ছাত্রবিক্ষোভের সমাধান ‘লাঠি-ডান্ডা-বন্দুকে’ হয় না— রবিবারই বলেছিলেন ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন। দিল্লি পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিঁধেছিলেন কেন্দ্রকে। তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাল্টে গেল হেমন্তের সরকারের অবস্থান। যে দিল্লি পুলিশের লাঠিচার্জের সমালোচনা করেছিলেন হেমন্ত, সোমবার তাঁরই পুলিশবাহিনীকে দেখা গেল সেই ভূমিকায়। আন্দোলনকারী ছাত্র-যুবদের উপর দফায় দফায় চলল লাঠিচার্জ।
দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভরত ছাত্র-যুবদের উপরে লাঠি চালিয়েছিল পুলিশ। আন্দোলনকারীদের উপরে পেলেট গান থেকে ছর্রা গুলি চালানো হয় বলেও অভিযোগ। তা নিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে লাগাতার কোণঠাসা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। এ বার সেই ‘ইন্ডিয়া’র শরিক ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চা (জেএমএম) সরকারের পুলিশও লাঠিচার্জ করল আন্দোলনকারীদের উপর। চালাল জলকামান। ছুড়ল কাঁদানে গ্যাসের শেল। হেমন্তের পুলিশের এ দিনের ভূমিকায় পাল্টা ‘হাতিয়ার’ পেয়ে গেল বিজেপিও। রাঁচীতে লাঠিচার্জের বিরোধিতা মুখ খুলতে হয়েছে রাহুল গাঁধীকেও।
ঝাড়খণ্ডের পিএসসি এবং এসএসসি পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন পড়ুয়ারা। গত তিন দিন ধরে দফায় দফায় সরকারের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে তাঁদের। রবিবার বৈঠক শেষে হেমন্তের সরকার জানিয়েছিল, ৯৮ শতাংশ সমস্যা মিটেই গিয়েছে। তবে জট ছিল দু’টি বিষয়ে। প্রথমত, সিবিআই তদন্তে দাবি, যাতে রাজি নয় সরকার। দ্বিতীয়ত, জেএসএসসি-সিজিএল পরীক্ষা বাতিলের দাবি। সেটিও মানা সম্ভব নয় বলে জানায় হেমন্তের সরকার। এ অবস্থায় সোমবার সকালে ‘বিধানসভা ঘেরাও’ কর্মসূচির ডাক দেন আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা।
সেইমতো এ দিন সকাল ৭টা থেকেই ঝাড়খণ্ডের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তরুণেরা জড়ো হতে থাকেন রাঁচীর পুরনো বিধানসভা ভবনের কাছে। সেখান থেকেই শুরু হয় নতুন বিধানসভা ভবনের দিকে মিছিল। হাজার হাজার ছাত্র-যুব শামিল হন ওই প্রতিবাদ মিছিলে। কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, কারও হাতে জাতীয় পতাকা, কারও সঙ্গে আবার ভগৎ সিংহের ছবি। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেউ কেউ বর্তমান শাসকদল জেএমএম-এর প্রতিষ্ঠাতা শিবু সোরেনের পোস্টার নিয়েও শামিল হন মিছিলে। অনশনরত ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র মাহাতোও ছিলেন মিছিলে। স্ট্রেচারে করে তাঁকে নিয়ে আসা হয় মিছিলে।
প্রতিবাদী ছাত্র-যুবদের মিছিল ঠেকাতে এ দিন শুরু থেকেই তৎপর ছিল হেমন্তের প্রশাসন। রাস্তায় জায়গায় জায়গায় বসানো ছিল ব্যারিকেড। সাধারণ পুলিশকর্মীর সঙ্গে মোতায়েন ছিল র্যাফ এবং ঝাড়খণ্ড পুলিশের বিশেষ বাহিনী ‘জাগুয়ার’ও। বিক্ষোভকারীরা প্রথম ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করতেই আসরে নামে পুলিশ। ছোড়ে জলকামান। এর মধ্যেও ব্যারিকেড টপকে এগোতে শুরু করেন বিক্ষোভকারীরা। এর পরে দ্বিতীয় ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করতেই শুরু হয় লাঠিচার্জ। পুলিশ এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে শুরু হয় ধস্তাধস্তি। বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাসের শেলও ছোড়ে পুলিশ।
পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামানের মাঝেই শেষ পর্যন্ত বিধানসভা ভবনের কাছে পৌঁছে যান আন্দোলনকারীরা। তবে সে সময়ে বিধায়কেরা বিধানসভা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। বিক্ষোভের জেরে এ দিনের অধিবেশন মুলতুবি করে দেওয়া হয়। সেই থেকে বিধানসভার বাইরেই অবস্থান শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ বিধানসভার সামনে থেকে জমায়েত হটাতে ফের উদ্যোগী হয় হেমন্তের সরকারের পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে আবার লাঠিচার্জ করা হয়। তাতে বিক্ষোভকারীদের জমায়েত কিছুটা হালকা হয়ে যায়।
সোমবার ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেনের জন্মদিন। সে প্রসঙ্গ টেনে এক আন্দোলনকারী বলেন, “তিনি (হেমন্ত) জন্মদিনের অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত। আর আমাদের এখানে ফেলে রেখেছেন। আমরা বৃষ্টিতে ভিজছি, এখানেই শুকোচ্ছি। তার উপরে লাঠিচার্জও হল। কী দারুণ এক উপহার পেলাম।” ধস্তাধস্তিতে বেশ কয়েক জন জখমও হন। আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রতিবাদস্থলে অনেক ছাত্রী এবং তরুণীও রয়েছেন। তবে বিধানসভার সামনে ধস্তাধস্তির সময়ে সেখানে কোনও মহিলা পুলিশকর্মী ছিলেন না বলে অভিযোগ বিক্ষোভকারীদের। অন্য এক আন্দোলনকারী বলেন, “এক দিকে ঝাড়খণ্ড সরকার ‘মহিলা সম্মান যোজনা’র কথা বলে, অন্য দিকে মা-বোনদের উপর চড়াও হয়ে মারধর করে। এদের গায়ে কালো উর্দি পরানো উচিত।”
বাহিনী সংযতই: পুলিশ সুপার
যখন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে বিস্তর অভিযোগ তুলছেন আন্দোলনকারীরা, তখন বাহিনীর প্রশংসাই করতে দেখা গেল রাঁচী (শহর) পুলিশ সুপার পরশ রানাকে। তাঁর মতে, বাহিনী সংযতই ছিল। শুধু আত্মরক্ষার জন্য সামান্য লাঠিচার্জ করেছে। তিনি বলেন, “মিছিল চলাকালীন পুলিশকর্মীদের দিকে পাথর ছোড়া হয়েছিল। তাতে তিন-চার জন পুলিশকর্মী জখম হন। দু’জনের মাথায় সেলাই পড়েছে। বিক্ষোভকারীরা যখন ব্যারিকেড ভাঙছিলেন, তখন তিন জন পুলিশকর্মী পদপিষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। তাঁদের উদ্ধার করতে সামান্য লাঠিচার্জ করতে হয়।” পুলিশ সুপারের কথায়, ৮০-৯০ শতাংশ বিক্ষোভকারী শান্তিপূর্ণ ভাবেই প্রতিবাদ করছিলেন। তবে বাকি অংশ গুন্ডামি এবং বিশৃঙ্খলা শুরু করেছিল। তারাই পুলিশের দিকে পাথর ছোড়ে বলে অভিযোগ। পুলিশ সুপারের দাবি, “এ সবের পরেও পুলিশ যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছে।”
পুলিশকে ‘সার্টিফিকেট’ হেমন্তের
ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্তেরও দাবি, পুলিশ সংযতই ছিল। ছাত্রবিক্ষোভ ‘সংযমী’ এবং ‘দায়িত্বশীল’ ভাবে সামাল দেওয়ার জন্য পুলিশকে ধন্যবাদ জানান তিনি। দিল্লির যন্তর মন্তরে পুলিশের ভূমিকার সমালোচনায় গতকালই তিনি বলেছিলেন, “লাঠি-ডান্ডা-বন্দুকে নয়, আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।” এ বার তাঁর পুলিশই যখন দফায় দফায় লাঠিচার্জ করল, তা নিয়ে নীরব রইলেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে পড়ুয়াদের দাবিদাওয়া গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন হেমন্ত। পরীক্ষা ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে বলে জানিয়েছেন। তবে যে দাবি নিয়ে এ দিন মূলত রাস্তায় নেমেছিলেন পড়ুয়ারা— সেই সিবিআই তদন্তের দাবি প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য করেননি হেমন্ত।
বন্ধের ডাক বিজেপির
প্রশ্নফাঁস বিতর্কে অবিজেপি দলগুলি কেন্দ্রকে যে ভাবে আক্রমণ শানিয়ে যাচ্ছিল, সোমবারের ঘটনায় পাল্টা জবাবের অস্ত্র পেয়ে গেল বিজেপি। পুলিশি লাঠিচার্জের প্রতিবাদে মঙ্গলবার ১১ ঘণ্টার ঝাড়খণ্ড বন্ধের ডাক দিয়েছে বিজেপি। সকাল ৮টা থেকে বিজেপির এই প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হবে। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন বিজেপির নেতারা। নিশিকান্ত দুবে একযোগে বিঁধেছেন কংগ্রেস-জেএমএম-কে। তাঁর কথায়, “এ সব থেকেই বোঝা যায় যে কংগ্রেস এবং জেএমএম গণতন্ত্রকে শ্রদ্ধা করে না। পড়ুয়াদের সম্মান দিতে জানে না। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হল দুর্নীতি করে পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেওয়া।”
বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’কে নিশানা করেছেন বিজেপি সাংসদ তেজস্বী সূর্যও। রাহুলকে বিঁধে তিনি বলেন, “একদিকে রাহুল গাঁধী সংসদে অচলাবস্থা তৈরি করছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাব চাইছেন। অন্য দিকে ঝাড়খণ্ডে তাঁরই জোটের মদতপুষ্ট সরকার ছাত্র-যুবদের উপর লাঠিচার্জ করছে। জলকামান চালাচ্ছে।”
লাঠিচার্জে অস্বস্তি রাহুলেরও
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মুখ খুলেছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুলও। ঝাড়খণ্ড-কাঁটায় বিদ্ধ রাহুলও দাবি করেন, লাঠিচার্জ ঠিক হয়নি। তিনি বলেন, “ঝাড়খণ্ডে প্রতিবাদরত পড়ুয়াদের উপর বলপ্রয়োগ করা অন্যায়। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে পড়ুয়াদের।’’ শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে পুলিশের বলপ্রয়োগ নিন্দনীয় বলেই মনে করেন তিনি। রাহুলের দাবি, আলোচনা প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে। অবিলম্বে তাদের সমস্যার সমাধান করতে হবে হেমন্তের সরকারকে।
হাসপাতালে অনশনকারী দেবেন্দ্র
সোমবার বিকেল পর্যন্তও বিধানসভার বাইরে বিক্ষোভস্থলেই ছিলেন অনশনরত ছাত্রনেতা দেবেন্দ্র। এটি তাঁর অনশনের নবম দিন। সন্ধ্যায় আচমকাই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। বিক্ষোভস্থল থেকে তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান অন্য আন্দোলনকারীরা। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে লাঠিচার্জের বিরুদ্ধে সরব হন তিনি। দেবেন্দ্র বলেন, “ওখানে ব্যারিকেড বসানো হয়েছিল। জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার হয়েছিল। লাঠিচার্জ করা হয়েছিল, তাতে অনেকে জখম হয়েছেন। তবু আমরা সরকারের বিরুদ্ধে একটিও স্লোগান দিইনি।”
গ্রেফতার জেপিএসসির প্রাক্তন প্রধান
বর্তমানে পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত করছে ঝাড়খণ্ডের সিআইডি। ওই তদন্তে এ দিন গ্রেফতার হয়েছেন ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (জেপিএসসি) প্রাক্তন চেয়ারপার্সন এল খিয়াঙ্গতে। তিনি জেএসএসসি-র চেয়ারপার্সন থাকাকালীন অনিয়ম হয় বলে অভিযোগ। ঝাড়খণ্ড সরকারের কালো তালিকাভুক্ত এক সংস্থাকে তিনি পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (জেপিএসসি) নিয়োগ পরীক্ষা সংক্রান্ত কাজকর্মের দায়িত্ব দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। ওই অভিযোগের প্রেক্ষিতেই গ্রেফতার হন খিয়াঙ্গতে।