জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা বলেই কি নয়ডার জেলাশাসক মেধা রূপমের মামলা রস্টার অমান্য করে একটি নির্দিষ্ট বেঞ্চে পাঠানো হচ্ছে? এই প্রশ্ন তুলে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দিল আইনজীবীদের সংগঠন ‘লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর কনস্টিটিউশন’। বুধবার জ্ঞানেশ-কন্যার মামলার শুনানির সময় ভিডিয়ো কনফারেন্সের অডিয়ো মিউট রাখা হয়েছিল। এই বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইনজীবীদের ওই সংগঠনটি।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ, সুপ্রিম কোর্টে গত ১৩ জুলাই থেকে যে রস্টার চালু রয়েছে, তাতে হেবিয়াস কর্পাস এবং সতর্কতামূলক আটক সংক্রান্ত মামলাগুলি প্রথম চারটি বেঞ্চে যাওয়ার কথা। অর্থাৎ প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি বিক্রম নাথ, বিচারপতি বিভি নাগরত্ন এবং বিচারপতি এমএম সুন্দরেশের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে যাওয়ার কথা। বস্তুত নয়ডার যে শ্রমিক বিক্ষোভের সূত্রে জ্ঞানেশ-কন্যা মেধার নাম উঠে আসে, সেই সংক্রান্ত অন্য মামলাগুলি বিচারপতি নাগরত্নের বেঞ্চেই রয়েছে। তা হলে এলাহাবাদ হাই কোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে মেধা এবং উত্তরপ্রদেশ সরকারের দু’টি মামলা একত্রে বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মা এবং বিচারপতি এন কোটিশ্বর সিংহের বেঞ্চে তালিকাভুক্ত হয় কী করে, প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়েই।
আরও পড়ুন:
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কন্যা তথা উত্তরপ্রদেশের নয়ডার (গৌতম বুদ্ধ নগর) জেলাশাসক মেধাকে নিয়ে বুধবার দেওয়া অন্তর্বর্তী নির্দেশ বৃহস্পতিবার সংশোধন করেছে সুপ্রিম কোর্ট।
চলতি বছরে নয়ডায় শ্রমিক বিক্ষোভের সময় বঙ্গতনয়া আকৃতিকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে (এনএসএ) আটক করার নির্দেশ দিয়েছিলেন জ্ঞানেশ-কন্যা। তার পর থেকে টানা পাঁচ মাস বিচারবিভাগীয় হেফাজতে ছিলেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক আকৃতি। গত ২ সেপ্টেম্বর আকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের ধারা বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছিল এলাহাবাদ হাই কোর্ট। ৭ সেপ্টেম্বর আদালতের রায়ের প্রতিলিপি প্রকাশ্যে আসে। জেলাশাসকের ভূমিকা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলে বিচারপতি অতুল শ্রীধরন এবং বিচারপতি অচল সচদেবের ডিভিশন বেঞ্চ।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ জানিয়েছে, মেধার বিরুদ্ধে এলাহাবাদ হাই কোর্টের দেওয়া রায়ের উপর সামগ্রিক ভাবে কোনও স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়নি। বুধবার ঘোষিত অন্তর্বর্তী নির্দেশের ব্যাখ্যাও দিয়েছে বিচারপতি শর্মা এবং বিচারপতি সিংহের বেঞ্চ। জানানো হয়েছে, আপাতত জেলাশাসক মেধার বেতন থেকে ৫ লক্ষ টাকা কেটে নেওয়া এবং তিরস্কারের নির্দেশের উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তবে আকৃতিকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক রাখার নির্দেশ বাতিলের আদেশ বহাল রেখেছে। প্রসঙ্গত, ওই দুই নির্দেশের পাশাপাশি এলাহাবাদ হাই কোর্ট জ্ঞানেশ-কন্যার ‘ভূমিকা’ নিয়ে কড়া পর্যবেক্ষণেরও নির্দেশ দিয়েছিল।
এলাহাবাদ হাই কোর্ট জানিয়েছিল, মেধা একটা ‘দৃষ্টান্ত স্থাপনের’ তাগিদে আকৃতির বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের ধারা প্রয়োগ করতে বলেছিলেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত ‘উপহাসের যোগ্য’। একই সঙ্গে হাই কোর্ট জানায়, মেধা মত প্রকাশের অধিকারে বাধা সৃষ্টি করে তাঁর সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা লঙ্ঘন করেছেন। আকৃতিকে যে ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ উচ্চ আদালত দিয়েছিল, ওই অর্থ মেধা এবং সংশ্লিষ্ট অন্য আধিকারিকদের বেতন থেকে দেওয়ার কথাও বলা হয়। সেই সঙ্গে সামগ্রিক ভাবে আমলাতন্ত্র এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়েও এলাহাবাদ হাই কোর্টের বিচারপতি শ্রীধরন এবং বিচারপতি সচদেবের বেঞ্চের কঠোর পর্যবেক্ষণ ছিল যে, পুলিশ এবং আমলাদের মনে রাখা উচিত, তাঁরা সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ। রাজনৈতিক প্রশাসনের কাছে নয়। তাঁদের এমন আচরণ করা উচিত নয়, যাতে তাঁদের ‘ব্রিটিশ আমলের দমনপীড়নের বাহকের’ মতো দেখায়।
এলাহাবাদ হাই কোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন মেধা। পৃথক আবেদন করে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের সরকারও। বুধবার শুনানিপর্বে শীর্ষ আদালত প্রশ্ন তোলে আটক করার প্রক্রিয়ায় একাধিক স্তরের আধিকারিক যুক্ত থাকলে শুধু জেলাশাসককেই কী ভাবে আলাদা করে দায়ী করা যায়? এর পরে উভয় পক্ষের প্রায় ২০ মিনিট সওয়াল-জবাব শোনার পরে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারির ঘোষণা করে বিচারপতি শর্মা ও বিচারপতি সিংহের বেঞ্চ। বৃহস্পতিবার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তা ব্যাখ্যা-সহ সংশোধন করে শীর্ষ আদালত।