এ বার নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-দের ক্ষমতাবৃদ্ধি চেয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিলেন মহারাষ্ট্রের সিইও। ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, মহারাষ্ট্রের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) এস চোকলিঙ্গম গত ২৪ সেপ্টেম্বর কমিশনের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের এই মর্মে চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে কমিশনের ‘ইসিআইনেট’ সফ্টওয়্যারেও চারটি বদলের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গ, সচিব পর্যায়ের দুই আধিকারিকের পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের সিইও চিঠি দিয়েছেন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্নাকেও। এই সীমার বিরুদ্ধেই ভোটার তালিকা তৈরির উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কায়েমের অভিযোগ তুলেছেন দেশের দুই নির্বাচন কমিশনার। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করা হয়।এসআইআর-পর্বে আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে বয়স বা বাবা-মায়ের নামের ‘ম্যাপিং’ না-হলে সংশ্লিষ্ট ভোটারের নাম তথ্যগত অসঙ্গতি বা ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র জন্য বাদ যাচ্ছে। নির্দিষ্ট নথি নিয়ে নাম তোলার আর্জি জানাতে হচ্ছে সেই ভোটারদের। মহারাষ্ট্রের সিইও-র চিঠিতে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ইআরও-দের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী, নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য কোনও ভোটারকে তলব করতে পারেন ইআরও। নথিপত্র যাচাইয়ের পর ইআরও কী করবেন, তা ইসিআইনেট সফ্টওয়্যারে বলা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে দু’টি বিকল্পের মধ্যে যে কোনও একটি বেছে নিতে বলা হয়েছে ইআরও-দের। কিন্তু যে ভোটারেরা যথাযথ নথি পেশ করেছেন, কিংবা বয়স, অসুস্থতা বা অন্য কোনও কারণে যাঁদের পক্ষে শুনানিতে হাজির হওয়া সমস্যার, তাঁদের ছাড় দেওয়ার কোনও সুযোগ দেওয়া হয়নি ইআরও-কে। তাই মহারাষ্ট্রের সিইও ওই সফ্টওয়্যারে একটি তৃতীয় বিকল্প যুক্ত করার আর্জি জানিয়েছেন, যেখানে লেখা থাকবে, ‘শুনানি থেকে ছাড় দেওয়া হল’।
কোন ১৩টি নথি দেখিয়ে ভোটাররা আর্জি জানাতে পারবেন, তা আগেই জানিয়ে দিয়েছে কমিশন। মহারাষ্ট্রের সিইও কমিশনকে দেওয়া চিঠিতে এগুলির সঙ্গে ‘অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি’কেও যুক্ত করার আর্জি জানিয়েছেন। কারণ তাঁর মতে, গৃহহীন, ভবঘুরে কিংবা যৌনকর্মীরা কমিশন উল্লিখিত বা শুনানির নোটিসে বলে দেওয়া ১৩টি নথি দাখিল করতে ব্যর্থ হতে পারেন।
কোনও কোনও ক্ষেত্রে কেবল বুথ স্তরের আধিকারিক (বিএলও)-দের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’র নিষ্পত্তি করতে পারেন না ইআরও। সে ক্ষেত্রে ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’র জন্য নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের নথি যাচাইয়ের জন্য জেলা নির্বাচনী আধিকারিক বা ডিইও-কে পাঠানো হয়। চিঠিতে মহারাষ্ট্রের সিইও-র আর্জি, নাম বাদ পড়া ভোটারের নথি সন্তোষজনক হলে ইআরও-কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হোক। সে ক্ষেত্রে নথি যাচাইয়ের পর ভোটার তালিকায় কোনও ভোটারের নাম যুক্ত বা বাদ দিতে পারবেন ইআরও।
প্রতিবেদন অনুসারে, মহারাষ্ট্রের সিইও-র দেওয়া চিঠির প্রতিপাদ্য হল, ভোটারদের নাম যুক্ত করা বা বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ইআরও-দের ক্ষমতা দেওয়া হোক। কিন্তু ‘ইসিআইনেট’ সফ্টওয়্যারে ইআরও-দের সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। প্রসঙ্গত, ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধি অনুযায়ী, একটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটার তালিকা তৈরির দায়িত্ব রয়েছে ইআরও-দের হাতে।
ঘটনাচক্রে, মহারাষ্ট্রের সিইও যে দিন কমিশনের কর্তাদের চিঠি দিয়েছেন, তার ঠিক আগের দিন (২৩ সেপ্টেম্বর) ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর তদন্তমূলক একটি প্রতিবেদনকে ঘিরে জাতীয় রাজনীতিতে আলোড়ন পড়ে যায়। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দেশের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশীর অভিযোগ যে, তাঁদের অন্ধকারে রেখে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কমিশনে।
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, দুই নির্বাচন কমিশনারও কমিশনের সফ্টওয়্যার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ইআরও-দের ক্ষমতাবৃদ্ধির কথাও বলেছিলেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই কমিশনারের অভিযোগ, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির বিষয়টি এখন আর বিকেন্দ্রীভূত ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় না। গোটা বিষয়টি নাকি নিয়ন্ত্রণ করেন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা। এমনিতে প্রতিটি নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটার তালিকা তৈরি এবং সংরক্ষণের কাজের দায়িত্ব থাকে নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-দের কাছে। আগে ‘ইআরওনেট’ সফ্টওয়্যারে ভোটার তালিকা থাকত। এখন তা থাকে ‘ইসিআইনেট’-এ। ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন এবং বাদ দেওয়ার কাজে ইআরও-দের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে একাধিক বার প্রশ্ন তুলেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার। অগস্টে দেশের অন্যতম নির্বাচন কমিশনার সঁধু জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী আধিকারিকদের ‘ইআরওনেট’ পোর্টালে ঢোকার অধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সীমা খন্নার ভূমিকা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সঁধু বলেন, “আইন অনুযায়ী তিনি এটি (পোর্টাল) নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।”
প্রতিবেদন অনুসারে, ‘ইআরওনেট’ পোর্টালে এই কেন্দ্রীকরণের ফলেই গোয়ায় বহু মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন। গত ২৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, তথ্যগত অসঙ্গতি, মানে পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে নাম বা বয়সের অমিল থাকা ভোটারদের নথি জমা দেওয়ার ও শোনার সুযোগ দিতে হবে। গোয়ার ইআরও-রা তা শুনে ৯৭ জনকে যোগ্য বলে রায় দেন। কিন্তু সফ্টওয়্যারে সেই রায় লেখার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ১১ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও-র দফতর সে রাজ্যের দায়িত্বে থাকা সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতীকে চার বার চিঠি লিখে, সীমা খন্নাকে সেই চিঠির কপি দিয়ে, রোলব্যাক অপশন চালু করতে বলে। যাতে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মতো বাদ দেওয়া নাম ফেরানো যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও উত্তর আসেনি, নথি জমা দেওয়ার ব্যবস্থাও চালু হয়নি। ৯৭ জন যোগ্য ব্যক্তি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যান।
মহারাষ্ট্রে এসআইআর-এর কাজ চলছে। গত ৩১ অগস্ট সে রাজ্যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। বাদ পড়েছে ২১.১ শতাংশ ভোটারের নাম। আগামী ১৬ নভেম্বরে মহারাষ্ট্রের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে কমিশন।