ক্রমশ পরিধি বাড়ছে পুলিশের ব্যারিকেডের। বাড়ছে বলা ভুল, বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেদিল্লি পুলিশ।
গত কাল সকাল পর্যন্ত ধর্না-মঞ্চের আশপাশে ব্যারিকেড ছিল। তবে সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং আগামিকালের সংসদ অভিযানের প্রেক্ষিতে আজ বিকেলে যন্তর মন্তরে আসা আমজনতাকে জায়গা করে দিতে নিজেদের ব্যারিকেড অন্তত একশো হাত পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে দিল্লি পুলিশ। সরকার-বিরোধী ওই জনতার আক্রোশ ক্রমশ রক্তচাপ বাড়াচ্ছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান তথা নরেন্দ্র মোদী সরকারের। শাসক শিবিরের মতে, ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার বিষয়টি থিতিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সোনমের অনশন বিষয়টিকে ফের উস্কে দিয়েছে। সংসদের আসন্ন অধিবেশনে ধর্মেন্দ্রকে হাতিয়ার করে মোদী সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলার রণকৌশল নিয়ে রেখেছেন বিরোধীরা। এ দিকে, আজ রাতে জল্পনা শুরু হয় যে, সোনম ওয়াংচুক কিছু শর্ত রেখেছেন। সেগুলি মেনে নিলে অনশন তুলে নিতে রাজি আছেন তিনি। এ ব্যাপারে সোনমের স্ত্রী গীতাঞ্জলি জে আংমো জানিয়েছেন, যদি রাজনৈতিক দলের নেতারা সোনমের সঙ্গে দেখা করে আশ্বাস দেন যে তাঁরা সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনে ধর্না-মঞ্চের দাবিগুলি তুলে ধরবেন, তা হলে আগামী বুধবার অনশন তুলেনেবেন ওয়াংচুক।
আজ, রবিবারের ছুটির দিনে যত সময় গড়িয়েছে, ততই ভিড় বেড়েছে যন্তর মন্তর চত্বরে। কে নেই সেই ভিড়ে! প্রবল গরম, প্যাচপ্যাচে আর্দ্রতায় বর্তমান পড়ুয়ার হাতে জলের বোতল তুলে দিয়ে পাশে থাকার বার্তা দিচ্ছেন কলেজ-প্রাক্তনী। আগামিকালের সংসদ অভিযানের প্রয়োজন কেন, তা ভিড়কে বোঝাচ্ছেন জেএনইউয়ের পড়ুয়া ক্ষিতিজ ও আকাঙ্ক্ষা। ছুটির দিন হওয়ায় ছেলে-মেয়েকে নিয়ে যন্তর মন্তরের ভিড়ে পা মেলাতে এসেছিলেন সাহিবাবাদের বাসিন্দা দুষ্মন্ত দাহিয়া। তাঁর কথায়, “এই আন্দোলন আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার জন্য। তাই ওদের নিয়ে এসেছি।” পাশে থাকার বার্তা দিতে আজ দুপুরে ধর্না-মঞ্চে এসেছিলেন আম আদমি পার্টির নেতা মণীশ সিসৌদিয়া। তবে এক দল আপ সমর্থক কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের জায়গায় মণীশকে শিক্ষামন্ত্রী করার দাবি তুলতেই, জনতার একাংশ দাবি তোলেন— ‘দেশের শিক্ষামন্ত্রী কে হবেন, তা জনতাকেই ঠিক করে নিতে দিন’।
আমজনতার ভরসাতেই কাল সকালে সংসদ অভিযানের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি। সোনমকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করার পর থেকে যে ভাবে যন্তর মন্তরে ভিড় বাড়ছে, সেই জনবিস্ফোরণ যদি কাল আছড়ে পড়ে, তা হলে দিল্লির প্রাণকেন্দ্র অচল হয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। যে কারণে আগামিকালের অভিযানের কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। পাশাপাশি, ভিড় নিয়ন্ত্রণে সকালে যন্তর মন্তর সংলগ্ল এলাকায় যাতায়াতে একাধিক নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছে পুলিশ।তবে পরিস্থিতি আগাম আন্দাজ করে ইতিমধ্যেই দিল্লির বাইরে থেকে রাজধানীতে পৌঁছে গিয়েছেন কেউ কেউ। যেমন হরিয়ানার রোহতক থেকে কৃষকদের একটি দল নিয়ে এসেছেন বিক্রম। তাঁর কথায়, “কাল সকালে প্রবেশ করতে দেবে না। তাই রাতে দলবল নিয়ে এখানেই থাকব।” একাধিক ছাত্র সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যেরা যন্তর মন্তরেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিজেপি-র ডাকা সংসদ ভবন অভিযান সফল করার লক্ষ্যে আজ হাসপাতাল থেকে নিজের হাতে চিঠি লিখেছেন সোনম। স্ত্রী গীতাঞ্জলির হাতে পাঠানো এই চিঠিতে সোনম লেখেন, “২০ জুলাই দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন। ভয়মুক্ত ভারত, অন্যায়মুক্ত ভারত গড়ার লক্ষ্যে আন্দোলন।”
কালকের আন্দোলনকে ‘ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে সংসদ অভিযানকে সফল করার জন্য দেশবাসীর উদ্দেশে ডাক দিয়েছেন সোনম। তবে জানা গিয়েছে, কাল আন্দোলনকারীদের যন্তর মন্তর রোডের মধ্যেই আটকে রাখার পরিকল্পনা নিয়েছে প্রশাসন।
নিট কেলেঙ্কারি কাণ্ডে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে গত ২৮ জুন থেকে অনশন করছেন সোনম। গত কাল সকালে দিল্লি পুলিশ তাঁকে জোর করে দিল্লির সফদরজঙ্গ হাসপাতালে নিয়ে গেলেও তাঁর অনশন ভাঙানো যায়নি বলে জানিয়েছেন তাঁর স্ত্রী। এ দিকে ওয়াংচুককে জোর করে দিল্লি পুলিশ হাসপাতালে বন্দি করে রেখেছে বলে দিল্লি হাই কোর্টে যে অভিযোগ করেছিলেন গীতাঞ্জলি, সেই অভিযোগ মানতে চায়নি হাই কোর্ট। আজ সফদরজঙ্গ ও এমসের চিকিৎসকদের বক্তব্য শোনার পরে দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতি মিনি পুষ্কর্ণার বেঞ্চ জানায়, যন্তর মন্তরের ধর্নাস্থল থেকে ওয়াংচুককে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে ভুল করেনি সরকার। তাঁকে হাসপাতালে বন্দিও রাখা হয়নি। আদালতের পর্যবেক্ষণ, স্বাধীন নাগরিক হিসেবে ওয়াংচুক বন্দি নন। শুধু চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি, ওয়াংচুককে কোনও বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করার আবেদনও খারিজ করে দিয়েছে আদালত।