পিছন থেকে সরে যাচ্ছে যুব সমাজের একাংশ। নেতা থেকে কর্মী, সকলের উদ্দেশে বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীনের নির্দেশ— কাছে টানতে হবে যুব সমাজকে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, টানবেন কে? তরুণদের কাছে টানতে যে আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন (যিনি দলের সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্যও বটে), নয়া প্রজন্মের তেমন নেতা আর কোথায় বিজেপিতে!
যন্তর মন্তর কাণ্ড ও পরবর্তী সময়ে হওয়া ছাত্র বিক্ষোভের একাধিক ঘটনা থেকে স্পষ্ট, যুব সমাজের বড় অংশের সমর্থন হারিয়েছে বিজেপি। যুব-সমর্থনে নামা সেই ধস এখনই না-আটকালে ২০২৯ সালের লোকসভায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না দল। সেই কারণে গত মঙ্গলবার দলের বিভিন্ন রাজ্যের পর্যবেক্ষক ও সহ-পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে যুব সমাজের মন জেতার উপরে বিশেষ ভাবে জোর দিয়েছেনবিজেপি সভাপতি।
দেড় দশক আগে যুব সমাজকে কাছে টানার প্রশ্নে বিজেপির অন্যতম বাজি ছিলেন নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু যন্তর মন্তরে হওয়া বিক্ষোভের পরে তিনিও খুব স্বস্তিতে নেই। বিরোধী শিবিরের দাবি, মোদী যুব সমাজের আস্থা হারিয়েছেন। ‘ফ্রেন্ডস’ সম্বোধনে ইনস্টাগ্রামে ভিডিয়ো পোস্ট করে জেন-জ়ি-র (জেন জ়ি: এটি আদতে আমেরিকায় বিপণন কৌশলের অঙ্গ হিসাবে বয়সভিত্তিক বিভাজন, ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মানো প্রজন্মকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়) সঙ্গে দূরত্ব কমানোর চেষ্টা প্রধানমন্ত্রী করলেও, দুই তরফের বয়সের পার্থক্য স্পষ্ট। মোদীর সেই ইনস্টাগ্রাম পোস্ট নিয়েও সমাজমাধ্যমে তির্যক মন্তব্য এবং পোস্ট কম হয়নি। ভোটের মাঠে বিজেপি শিবিরের আর এক আগ্রাসী নেতা যোগী আদিত্যনাথ এখন নিজের মুখ্যমন্ত্রিত্ব ধরে রাখতেই বেশি ব্যস্ত। তা ছাড়া যোগী গো-বলয়ের নেতা হিসেবেই বেশি পরিচিত। এ বছরে দায়িত্ব নেওয়া বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীনের বয়স কম হলেও সমস্যা হল, তিনি এমন জনপ্রিয় নেতা নন যে, যুব সমাজকে কাছে টানতে পারবেন।
বিজেপির এক নেতার স্বীকারোক্তি, ‘‘জেন-জ়ি বা যুব সমাজকে তাদের নাড়ি বুঝে কাছে টানতে পারবে, (দলে) এই মুহূর্তে এমন কোনও জাতীয় স্তরের নেতা কার্যত নেই বললেই চলে।’’
বিজেপিতে নয়া প্রজন্মের নেতা হিসেবে সাংসদ অনুরাগ ঠাকুরের কিছুটা জনপ্রিয়তা থাকলেও দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর বনিবনা নেই। বক্তা হিসেবে ঝাড়খণ্ডের গোড্ডার সাংসদ নিশিকান্ত দুবে সপ্রতিভ হলেও, সংসদের বাইরে তিনি কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন, তা নিয়ে দলই সংশয়ে।
অন্য দিকে সম্বিত পাত্র ও বিপ্লব দেবের মতো নেতাদের নিজেদের রাজ্যে প্রভাব থাকলেও জাতীয় স্তরে আবেদন নেই। গুজরাতে হর্ষ সাঙ্ঘভিকে উপমুখ্যমন্ত্রী করে তুলে আনার পরিকল্পনা করেছিল দল। কিন্তু তিনি বেশি ব্যস্ত নিজের মুখ্যমন্ত্রিত্ব নিশ্চিত করতে। তবে এরই মধ্যে বাংলা, হিন্দি, মরাঠি, ইংরেজি-সহ একাধিক ভাষায় আকর্ষণীয় বক্তৃতা দেওয়ায় পারদর্শী স্মৃতি ইরানিকে ফের বিজেপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ফিরিয়ে আনাটা তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগে ইতিবাচক ফল দিতে পারে বলে কেউ কেউ আশাবাদী। তবে তিনি আদৌ তরুণ প্রজন্মকে কাছে টানতে কতটা সফল হবেন তা নিয়ে অনেকই সন্দিহান।
অনেকে মনে করাচ্ছেন, যুব সমাজ পাশ থেকে একেবারেই সরে গেলে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক নির্বাচনে এবিভিপি-র জয় সম্ভব হত না। তবে শুধু ছাত্র-ভোটের আতশকাচে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা বা পরবর্তী লোকসভা ভোট নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারছে না নবীন-শিবির। বরং মনে করা হচ্ছে, দেড় দশকের প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া, গত পনেরো বছরে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠা জেন-জ়ি বা যুব সমাজের বিভিন্ন কারণে বিজেপির উপরে মোহভঙ্গ হওয়ার প্রভাব ভোটযন্ত্রে পড়া অসম্ভব নয়।
উল্টো দিকে ধারাবাহিক ভাবে যুব সমাজের সঙ্গে আলাপচারিতা চালিয়ে তরুণদের মন জিততে কিছুটা হলেও সফল হয়েছেন রাহুল গান্ধী। বিজেপি নেতারাই একান্তে মানছেন, তাঁদের শিবির তরুণ প্রজন্মকে টানতে না-পারায় তরুণদের একটা অংশ ভরসা খুঁজে পেতে চাইছে রাহুল গান্ধী কিংবা ককরোচ জনতা পার্টিতে। এই প্রবণতা না-বদলানো গেলে লোকসভায় ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে দলের কাছে।