প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে গত ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল থেকে জুন) ৭.৮ শতাংশ আর্থিক বৃদ্ধির হার নিয়ে গোটা দেশের মানুষকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। এ বার মোদী সরকারেরই প্রাক্তন অর্থসচিব সুভাষচন্দ্র গর্গ সেই আর্থিক বৃদ্ধির হার নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন। তাঁর অভিযোগ, গত বছরের এপ্রিল-জুনের জিডিপি কমিয়ে দিয়ে তার তুলনায় এ বছরের এপ্রিল-জুনের জিডিপি-র বৃদ্ধির হার ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হচ্ছে। বাস্তবে আর্থিক বৃদ্ধির হার খুবই সামান্য।
প্রাক্তন অর্থসচিব এই অভিযোগ তোলায় প্রবল অস্বস্তির মুখে মোদী সরকার। এখন সুভাষকে ভুল প্রমাণ করতে মাঠে নেমেছে তারা। প্রথমে কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান মন্ত্রক দীর্ঘ বিবৃতি দিয়েছে। তার পরে কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল থেকে পরিসংখ্যান মন্ত্রকের সচিব সৌরভ গর্গ দাবি করেছেন, সরকারের জিডিপি-র পরিসংখ্যানে কারসাজি নেই।
তাতে অবশ্য প্রশ্নের তির থামেনি। বিশ্বব্যাঙ্কের প্রাক্তন মুখ্য অর্থনীতিবিদ, ইউপিএ সরকারের মুখ্য আর্থিক উপদেষ্টা কৌশিক বসু প্রাক্তন অর্থসচিবের বিশ্লেষণকে সমর্থন করে বলেছেন, দেশে লগ্নির হার বাড়ছে না। সে দিকে নজর দেওয়া জরুরি। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজনের প্রশ্ন, আর্থিক বৃদ্ধির হার সত্যিই এত বেশি হলে আরও ভাল মানের চাকরি তৈরি হচ্ছে না কেন? কেন লগ্নি, বিশেষ করে বিদেশি লগ্নি আরও বেশি করে আসছে না? কেন শিল্পপতিরা বিনিয়োগে আগ্রহী নন?
প্রাক্তন অর্থসচিব গর্গ ঠিক কী বলেছেন? তাঁর বক্তব্য, মোদী সরকার যে ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধির হারের কথা বলছে, তা আসলে মূল্যবৃদ্ধি বাদ দিয়ে বাস্তব আর্থিক বৃদ্ধির হার। যখন জিডিপি হিসাব করা হয়, তা মূল্যবৃদ্ধি-সহ বর্তমান বাজারদরে হিসাব করা হয়। তা ধরলে এ বছরের এপ্রিল-জুনে দেশের জিডিপি ছিল ৮৮.২৭ লক্ষ কোটি টাকা। গত বছর এপ্রিল-জুনে জিডিপি-র পরিমাণ ছিল ৮৬ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু সরকার ফেব্রুয়ারিতে জিডিপি মাপার ভিত্তিবর্ষ ২০১১-১২ থেকে বদলে ২০২২-২৩ করে ফেলেছে। সেই হিসাবে গত বছরের এপ্রিল-জুনে জিডিপি ৮৬ লক্ষ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৮০ লক্ষ কোটি টাকা করে দিয়েছে। এখন তার সঙ্গে এ বছরের এপ্রিল-জুনের ৮৮.২৭ লক্ষ কোটি টাকার জিডিপি-র তুলনা করে বলছে, বর্তমান বাজারদরে জিডিপি ১০.৩ শতাংশ বেড়েছে। তার থেকে মূল্যবৃদ্ধি বাদ দিলে বাস্তবে আর্থিক বৃদ্ধির হার ৭.৮%। আসলে জিডিপি-র বৃদ্ধির হার ২.৬ শতাংশ মতো। গর্গের অভিযোগ, “আর্থিক বৃদ্ধি ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানোর জন্য গত এপ্রিল-জুনে জিডিপি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব হল, বাজারে কেনাকাটা কমেছে।”
প্রাক্তন অর্থসচিবের এই অভিযোগের পরে কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান মন্ত্রক ছ’পৃষ্ঠার বিবৃতি জারি করে বলেছে, ২০১১-১২-কে ভিত্তিবর্ষ ধরে হিসাব করা জিডিপি-র সঙ্গে ২০২২-২৩-কে ভিত্তিবর্ষ ধরে জিডিপি-র তুলনা চলে না। পরিসংখ্যানসচিব সৌরভ গর্গ যুক্তি দিয়েছেন, পরিসংখ্যান নিয়ে কারচুপির অভিযোগ খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আর্থিক বৃদ্ধির হার যে সত্যিই ভাল, তা বোঝাতে তাঁর যুক্তি, “যদি গাড়ি উৎপাদন, সিমেন্ট বা ইস্পাত উৎপাদন দেখেন, তা হলে ১২, ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি দেখতে পাবেন।”
কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশের কটাক্ষ, প্রচারের ঢক্কানিনাদে জিডিপি-র হার চকচকে হতে পারে। তাতে বাস্তব অর্থনীতির ছবিটা বদলাবে না। রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল বলেছেন, “সরকারের মন্ত্রীরা জিডিপি-র পরিসংখ্যান তৈরি করেন না। বিরোধীরা আসলে দেশের মানুষের পরিশ্রমকে খাটো করছেন।” প্রাক্তন অর্থসচিবকে কটাক্ষ করে তাঁর মন্তব্য, “কিছু চাকরিহারা নিজেদের অর্থনীতিবিদ বলে দাবি করে দেশের ক্ষতি করছেন।” কৌশিক বসু অবশ্য প্রাক্তন অর্থসচিবের পাশে দাঁড়িয়ে বলেছেন, “উনি এ সব পরিসংখ্যান খুব ভাল বোঝেন।” তাঁর মন্তব্য, “দেশের বৃদ্ধির সব থেকে বড় চালিকাশক্তি হল বিনিয়োগের হার। ২০০৭ সালে ভারতে বিনিয়োগের হার ৩৮ শতাংশ ছাপিয়ে গিয়েছিল। অন্যান্য এশিয়ান টাইগার-দের সঙ্গে ২০১৩ পর্যন্ত সর্বোচ্চ স্তরে ছিল। তার পরে তা ৩৪%-এ নেমে যায়। সেখানেই আটকে। এ দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।”