ভিড়ে উপচে পড়া রামলীলা ময়দানের মঞ্চ থেকে ‘জাতপাত, গাত্রবর্ণ, সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠে’, বিভেদ ভুলে, একজোট হওয়ার আহ্বান জানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, “গণতন্ত্র এবং সংবিধানকে রক্ষা করতে এবং মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে এই লড়াই সকলের। আসুন, আমরা একসঙ্গে দাঁড়াই এবং মিলেমিশে এই লড়াই লড়ি।” পাশাপাশি একই সঙ্গে মঞ্চে পাশে বসা সনিয়া গাঁধীকে তিনি পরামর্শ দিলেন, রাহুল গাঁধীকে জোট চালানোর প্রশ্নে কিছুটা ‘সতর্ক’ হয়ে চলতে, ‘কাউকে মাথায় না তুলতে’। রাজনৈতিক সূত্রে এ কথা জানা গিয়েছে। আজ মঞ্চে সনিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে কিছু কথা বলতে দেখা গিয়েছে মমতাকে। সূত্র জানাচ্ছে, সনিয়াকে মমতা জানিয়েছেন, ‘রাহুলকে বেশি উদার হতে বারণ করাই সমীচীন, কাউকেই যেন মাথায় তোলা না হয়। তৃণমূলও একই কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় ঠকেছে। তাই একটু সতর্ক থাকা ভাল।’
রাজনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, ইঙ্গিত স্পষ্টই বামদের দিকে। তিনি এ কথাও সনিয়াকে বলেন, বাংলায় যে কী পরিমাণ দমন-পীড়ন চলছে, তা বাইরে থেকে বোঝা সম্ভব নয়। অনুষ্ঠান শেষে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার পরামর্শও মমতাই প্রথমে সনিয়াকে এবং পরে রাহুলকে দেন।
‘ইন্ডিয়া’-র গুরুত্বপূর্ণ মহারাষ্ট্রের দুই শরিক নেতা সঞ্জয় রাউত (উদ্ধব শিবসেনা) এবং সুপ্রিয়া সুলেকে (এনসিপি-শরদ) আজ বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি সময়াভাবে। অথচ সিপিআইএমএল-এর দীপঙ্কর ভট্টাচার্য ও তাদেরই ছাত্র নেত্রী নেহা বোরা— দু’জনেই বলেছেন। মহারাষ্ট্রের বিরোধী রাজনীতিতে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তৃণমূলও বিষয়টি ভাল ভাবে নেয়নি। তা সনিয়াকে করা মমতার মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট। সূত্রের মতে, এক দল থেকে দু’জনকে না বলিয়ে, অন্তত সুলেকে বলতে দেওয়া উচিত ছিল, কারণ তাঁর দল ‘ইন্ডিয়া’ থেকে বেরিয়ে বিজেপি-র হাত ধরতে পারে বলে জল্পনা।
তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, এ দিন সমস্ত নেতার মধ্যে একমাত্র মমতাই ককরোচ এবং জেন জ়ি-র উল্লেখ করেছেন। তা-ও একাধিকবার। গত রাতে সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে তৃণমূল নেত্রীর সঙ্গে দেখা করে এক ঘণ্টা বৈঠক করেন। আজ মমতা বলেন, “সিজেপির নেতৃত্ব, জেন জ়ি, ছাত্রছাত্রী এবং তরুণ প্রজন্মকে তাঁদের একতা, সমর্থন ও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতার জন্য অভিনন্দন জানাই।…আমার সমস্ত প্রবীণ ও নবীন সঙ্গীকে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে, কুর্নিশ জানাই। যুবসমাজকে বলতে চাই, আপনারা নেতৃত্ব দিন। আমরা আপনাদের পথ দেখাব, সাহায্য করব, পরামর্শ দেব। কিন্তু ভবিষ্যৎ আপনাদের হাতেই।” গোড়ায় তিনি সনিয়াকে ‘আমার নেত্রী’ বলে উল্লেখ করায় চাঞ্চল্যও ছড়ায়। পরে তৃণমূল তাঁর ভাষণের যে প্রতিলিপি প্রকাশ করে, সেখানে এই অংশটি ছিল না। দল সূত্রে বক্তব্য, এটা মমতা সম্মোধনার্থে বলেছিলেন, তার বেশি কিছু নয়।
মমতার বক্তৃতায় আগাগোড়া হাততালির ঝড়় উঠেছে। স্বভাবসিদ্ধ কিছু হাস্যরসেরও আমদানি করেছেন তিনি তাঁর বলার ঢঙে। বলেছেন, “ভ্যানিশ ভ্যানিশ? হ্যাঁ পাপা! ভোট চুরি? হ্যাঁ পাপা! গণতন্ত্র চুরি? হ্যাঁ পাপা! এর পিছনে কে? বিজেপি পাপা!’’ তার পরে যোগ করেছেন, ‘‘আমরা কি বিজেপিকে চাই? না পাপা! আমরা কি জ্ঞানেশ কুমারকে চাই? না পাপা!”
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে ‘ভোট লুট’ নিয়ে মমতা বলেন, “বাংলা এই এসআইআর প্রক্রিয়ার শিকার। তবু মাথা নত করব না। গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য আমরা প্রাণ দিতেও প্রস্তুত, লড়াইও চালিয়েযাব।’’ প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘এসআইআর মানে কী? বিজেপির কাছে এরঅর্থ, একটি রাজনৈতিক দলকেবিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া! আপনারা কী লুট করেননি! ইভিএম, গণতন্ত্র, সংবিধান... সব। মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছেন, ভোট গণনার প্রক্রিয়াটাও লুট করেছেন।” তাঁর কথায়, “এক সময় আপনারা বলেছিলেন, সবকা সাথ, সবকা বিকাশ। আর আজ মানুষ বলছে, বিজেপির সঙ্গ, সবার সর্বনাশ!’’ মমতা বলেন, ‘‘আপনারা রাম জন্মভূমির নামে তোলা টাকা লুট করেছেন। লুট করেছেন সরকারি কোষাগার। ধর্মের কথা বলেন, অথচ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেন।”
এই প্রসঙ্গে মমতার উল্লেখ করা ‘কাফের’ শব্দটি নিয়ে সরব হয়েছে বিজেপি। রাজ্য বিজেপি নিজেদের এক্স হ্যান্ডলে লিখেছে, ‘‘হিন্দুদের প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘৃণা অত্যন্ত গভীর। তিনি বলেছেন যে ‘কাফেররা’ ভীত। তবে আমরা তাঁর হতাশা বুঝতে পারি। কারণ তাঁর দল ‘কাফেরদের’ হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’’ এর আগেও মমতার এই শব্দটি ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক হয়েছে ২০২৪ সালে অযোধ্যায় রামমন্দিরের ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’ অনুষ্ঠানের দিন। বিজেপি-র বক্তব্য, মমতা পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে উস্কে দিতে এবং তোষণের রাজনীতি করতে এই ধরনের স্পর্শকাতর ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার করেছেন।