সশরীরে নেই। তবু আছেন! সদ্য সমাপ্ত নয়াদিল্লির ব্রিক্স সম্মলনে না-থেকেও ভীষণ ভাবে প্রাসঙ্গিক রইলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ব্রিক্স গোষ্ঠীভুক্ত ১১টি দেশের যৌথ ঘোষণাপত্রে একবারও মার্কিন প্রেসিডেন্টের নামোল্লেখ করা হয়নি। তবে তাঁর একতরফা শুল্কনীতির সমালোচনা করা হয়েছে। প্রাজ্ঞজনেদের দাবি, কূটনীতিতে ইশারাই যথেষ্ট। সেখানে সবকিছু সোচ্চারে বলা হয় না।
তবে ব্রিক্সের ৪৫ পাতার ঘোষণাপত্রে পশ্চিম এশিয়ার সামরিক সংঘাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার বার্তা দেওয়া হয়েছে। ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে যুযুধান সব পক্ষকেই বার্তা দেওয়া হয়েছে ‘যথাসম্ভব সংযত’ হওয়ার। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সেই যৌথ ঘোষণাপত্রে সম্মতি দিয়েছে ব্রিক্সের এমন দুই সদস্যরাষ্ট্র, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত যাদের পরস্পরবিরোধী মেরুতে দাঁড় করিয়েছে। দু’টি দেশের একটি হল ইরান, অপরটি সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। বৈঠকের ফাঁকেই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজ়েশকিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন আমিরশাহীর যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মহম্মদ বিন জ়ায়েদগ আল নাহইয়ান। সেই সাক্ষাতের পর রবিবার ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, “এই বিষয়ে ঐক্যমত্য হয়েছে যে, আমরা পাতা উল্টে ভবিষ্যতের দিকে নজর দেব এবং সেটা সবাই মিলে গড়ে তুলব।”
পশ্চিম এশিয়ার দুই গুরুত্বপূর্ণ দেশ ইরান এবং আমিরশাহি। আমেরিকা এবং ইজ়রায়েলের যৌথ হামলার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে আমিরশাহি, সৌদি আরবের মতো মার্কিন ‘মিত্র’ দেশগুলিতে প্রত্যাঘাত করেছে ইরান। কখনও ইরানের সমর্থনে হামলা চালিয়েছে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিও। এই আবহে এই দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বৈঠক পশ্চিম এশিয়ার মার্কিন ‘খবরদারি’ হ্রাস করছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তাঁর শুল্কনীতির সমালোচনা করা হলেও এখনও ব্রিক্সের বিরুদ্ধে কিছু বলা বা শাস্তিমূলক পদক্ষেপের পথে হাঁটেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
‘বেপরোয়া’ ট্রাম্প
ইরান এবং আমিরশাহির বৈঠক নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রবিবার ট্রাম্প বলেন, “আমি পরোয়া করি না। এটা ওদের ব্যাপার। এইটুকুই।” একই সঙ্গে ট্রাম্প জানান, চলতি বছরের শেষে, আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ইরান যুদ্ধ থেমে যাবে। তার পরেই পেট্রোপণ্যের দাম অনেক কমে যাবে বলে আশাপ্রকাশ করেন তিনি।
পড়শিদের বার্তা ইরানের
আমিরশাহির যুবরাজের সঙ্গে বৈঠকের পর ইরানের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, পশ্চিম এশিয়ার কোনও দেশের সঙ্গেই তাঁদের কোনও সমস্যা নেই। আমিরশাহি-সহ যে পশ্চিম এশিয়ার যে সমস্ত দেশে মার্কিন সেনাঘাঁটি রয়েছে, মূলত সেই সমস্ত দেশেই এতদিন পাল্টা হামলা করেছে ইরান। কিন্তু পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পেজ়েশকিয়ানদের বক্তব্য, কোনও দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে মার্কিন ঘাঁটি থাকা না না-থাকার সম্পর্ক নেই।
জিনপিংকে বার্তা মোদীর
রবিবার ব্রিক্সের দ্বিতীয় দিনের সম্মেলনও শুরু হয় মোদীর ভাষণ দিয়ে। প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব জুড়ে ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং তার মোকাবিলায় ব্রিক্স সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন। তিনি জানান, এর ফলে সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের জীবনের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে, যা একেবারেই কাম্য নয়। তার পরেই প্রযুক্তি এবং দুর্লভ খনিজ সম্পদকে কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মোদী। মনে করা হচ্ছে, এই কথা বলে আদতে সম্মেলনে উপস্থিত চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকেই বার্তা দেন মোদী। বিশ্বে বিরল খনিজের ৯০ শতাংশই আছে চিনের কাছে। আমেরিকার সঙ্গে শুল্কযুদ্ধের আবহে সেই খনিজ রফতানিতে রাশ টানে বেজিং। স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরিতে এই বিরল খনিজ কাজে লাগে।
নিশানায় সেই ট্রাম্প
শনিবার বিকেলে দিল্লি সম্মেলনের ঘোষণাপত্র প্রকাশ করে ব্রিক্স। সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ওই ঘোষণাপত্রে একতরফা ভাবে শুল্ক চাপানোর নিন্দা জানানো হয়েছে। গত এক বছরে বিভিন্ন দেশের উপরে একতরফা ভাবে শুল্ক চাপায় আমেরিকা (পরে তা ‘অবৈধ’ বলে ঘোষণা করে আমেরিকারই সুপ্রিম কোর্ট)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওই শুল্কনীতি বার বার সমালোচিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। ব্রিক্সের ঘোষণাপত্র একতরফা শুল্কের প্রসঙ্গে কোনও দেশের নামোল্লেখ না করলেও নিশানায় যে মার্কিন শুল্কনীতিই, তা স্পষ্ট।