বাঙালির দুর্গাপুজো মানেই নতুন জামাকাপড়, মণ্ডপে মণ্ডপে ঠাকুর দেখা, জমিয়ে খাওয়াদাওয়া আর আড্ডা। কলকাতার বাইরে সেই চেনা উৎসবের স্বাদে মিশে থাকে আরও একটু নস্ট্যালজিয়া, একটু মন কেমন। দূরত্ব যতই থাক, পুজোর ক’টা দিন যেন ফিরে পাওয়া যায় ফেলে আসা শহর, শৈশব আর চেনা বাঙালিয়ানাকে। মুম্বইয়ের দুর্গোৎসবেও তাই আনন্দের সঙ্গে জেগে থাকে কলকাতার স্মৃতি।
চাকরি, ব্যবসা বা নতুন জীবনের সন্ধানে বহু বাঙালি পরিবার বছরের পর বছর ধরে ঘর বেঁধেছে আরব সাগরের তীরে। শহর বদলেছে, বদলেছে জীবনযাপনের ছন্দ, কিন্তু দুর্গাপুজোর টান রয়ে গিয়েছে একই রকম। অন্ধেরী, জুহু, বান্দ্রা, পাওয়াই, লোখণ্ডওয়ালা, ঠাণে ও তার আশপাশের নানা প্রান্তে তাই পুজোর ক’টা দিন অন্য রকম ব্যস্ততা। সারা বছরের কাজের চাপ, অফিসের লক্ষ্যমাত্রা, লোকাল ট্রেনের ভিড় আর যানজট পেরিয়ে বাঙালি মেতে ওঠে ঠাকুর দেখায়, আড্ডায় আর ভোগের লাইনে। প্রবাসের ব্যস্ত জীবনে এই কয়েকটা দিন যেন একটু নিজের মতো করে বাঁচার অবকাশ।
পুজোর আয়োজনে অবশ্য এক ছাঁচের ছবি নেই। কোথাও সাবেকি রীতির নিবিড় টান, কোথাও থিমের অভিনবত্ব, আলোকসজ্জা ও মণ্ডপের চাকচিক্য। বদল এসেছে প্রতিমার রীতিতেও। কিছু ঐতিহ্যবাহী পুজোয় প্রচলিত বাঙালি ধাঁচের দুর্গাপ্রতিমার বদলে শুরু হয়েছে চার হাতবিশিষ্ট নবদুর্গার আরাধনা। তাই পুজোর আয়োজন ঘিরে এখন উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি আলোচনা চলছে ঐতিহ্য, পরিচয় ও পরিবর্তনেরসম্পর্ক নিয়েও।
তারকা-আয়োজিত পুজোর জৌলুস মুম্বইয়ের দুর্গোৎসবের পরিচিত আকর্ষণ। তবে প্রবাসী বাঙালির কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় বেঙ্গলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (পাওয়াই), নর্থ বম্বে সর্বজনীন দুর্গাপুজো (জুহু), নবি মুম্বই বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন (ভাশি), হইচই আনন্দ ফাউন্ডেশন (মাতুঙ্গা), বেঙ্গল ক্লাব (দাদর), আমরা প্রবাসী দুর্গোৎসব (ঠাণে) বা খারের রামকৃষ্ণ মিশনের পুজো। এই সব আয়োজন ঘিরে তৈরি হয় এক একটি ছোট্ট বাঙালি পরিসর। সেখানে প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি বহু দিনের পরিচিত মুখের সঙ্গে দেখা, গল্পে মেতে ওঠা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া আর একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া, সব মিলিয়ে প্রবাসের জীবনে তৈরি হয় আপনজনের উষ্ণতা।
সময়ের সঙ্গে পুজোর উদ্যাপনেও যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। মণ্ডপে ঠাকুর দেখার পাশাপাশি ছবি তোলা, সামাজিক মাধ্যমে মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া, ছোট ছোট ভিডিয়ো তৈরি—উৎসবের স্মৃতি এখন ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই। তবু ঢাকের শব্দে মন কেমন করে ওঠা, ধুনুচি নাচের ছন্দে পা মেলানো বা ভোগের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর আনন্দের কোনও বিকল্প নেই। প্রযুক্তি বদলেছে, উৎসবের প্রকাশ বদলেছে, কিন্তু তার কেন্দ্রে রয়ে গিয়েছে সেই পুরনো টান।
২০২৬ সালের মুম্বই ও ঠাণের দুর্গাপুজো তাই শুধু কয়েক দিনের উৎসব নয়; এ শহরে গড়ে ওঠা বাঙালি জীবনেরও এক প্রতিচ্ছবি। কেউ আসেন মায়ের কাছে প্রার্থনা জানাতে, কেউ খুঁজে ফেরেন ছেলেবেলার পুজো, কেউ বা বন্ধুদের সঙ্গে উৎসব ভাগ করে নিতে। তাঁদের প্রত্যেকের কাছেই মণ্ডপ হয়ে ওঠে পরিচিত এক আশ্রয়— যেখানে দূরত্ব কিছুক্ষণের জন্য মুছে যায়, আর অচেনা শহরেও মনে হয়, নিজের মানুষদের মাঝেই আছেন।
মুম্বইয়ের পুজোর বিশেষত্ব বোধ হয় এখানেই। কলকাতাকে হুবহু ফিরিয়ে আনা নয়, বরং তাকে সঙ্গে নিয়ে নতুন শহরে নিজের মতো করে উৎসব গড়ে তোলা। ঐতিহ্য আর আধুনিকতা, স্মৃতি আর বর্তমান, প্রবাস আর শিকড়—সব মিলিয়েই তৈরি হয় এই দুর্গোৎসব। আর ঢাকের বোলে যখন মন ফিরে যায় কলকাতায়, তখন বোঝা যায়, বাঙালির কাছে পুজোর ঠিকানা শুধু কোনও শহর নয়; তা ছড়িয়ে থাকে মানুষের মনে, সম্পর্কের টানে আর একসঙ্গে আনন্দ করার অমোঘ ইচ্ছায়।