রাজধানীর সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলন জম্মু-কাশ্মীরের পুরনো এক স্মৃতিকে উস্কে দিয়েছে। গত ২০ জুলাই যন্তর মন্তর থেকে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি চলাকালীন বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পেলেট গান অর্থাৎ ছররা বন্দুকের ব্যবহার করেছিল দিল্লি পুলিশ। যা মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০১৬ সালের উপত্যকার অস্থির পরিস্থিতির কথা। সেই সময়ে হিজ়বুল মুজাহিদিন কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পরে কাশ্মীর জুড়ে ছড়িয়েছিল তুমুল অশান্তি। প্রায় রোজই বিক্ষোভ-আন্দোলনে শামিল হতেন উপত্যকার যুব সম্প্রদায়ের একাংশ। বিক্ষোভকারীদের ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক ভাবে ছররা গুলি চালিয়েছিল সেই সময়ে। তখনকার বিভিন্ন সরকারি পরিসংখ্যান ও হাসপাতালের তথ্যে হাজার হাজার মানুষের গুরুতর জখম হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ছররার আঘাতে ওই সময়ে কাশ্মীরে এক হাজারেরও বেশি মানুষের চোখ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল কিশোর-কিশোরী।
দক্ষিণ কাশ্মীরের সেডাউ গ্রামের বাসিন্দা ১৪ বছরের ইনশা মুশতাক জানলার বাইরে তাকিয়ে ছিল এক দিন। বিক্ষোভ চলাকালীন এক ঝাঁক ছররা গুলি তার চোখে-মুখে আঘাত করে। আরও এক ভুক্তভোগী, শ্রীনগরের বাসিন্দা ফয়সল তনভিরের বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি নষ্ট গিয়েছে। সেই সময়ে তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। বিক্ষোভ চলাকালীন ছররা গুলি লাগার সেই মুহূর্তটির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার মাথায় তখন একটাই শব্দ এসেছিল, সব শেষ, আমি শেষ।” ঘটনার এত বছর পরেও বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতে গিয়ে তাঁকে হিমশিম খেতে হয়। কারণ বল কত জোরে এগিয়ে আসছে, তিনি আর ঠিক মতো বুঝতে পারেন না। ২৪ বছরের দানিস রাজব জাটও তাঁর বাঁ চোখ হারিয়ে ফেলেছেন। চিকিৎসকেরা কৃত্রিম চোখ বসিয়েছিলেন। তাঁর শরীরে জুড়ে এখনও অসংখ্য ছররা গুলির ক্ষত। অবশিষ্ট চোখ দিয়ে তিনি এখন শুধু ছায়া দেখতে পান। অন্য দিকে, ছররার আঘাতে বারামুলা জেলার আমির কবির বেগের দু’টি চোখই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তিনি এখন প্রায় দৃষ্টিহীন। বললেন, “ভারতের বিভিন্ন জায়গায় অনেকগুলো অস্ত্রোপচার হয়েছে, কিন্তু আমি এখনও ৯০ শতাংশ দৃষ্টিশক্তিহীন।”
শ্রীনগরের সমাজকর্মী শাকিল বেগ অনেক বছর ধরেই ছররার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কাজ করে চলেছেন। আহতদের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘‘এই অস্ত্রগুলি বিক্ষোভকারী এবং সাধারণ পথচারীদের মধ্যে কোনও পার্থক্য করে না। কাশ্মীরে আমরা দেখেছি, শিশু ও ছাত্রছাত্রীরা তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে। এ বার রাজধানী থেকেও একই ধরনের খবর এসেছে।”
২০১৬ সালের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সময়ে শ্রীনগরের এসএমএইচএস হাসপাতালের চিকিৎসকরা ছররাকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করেছিলেন। এখনও অনেক বাসিন্দার শরীরে থেকে যাওয়া ছররা যন্ত্রণা এবং পঙ্গুত্বের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর তরফে বহু দিন ধরেই তাজা গুলির বিকল্প হিসেবে ছররা গুলিকে ‘অ-প্রাণঘাতী’ অস্ত্র (নন লিথাল ওয়েপন) হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও চিকিৎসকেরা সব সময়েই চোখের অপূরণীয় ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরেছেন। নিয়ম অনুযায়ী, ছররা বন্দুক একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে কোমরের নীচে লক্ষ্য করে ছোড়া উচিত। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই নির্দেশ মানা হয় না বলে অভিযোগ।