাকাণ্ড নিয়ে রুবিয়োকে বিশদে জানান সুনীল। জয়শঙ্কর ওই নিরাপত্তারক্ষীর কথার রেশ ধরে রুবিয়োকে জানান, ওই বিলাসবহুল হোটেলটিকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরেছিল জঙ্গিরা। তবে সেই পরিস্থিতিতেও হোটেলের কর্মীরা পালিয়ে না গিয়ে, সেখানে থাকা অতিথিদের নিরাপত্তা দিতে এগিয়ে এসেছিলেন। সুনীল ছিলেন তাঁদেরই এক জন। উল্লেখ্য, ২৬/১১-র ওই হামলায় প্রাণ যায় ১৬৬ জনের, যাঁদের মধ্যে ৬ জন ছিলেন আমেরিকার নাগরিক। তবে কুডিয়াদির মতো এক জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে রুবিয়োর এই আলাপচারিতার বিষয়টিকে বিচক্ষণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞেরা। তাঁদের মতে, এর মাধ্যমে আমেরিকাকে ভারতের তরফে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া গিয়েছে যে, তাদের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিকে একেবারেই ভাল চোখে দেখছে না নয়াদিল্লি।
আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জয়শঙ্করের স্পষ্ট বক্তব্য, “আমরা আমাদের অংশীদারদের কাছে প্রত্যাশা রাখি যে, তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কোনও রকমের সহনশীলতা দেখাবে না।” তিনি আরও বলেন, “সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করার অধিকারের বিষয়ে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”