৮০তম স্বাধীনতা দিবসের সকালে যিনি বাড়ির ছাদে জাতীয় পতাকা তুলছেন, তিনি কি ভারতীয় নাগরিক? তাঁর কাছে কি নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণেরনথি রয়েছে?
গত বছর স্বাধীনতা দিবসে লাল কেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন, ষড়যন্ত্র করে পরিকল্পিত ভাবে বেআইনি অনুপ্রবেশকারীরা সীমান্তবর্তী এলাকার জনসংখ্যার চরিত্র বদলে দিচ্ছে। এই সমস্যার সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ‘ডেমোগ্রাফি মিশন’ গঠন হয়েছে। কিন্তু বিরোধীরা বলছেন, এক বছর আগে দেশের মানুষের মনে নিজের নাগরিকত্ব নিয়ে সংশয় ছিল না। গত এক বছরে কে নাগরিক ও কোনটি নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি, তা নিয়েই বিভ্রান্তি তৈরি করেছে মোদী সরকার, নির্বাচন কমিশনও। নির্বাচন কমিশন এসআইআর-এর সময়ে বলেছে, আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। আর কেন্দ্রীয় সরকারবলছে, পাসপোর্টেও নাগরিকত্ব প্রমাণ হয় না।
নির্বাচন কমিশন প্রথমে বিহারে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর করেছিল। বিহারে ভোটার তালিকা থেকে ৪৭ লক্ষ নাম কাটা গিয়েছে। তার পরে পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১২টি রাজ্যে এসআইআর-এ আরও ৫.৩৮ কোটি নাম বাদ গিয়েছে। অর্থাৎ, মোট ৫.৮৫ কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটা গিয়েছে এসআইআর-এর প্রথম ও দ্বিতীয় দফায়। তৃতীয় দফায় নির্বাচন কমিশন দিল্লি-সহ ১৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এসআইআর ঘোষণা করেছিল। তার মধ্যে ১২টি-তে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত। এখনও পর্যন্ত বাদ যাওয়ার তালিকায় দেড় কোটি নাম। যার অর্থ, ২৫টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে অন্তত ৭ কোটি নাম ভোটার তালিকা থেকে কাটা যাচ্ছে।
এঁরা কি ভারতীয় নাগরিক নন?
এসআইআর-এর সাংবিধানিক
বৈধতায় সিলমোহর দিয়ে গত মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল, এসআইআর-এ কারও নাগরিকত্ব নির্ধারণ হয় না। নির্বাচন কমিশন নাগরিকত্ব নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া যে সব ব্যক্তি নাগরিক নন বলে নির্বাচন কমিশন মনে করবে, তাঁদের নাগরিকত্ব নির্ধারণের জন্য চার সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠাতে হবে।
কমিশন সূত্রের বক্তব্য, ‘মৃত, গরহাজির, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট’ হিসেবে চিহ্নিত ভোটারদের বাদ দিয়ে যে সব ‘অন্য’ ব্যক্তিদের নাম এসআইআর-এ বাদ গিয়েছে, নির্বাচন কমিশন তাঁদেরই তথ্য নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে পাঠাবে। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকারের ফরেনার্স রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরও) ও ফরেনার্স রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিস (এফআরআরও) নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষমতাপ্রাপ্ত। এরা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ‘ব্যুরো অব ইমিগ্রেশন’-এর অধীনে কাজ করে। পশ্চিমবঙ্গে যাঁদের নাম তথ্যগত অসঙ্গতির জন্য বাদ পড়েছে, এখনও আপিল ট্রাইব্যুনাল তাঁদের ফয়সালা করেনি, তাঁদের নাগরিকত্ব ‘সন্দেহজনক’ তালিকায় থাকছে।
বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে কত জনের নাম পাঠিয়েছে, কত জনের নাগরিকত্ব নির্ধারণ হয়েছে, তার কোনও তথ্যই প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু এসআইআর-এ নাম বাদ পড়া ব্যক্তিরা পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য রেশনের মতো সরকারি সুযোগসুবিধা পাচ্ছেন না। তাঁদের ধরে ধরে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে বলেও প্রচার চলছে। তার মধ্যে নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি কী, তা-ও গুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যাতে অনুপ্রবেশের সমস্যা নিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরিকরে রাখা যায়। এসআইআর-এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলাকারী সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস (এডিআর)-এর অভিযোগ, এ দেশে নাগরিকত্বের নির্দিষ্ট প্রমাণ কী, তা একেবারেই স্পষ্ট নয়। এত দিন পাসপোর্ট নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ বলে ধরা হত। এখন বিদেশ মন্ত্রক বলছে, তা নয়। ফলে দেশের গরিব ও প্রান্তিক মানুষের কাছে নাগরিকত্ব প্রমাণ করা শাস্তিহয়ে উঠছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রের বক্তব্য, কারা ভারতীয় নাগরিক, তা আইনে খুবই স্পষ্ট। প্রথমত, ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি থেকে ১ জুলাই, ১৯৮৭ সালের মধ্যে এ দেশে জন্ম হলে সকলেই ভারতীয় নাগরিক। বাবা-মায়ের নাগরিকত্ব যা-ই হোক না কেন। ১৯৮৭-র ১ জুলাই থেকে ২০০৪-এর ৩ ডিসেম্বরের মধ্যে জন্ম হলে বাবা-মায়ের মধ্যে কোনও একজনকে ভারতীয় নাগরিক হতে হবে। তার পরে জন্ম হলে বাবা-মায়ের এক জনকে ভারতীয় নাগরিক হতেই হবে। অন্য জন বেআইনি অনুপ্রবেশকারী হলে চলবে না। দ্বিতীয়ত, ভারতের বাইরে কারও জন্ম হলেও উত্তরাধিকার সূত্রে নাগরিকত্ব মেলে। তৃতীয়ত, ভারতীয় নাগরিকদের স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান, ভারতীয় বংশোদ্ভূতরা এ দেশের নাগরিক হিসেবে নিজেদের নথিবদ্ধ করতে পারেন। চতুর্থত, টানা ১২ বছর এ দেশে থাকলে প্রাকৃতিক নিয়মে নাগরিকত্ব মেলে। পঞ্চমত, ভারত দেশের বাইরে কোনও ভূখণ্ড অধিগ্রহণ করলে সেখানকার বাসিন্দারা ভারতের নাগরিকত্ব পেতে পারেন।
প্রশ্ন হল, এই নাগরিকত্বের প্রমাণ কী? স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বক্তব্য, কোনও নির্দিষ্ট একটি নথি দিয়ে নাগরিকত্ব প্রমাণিত হয় না। নাগরিকত্ব ঠিক হয় ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী। উপরোক্ত পাঁচটি শর্ত অনুযায়ী যে যে ভাবে নাগরিকত্ব অর্জন করছেন, সেই অনুযায়ী তাঁকে নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি দিতে হবে। কোনও একটি নির্দিষ্ট নথি নাগরিকত্বের অকাট্য প্রমাণ নয়।
গত বছর অগস্টে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সংসদে প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিল, ২০০৪ সালে সংশোধিত ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকার বাধ্যতামূলক ভাবে সমস্ত নাগরিকের নাম নথিবদ্ধ করবে এবং একটি জাতীয় পরিচয়পত্র দেবে। এই প্রক্রিয়া নাগরিকত্ব বিধিতে দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্রের বক্তব্য, গোটা দেশে এনআরসি হলেই এই জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়া হতে পারে।
নাগরিকত্ব নির্ধারণ হওয়ার আগেই কি বাংলাদেশি সন্দেহে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া যায়? আইনজীবীদের বক্তব্য, গত বছর ২ মে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সব রাজ্যের মুখ্যসচিব, পুলিশের ডিজি, সীমান্ত ও উপকূল রক্ষী বাহিনীকে নির্দেশিকা পাঠিয়ে জানিয়েছে, দেশের মধ্যে কাউকে বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা সন্দেহে ধরা হলে বিদেশি আইন ও তার প্রক্রিয়া মেনে তদন্তের পরেই তাঁদের বাংলাদেশ বা মায়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে।