প্রয়াগরাজের বিখ্যাত পানের দোকানের নাম ‘সোফিয়া লোরেন্স’। দোকানের মালিক আশি পার করে ফেলা ওমপ্রকাশ চৌরাসিয়া যৌবনে হলিউডের নায়িকা সোফিয়া লোরেনের ভক্ত ছিলেন। সেই থেকে এমন নাম। রাত ১১টার পরেও উপচে পড়া ভিড়। মুখে এক খিলি পান পৌনে এক ঘণ্টা রেখে তার রসাস্বাদন করার শিল্প নিয়ে জোর আলোচনা।
চুরি, ছিনতাই? না। ও সব ভয় নেই।
চৌরাসিয়ার পান খেয়ে রাস্তায় নামলেই প্রয়াগরাজের সিভিল লাইন্সের ভগবান রামমন্দির মার্গ। রাত ১১টাতেও গমগম করছে। ফুটপাথে হাতে মেহেন্দি করাচ্ছিলেন পূজা শুক্ল। ইলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিকারিক। মেহেন্দি করানো শেষ হলে টোটোয় চেপে বাড়ি ফিরবেন। নিরাপত্তা নিয়ে ভয়? ‘বাবার রাজত্বে’ ও সব ভয় এখন অতীত।
বাবা অর্থাৎ যোগী আদিত্যনাথ। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে ২০১৭ থেকে। আগামী বছর ফের বিধানসভা নির্বাচন। সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব মনে করছেন, অযোধ্যায় রামমন্দিরে চাঁদা চুরির ফলে যোগী আদিত্যনাথের জনপ্রিয়তা ধাক্কা খেয়েছে। ভোটে তার ফায়দা মিলবে। কিন্তু উত্তরপ্রদেশে অখিলেশের জোট শরিক কংগ্রেসের নেতাদের অনুমান, রামমন্দিরে চুরির পরেও যোগীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা অটুট। বিশেষত কড়া হাতে আইনশৃঙ্খলা সামলেছেন যোগী। সমাজবাদী সরকারের আমলের গুন্ডাগিরিতে রাশ টেনে নিজের ভোটব্যাঙ্ক তৈরি করেছেন। তাতে ফাটল ধরাতে হলে চাকরির সমস্যা, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের মতো বিষয় তুলে ধরে তরুণ প্রজন্মের হতাশাকে হাতিয়ার করতে হবে। অন্য দিকে সমাজবাদী পার্টির অঙ্ক হল, পিডিএ বা ‘পিছড়ে-দলিত-অল্পসংখ্যক’ ভোটের সঙ্গে রামমন্দিরে চুরি নিয়ে ক্ষুব্ধ ব্রাহ্মণ ভোটকে জুড়তে পারলে লখনউয়ের তখত দখল সহজ হবে। তাই ব্রাহ্মণ সম্মেলন করছেন অখিলেশ। অযোধ্যার প্রাক্তন বিধায়ক, সমাজবাদী পার্টির দাপুটে নেতা পবন পাণ্ডে বলেন, ‘‘আমরা রামমন্দিরের চুরি নিয়ে ঘরে ঘরে প্রচার করব। বিজেপিকে এর খেসারত দিতে হবে।’’
রামমন্দিরে চুরি নিয়ে এই রাজনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যেই নানা হিন্দু সংগঠন মথুরায় শ্রীকৃষ্ণ জন্মভূমিতে মন্দিরের দাবিতে রবিবার থেকে করসেবা শুরু করছে। বিজেপির অঙ্ক হল, অযোধ্যায় রামমন্দিরের জন্য করসেবাকে ঘিরে যেমন হিন্দু ভাবাবেগ তৈরি হয়েছিল, মথুরায় তার পুনরাবৃত্তি হোক। তা হলে উচ্চবর্ণ, ব্রাহ্মণ ভোটের সঙ্গে সমাজবাদী পার্টির যাদব ভোটও ঝুলিতে টানা যাবে। কারণ যাদবরা নিজেদের কৃষ্ণের উত্তরপুরুষ বা যদুবংশী বলে বিশ্বাস করেন।
সমাজবাদী পার্টির নেতাদের অভিযোগ, চাঁদা চুরির সঙ্গে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তথা সঙ্ঘ পরিবারের নেতারা সরাসরি জড়িত। সেই দায় ঝেড়ে ফেলতে তাঁরা এখন অযোধ্যার পরে মথুরাতে মন্দির রাজনীতি শুরু করছেন। যাতে ভোটের সময় ধর্মীয় মেরুকরণ করা যায়। আরএসএসের নেতাদের পাল্টা যুক্তি, সঙ্ঘ সরাসরি কাশী বা মথুরার মন্দির আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হবে না। তবে সরসঙ্ঘচালক মোহন ভাগবত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, সঙ্ঘ যোগ না দিলেও সঙ্ঘের কেউ ব্যক্তিগত ভাবে মথুরা-কাশীর মন্দির আন্দোলনে যোগ দিতেই পারেন।
উত্তরপ্রদেশ প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি অজয় রাই বলেন, ‘‘মানুষের ধর্মীয় আস্থার সঙ্গে প্রতারণা করে বিজেপি এখন ফের ধর্মের রাজনীতি করছে। বাস্তব হল, যোগী জমানায় উত্তরপ্রদেশের যাবতীয় সরকারি বরাত মোদী-শাহের গুজরাতের সংস্থা নিয়ে চলে যাচ্ছে। রাজ্যের জেন জ়ি রোজগারের সুযোগ হারাচ্ছে। মানুষ ভোটে এর জবাব দেবে।’’