এ বার কি ঘরের পাশেই ঘাঁটি তৈরি করেছে চিনা মাফিয়াদের সাইবার প্রতারণা চক্রের মাথারা? এত দিন মায়ানমার-তাইল্যান্ড সীমান্তের মোয়েয়ি নদীর তীর থেকে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে প্রতারণা করেছে তারা।
সেপ্টেম্বর মাসের গোড়া থেকে প্রতিবেশী বাংলাদেশের দু’টি ঘটনা জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, চিনা মাফিয়াদের এই সাইবার জালিয়াতির কাজকর্ম শুরু হয়েছে বাংলাদেশ থেকে।
১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামে ভারতীয় উপদূতাবাসের খুব কাছেই খুলশি থানা এলাকায় একটি আবাসন থেকে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করেছে সেই দেশের সন্ত্রাস দমন শাখার (কাউন্টার টেররিজ়ম ইউনিট) সদস্যেরা। এদের মধ্যে চিনা ৫ জন, ৩৪ জন লাওসের নাগরিক, পাকিস্তানি ২১ জন। রয়েছেন নেপাল এবং ভিয়েতনামের বাসিন্দাও। চট্টগ্রাম পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সল আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, ধৃতদের কাছ থেকে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ-সহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিন যন্ত্রপাতি উদ্ধার হয়েছে। প্রাথমিক জেরায় স্পষ্ট, অনলাইন প্রতারণার একটি ‘দফতর’ খুলে বসেছিল এরা। বাংলাদেশ পুলিশের ধারণা, ধৃতেরা নিচুতলার কর্মী। তাঁদের কাছ থেকে কোনও পাসপোর্ট পাওয়া যায়নি। ধৃতদের পাসপোর্ট জমা রয়েছে চক্রের মাথাদের কাছে।
চট্টগ্রামের এই গ্রেফতারির কয়েকদিন আগেই কক্সবাজারের একটি বিলাসবহুল রিসর্ট থেকে প্রায় ২ হাজার আইফোন এবং ৪০টি ল্যাপটপ-সহ পাঁচ চিনা নাগরিক এবং তাইওয়ানের এক নাগরিক গ্রেফতার হন।
বাংলাদেশ পুলিশের পাশাপাশি ভারতের সাইবার অপরাধ দমন শাখা ‘১৪সি’ গোটা বিষয়ের উপর নজর রাখছে। ফয়সল আহমেদ চট্টগ্রামের গ্রেফতারির পর জানান, লাওস, কাম্বোডিয়ার মতো দেশে অনলাইন প্রতারকদের বিরুদ্ধে বড় অভিযান চলছে, তাই তারা বাংলাদেশকে চক্র চালানোর জন্য বেছে নিয়েছে।
রাজ্য পুলিশের সাইবার অপরাধ উইংয়ের এক কর্তা বলেন, লাওস, কাম্বোডিয়া ছাড়াও মায়ানমারের তাইল্যান্ড সংলগ্ন কে কে পার্ক এলাকা থেকে চিনা মাফিয়ারা সংগঠিত ভাবে এই প্রতারণা চালায়। সেখানে ভারতীয়-সহ বিদেশিদের ‘সাইবার ক্রীতদাস’ করে রাখার একাধিক ঘটনাও ঘটেছে। সেখানেও চিনের চাপে অভিযান চালাচ্ছে মায়ানমার সেনা। কারণ, এই চক্রগুলোর মাথারা চিনে ‘ওয়ান্টেড’ তালিকায় রয়েছেন। ফলে চক্রের সদর দফতরের জন্য নতুন এলাকা খুঁজছে চিনা মাফিয়ারা।
কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক আধিকারিক বলেন, ‘‘চিনা মাফিয়ারা সেই দেশগুলোকে হেডকোয়ার্টার বানানোর জন্য বেছে নিচ্ছে, যেখানে চিনা লগ্নি বা চিনা প্রকল্প চলছে। কারণ, সেখানে আড়াল সহজলভ্য। এই গোষ্ঠীগুলো শ্রীলঙ্কাতেও ডেরা বেঁধেছিল। কিন্তু শ্রীলঙ্কার সরকার সম্প্রতি বড়সড় অভিযান চালানোয় এ বার ঘাঁটি গেড়েছে বাংলাদেশে।’’
কেন বাংলাদেশ? ভারতীয় গোয়েন্দাদের যুক্তি, চিনা নাগরিকেরা সহজেই বাংলাদেশের ভিসা পান। সম্প্রতি চিনের সঙ্গে একাধিক প্রকল্পের চুক্তি হয়েছে বাংলাদেশের। ফলে চিনা নাগরিকদের বাংলাদেশে ঘাঁটি তৈরি করা সহজ। বাংলাদেশের সাইবার অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে এখনও যথেষ্ট পরিকাঠামো নেই বলে দাবি ভারতীয় গোয়েন্দাদের।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে, এই প্রতারকেরা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মত সমাজমাধ্যমে পর্নোগ্রাফিক বিভিন্ন সাইটের বিজ্ঞাপন দিচ্ছে, যার আড়ালে রয়েছে প্রতারণার ছক। ওই সাইটগুলোতে ঢুকলেই অজান্তেই ম্যালওয়্যারে ভরা এপিকে ফাইল ডাউনলোড হয়ে যাবে এবং গ্রাহকের মোবাইলের নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে প্রতারকদের হাতে। সাইবার অপরাধের পরিভাষায় এই পর্নোগ্রাফিক প্রতারণাকে ‘পিগ বুচারিং’ বলা হয়। ‘১৪সি’ এবং রাজ্যের সাইবার অপরাধ দমন শাখার আধিকারিকদের দাবি, এই প্রতারণার পিছনেও রয়েছে এই চিনা মাফিয়ারা।
চট্টগ্রামে পাকড়াও দলটি ওই বাড়িতে দেড়মাস ধরে ছিল। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা বাংলাদেশের আরও বিভিন্ন অংশে এরকম ভাবে ওই চক্রের সদস্যেরা ছড়িয়ে রয়েছেন এবং স্থানীয় এজেন্টরা এর সঙ্গে যুক্ত। ভারতীয় গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, বাংলাদেশে প্রতারণার মূল কেন্দ্র হলে, ভৌগলিক কারণে ভারতের অনেকেও শামিল হয়ে যেতে পারে এই চক্রে এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় তৈরি হতে পারে ছোট ছোট প্রতারণা কেন্দ্র, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও আশঙ্কার।