মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে বিক্ষোভের জেরে ফের উত্তাল দিল্লি। মঙ্গলবারের পর বুধবারও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে দিল্লির রাজপথে নামলেন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র সাংসদেরা। তবে এ বার তাঁরা সওয়ার হয়েছিলেন বাসে। যন্তর মন্তরের উদ্দেশে। কিন্তু যন্তর মন্তরে যাওয়ার আগেই মাঝপথে বাস আটকে দেয় দিল্লি পুলিশ। বিরোধী সাংসদদের কয়েক জন সে সময় বাসের ছাদেই বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। এর পর রাহুল-প্রিয়ঙ্কা-সহ বিরোধী সাংসদেরা রাস্তায় শুয়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকলে তাঁদের মঙ্গলবারের মতোই টেনে-হিঁচড়ে আটক করে পুলিশ।
সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার দিল্লি যেতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুক্রবার দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’র নেতারা রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছে জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে যাবেন। রাহুল গাঁধী, মল্লিকার্জুন খড়্গে, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, এমএ বেবির সঙ্গে প্রতিনিধিদলে মমতাও থাকবেন বলে জানাচ্ছে কালীঘাট তৃণমূলের একটি সূত্র।
মঙ্গলবার নির্বাচন সদনের উদ্দেশে মিছিল করে যাওয়ার পথে পুলিশের বাধা পেয়ে আকাশবাণী ভবনে সাড়ে ৮ ঘণ্টা অবস্থান-বিক্ষোভ চালানোর পরে আটক হয়েছিলেন রাহুল গাঁধী, প্রিয়ঙ্কা গাঁধী বাড্রা, অখিলেশ যাদব, মহুয়া মৈত্র, সঞ্জয় রাউত, সুপ্রিয়া সুলেরা। সেই ঘটনার জেরে বৃহস্পতিবার রাহুলদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে দিল্লি পুলিশ। যদিও দিল্লির পাশাপাশি বিরোধী জোটের ডাকে বুধবার কলকাতা, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরুর মতো শহরেও বিক্ষোভ হয়। ‘ভোটচুরি’ এবং ‘স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনি কার্যকলাপে’ অভিযুক্ত জ্ঞানেশ দেশ জোড়া এই অশান্তির আবহে তাঁর পূর্বঘোষিত দু’দিনের ছত্তীসগঢ় সফর ‘অনিবার্য কারণে’ স্থগিত করেছেন।
আটকাতে পারল না ‘১৬৩’
বুধবার যন্তর মন্তর অভিযানের আগে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গের আমন্ত্রণে মধ্য দিল্লির জনপথ এলাকার ‘সাগররত্ন’ রেস্তরাঁয় যান বিরোধী সাংসদেরা। এসআইআর-বিতর্কের আবহে নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ পদাধিকারীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসতে চাইছেন বিরোধী সাংসদেরা। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সময় চেয়ে তাঁকে চিঠি দিতে চলেছে ‘ইন্ডিয়া’। প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, সেই চিঠির খসড়া চূড়ান্ত করতেই বুধবারের ওই মধ্যাহ্নভোজ-বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। খড়্গে জানান, জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ চেয়ে দেশ জুড়ে যে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলছে, তাতে পরবর্তী রণকৌশল কী হবে, তা ঠিক করতেই বৈঠকে বসেছিলেন তাঁরা। এর পাশাপাশি জ্ঞানেশের ‘কীর্তিকলাপের’ প্রমাণ পেশের জন্য রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছেও সময় চেয়েছেন তাঁরা।
ওই রেস্তরাঁ থেকেই তিনটি বাসে চেপে যন্তর মন্তরের উদ্দেশে রওনা দেন বিরোধী সাংসদেরা। সে সময় বিশাল পুলিশবাহিনী তাঁদের পিছু নেয়। দিল্লি পুলিশ ভারী ব্যারিকেড দিয়ে যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ করে আটকায় রাহুলদের বাস। বিরোধী সাংসদেরা পৌঁছোনোর আগেই যন্তর মন্তরে ১৬৩ ধারা (পূর্বতন ১৪৪ ধারা) জারি করেছিল দিল্লি পুলিশ। ফলে সেখানে আইনত জমায়েত নিষিদ্ধ ছিল। দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার সচিন শর্মা জানিয়েছিলেন, যন্তর মন্তরে ১৬৩ ধারা জারি থাকায় কেউ আগাম অনুমতি ছাড়া জমায়েত করতে পারবেন না। তবে বিক্ষোভকারী সাংসদদের পদাধিকারের কথা মাথায় রেখে পুলিশের নির্দিষ্ট বিধি মেনে যথাযথ আচরণ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু মঙ্গলবারের পরে বুধবারও দেখা গিয়েছে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত রাহুল এবং তাঁর সঙ্গী সাংসদদের উপর যথেচ্ছ বলপ্রয়োগ করেছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নিয়ন্ত্রণে থাকা দিল্লি পুলিশ! আটক করার পরে রাহুলকে নিয়ে যাওয়া হয় বারাখাম্বা রোড থানায়। প্রিয়াঙ্কা-সহ অন্য বিরোধী সাংসদদের ছত্রসাল স্টেডিয়ামে। রাত ৮টার কিছু পরে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
রাহুল-প্রিয়ঙ্কাদের বিরুদ্ধে এফআইআর
দিল্লি পুলিশ সূত্রের খবর, মঙ্গলবার দুপুরে ‘ইন্ডিয়া’র নির্বাচন সদনমুখী মিছিল থেকে হঠাৎই দিল্লি আকাশবাণী ভবন চত্বরে ঢুকে পড়েছিলেন রাহুলেরা। তার জন্য আগাম কোনও অনুমতি নেননি তাঁরা। এই সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়ার পরেই বুধবার রাহুল-প্রিয়ঙ্কা-সহ বিরোধী সাংসদদের বিরুদ্ধে এফআইআর করে দিল্লি পুলিশ।
পুলিশের বক্তব্য যে, রাহুলদের বার বার ওই জায়গা থেকে উঠে যাওয়ার আর্জি জানানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা তাতে রাজি হননি। রাহুলদের দাবি ছিল, আগে সাংসদদের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকদের দেখা করতে হবে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, তাদের হস্তক্ষেপেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। শেষমেশ আকাশবাণী ভবন চত্বর থেকে রাহুল-প্রিয়ঙ্কাকে সরিয়ে নিয়ে যায় পুলিশ। তাঁদের আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় নিউ পুলিশ লাইন্সে। পরে সেখান থেকে রাহুলদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
নেই অখিলেশরা, নরম ডিএমকে
মঙ্গলবার ‘ইন্ডিয়া’র নির্বাচন সদন অভিযানে সক্রিয় ভাবে অংশ নিয়েছিলেন অখিলেশ যাদব-সহ সমাজবাদী পার্টির সাংসদেরা। কিন্তু বুধবার খড়্গের মধ্যাহ্নভোজ এবং ‘ইন্ডিয়া’র যন্তর মন্তর অভিযানে দেখা গেল না তাঁদের। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে রাহুল এবং প্রিয়ঙ্কা যে ভাবে আন্দোলনের ‘মুখ’ হয়ে উঠছেন, তা নিয়ে বিজেপির পাশাপাশি চাপে সমাজবাদী নেতৃত্বও। উত্তরপ্রদেশে ভোটের আগে তাই কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল নিয়েছেন তাঁরা। তবে অখিলেশের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানাচ্ছে, খড়্গের মধ্যহ্নভোজে ‘যথাযথ ভাবে’ আমন্ত্রণ জানানো হয়নি কংগ্রেসের তরফে। সেকারণেই তাঁরা যাননি।
গত ২০ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে ‘ইন্ডিয়া’র বৈঠকেই জ্ঞানেশের অপসারণের দাবিতে এবং এসআইআর-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ২ অক্টোবর থেকে ৮ অক্টোবর (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত দেশজুড়ে ‘গণতন্ত্র বাঁচাও’ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল। সেই বৈঠকে ছিলেন অখিলেশও। এই পরিস্থিতিতে বুধবার তাঁদের অনুপস্থিতি ইঙ্গিতবাদী কি না, তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।
অন্য দিকে, তামিলনাড়ুতে বিধানসভা ভোটের পরে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা ডিএমকে বুধবার সরাসরি জ্ঞানেশ-বিতর্কে রাহুলের পাশে দাঁড়িয়েছে। দলের মুখপাত্র মুখপাত্র টিকেএস এলাঙ্গোভান বলেছেন, ‘‘জ্ঞানেশ কুমার একটি উচ্চ পদে রয়েছেন। তিনি যদি গণতন্ত্রবিরোধী হন, তা হলে নির্বাচন কী ভাবে সুষ্ঠু হতে পারে? তাঁকে অবশ্যই সরিয়ে দেওয়া উচিত। সরকারের অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করা নাগরিকদের অধিকার, আর রাহুল গাঁধী সেটাই করছেন। জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে রাহুল আন্দোলন করুন, তা এই সরকার চায় না। তাই তাঁকে আটকানো হচ্ছে।’’ ঘটনাচক্রে, মঙ্গলবারই ডিএমকের আর এক মুখপাত্র সরবনন আন্নাদুরাই অভিযোগ করেছিলেন, তামিলনাড়ুতে এসআইআর-পর্বে অনিয়ম নিয়ে রাহুল নিশ্চুপ ছিলেন! কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অবস্থান বদলাল এমকে স্ট্যালিনের দল।
‘ভোটচুরি’র বিরুদ্ধে এ বার বন্ধ
এসআইআর-এ জালিয়াতি এবং ভোটচুরির প্রতিবাদে এ বার ১২ ঘণ্টা ওড়িশা বন্ধের ডাক দিল বিরোধী দলগুলি। ‘ইন্ডিয়া’র শরিক কংগ্রেস এবং বাম দলগুলির পাশাপাশি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কের দল বিজেডি-ও শামিল হচ্ছে বৃহস্পতিবারের এই বন্ধে! খনি আইন সংশোধনের দাবি, স্কুলের পাঠ্যবইয়ে বিকৃতির অভিযোগও তুলেছে বিরোধী শিবির।
জ্ঞানেশ-বিরোধী বিক্ষোভ কলকাতাতেও
‘ভোট চুরি’র প্রতিবাদ এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশের ইস্তফার দাবিতে কংগ্রেসের লোকভবন অভিযানে ধস্তাধস্তি বাধল পুলিশের সঙ্গে। কলকাতার চারটি জেলা কংগ্রেস কমিটি মিলিত ভাবে বুধবার লোকভবন অভিযানের ডাক দিয়েছিল। বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে জমায়েত করে লোকভবনের দিকে এগোচ্ছিলেন দলের কর্মী-সমর্থকেরা। লোকভবনের সামনের রাস্তায় ব্যারিকেড ভেঙে মিছিল এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি বাধে কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকদের। টেনে-হিঁচড়ে বিক্ষোভকারীদের ভ্যানে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ।
সফর স্থগিত জ্ঞানেশের
তাঁকে অপসারণ করার দাবিতে বিদ্রোহের ঝাঁঝ ক্রমশ বাড়ছে। এই আবহে দু’দিনের ছত্তীসগঢ় সফর স্থগিত রাখলেন জ্ঞানেশ কুমার। বুধবার নির্বাচন কমিশনের অন্য শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে ছত্তীসগঢ়ে যাওয়ার কথা ছিল দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের। কিন্তু ছত্তীসগঢ়ের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও)-এর দফতর থেকে জানানো হয়েছে, ‘অনিবার্য কারণে’ জ্ঞানেশের এই সফর স্থগিত রাখা হচ্ছে।
এর আগে উত্তরপ্রদেশে জ্ঞানেশের দু’টি কর্মসূচি স্থগিত হয়েছিল। ঘটনাচক্রে, সফর বাতিলের আগেই জ্ঞানেশকে ইস্তফার জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। উত্তরপ্রদেশের পর মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের লাদাখ, হিমাচল প্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ড সফরও স্থগিত হয়। এ বার স্থগিত হল ছত্তীসগঢ় সফর।
ছত্তীসগঢ় প্রশাসন সূত্রে খবর, দু’দিনের সফরে দন্তেওয়াড়ার দন্তেশ্বরী মন্দিরে যেতেন জ্ঞানেশ। বস্তারের চিত্রকোট জলপ্রপাত দেখে কবীরধাম জেলার ভোরামদেও মন্দিরে যাওয়ার কথা ছিল তাঁর। জ্ঞানেশকে রাজ্যের অতিথি হিসেবে আপ্যায়ন করার পরিকল্পনা করেছিল ছত্তীসগঢ়ের বিজেপি সরকার। সেই মতো প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। জ্ঞানেশকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত ছিলেন রায়পুর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসনও। ছত্তীসগঢ়ের সিইও দফতরের তরফে জানানো হয়েছে, জ্ঞানেশের পরিবর্তিত সফরসূচি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। পরে এই বিষয়ে জানানো হবে।
ককরোচ আবার যন্তর মন্তরে
জ্ঞানেশের পদত্যাগের দাবিতে আগামী শনিবার থেকে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ শুরু করার কথা জানিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। তবে ওই কর্মসূচির আগেই তাদের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেফতার করা হতে পারে বলে ইতিমধ্যেই আশঙ্কাপ্রকাশ করেছে সিজেপি। তবে কেন্দ্রের সরকার এই ধরনের পরিকল্পনা করে থাকলে ভুল করবে বলে দাবি সিজেপি নেতাদের।
তিন মাস আগে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র ধর্না-বিক্ষোভের সময় ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছিল যন্তর মন্তর রোডকে। বন্ধ করা হয়েছিল সাধারণ যানবাহন চলাচল। শুক্রবার সকালেও দেখা গিয়েছে একই চিত্র। ১৬৩ ধারা জারি করে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও র্যাফ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে সেখানে। মোতায়েন হয়েছে, ৩৬০ ডিগ্রিতে কাঁদানে গ্যাস ছো়ড়ার উপযোগী ‘মাল্টি ব্যারেল শেল লঞ্চার’ বসানো হয়েছে গাড়ি ‘বজ্র’ এবং জলকামানবাহী ‘বরুণ’। প্রসঙ্গত, ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনকে ঘিরে তোলপাড় জাতীয় রাজনীতি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই কমিশনার, সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশীর অভিযোগ, তাঁদের অন্ধকারে রেখে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা রক্ষা, বেআইনি ভাবে ৬ নম্বর ফর্মের বয়ান বদল, এসআইআর-এর পর ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া এবং যুক্ত করা সংক্রান্ত একাধিক বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন সঁধু এবং জোশী। গত ১০ মাসে ১৪ বার কমিশনের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছেন তাঁরা। বিতর্কের মুখে কমিশনের ব্যাখ্যা, নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে মতবিরোধ থাকলেও ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিশন এই ব্যাখ্যা দিলেও বিতর্ক থামেনি।
সুপ্রিম কোর্টে জ্ঞানেশ-‘বিভাজন’
২০২৩ সালে পাস হওয়া মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মামলাগুলি পাঁচ বিচারপতির বৃহত্তর সংবিধান বেঞ্চে পাঠানো উচিত কি না, তা নিয়ে সহমত হতে পারেননি সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি। দুই বিচারপতির সেই খণ্ড-রায়কে পুনর্বিবেচনার আর্জি জানিয়ে দেশের প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন, ওই আবেদনটি পুনর্বিবেচনা করে দেখা হবে।
২০২৩ সালের ওই নির্দেশের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক আবেদন হয়েছিল শীর্ষ আদালতে। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মাকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ পাঁচ দিন ধরে ওই মামলার শুনানিশেষে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করে গত ২৩ সেপ্টেম্বর। বিচারপতি দত্ত বলেন, ‘‘আমরা যদি সর্বসম্মত রায় দিতাম, তবে তা প্রাতিষ্ঠানিক সংহতির স্বার্থেই হত। দুর্ভাগ্যবশত, এখানে মতপার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্যের কারণেই আমাকে আরও বিস্তারিত একটি নির্দেশনামা লিখতে হয়েছে।’’
বস্তুত, বিচারপতি দত্ত কেন্দ্রের ওই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যেখানে বলা হয়, আবেদনগুলি সাংবিধানিক গুরুত্বের মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। তাই সেগুলিকে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো উচিত। বিচারপতি শর্মা আবার বিচারপতি দত্তের সঙ্গে একমত হননি। কিন্তু উভয় বিচারপতিই একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে এবং সাংবিধানিক বিষয় নিষ্পত্তির জন্য সেই বেঞ্চকে স্থায়ী করা যায় কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রশাসনিক দিকটি দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছে পাঠাতেই সম্মত হন।
বিচারপতি দত্ত মন্তব্য করেন, ‘‘বিচারকেরাই বিচারক নিয়োগ করেন— এটা অলীক ধারণা। দীর্ঘদিনের প্রচলিত এই ভুল ধারণা দূর করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।’’ তাঁর অভিযোগ, স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে একটি বয়ান ছড়িয়েছে এবং তাঁরা প্রায়শই বিচার বিভাগীয় নিয়োগ সংক্রান্ত কিছু বিতর্কিত রায় থেকে শক্তি সঞ্চয় করে আসছেন। প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ২ মার্চ দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং নির্বাচন কমিশনারদের (ইসি) নিয়োগকে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে একটি রায়ে পাঁচ বিচারপতির একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ এই সিদ্ধান্ত দেয় যে, প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং দেশের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত একটি কমিটির পরামর্শে রাষ্ট্রপতি তাঁদের নিয়োগ করবেন।
নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব প্রসঙ্গে বিচারপতি দত্ত ক্রিকেটের উদাহরণ টানেন। তাঁর কথায়, “যে দল ব্যাট করবে, তারাই যদি আম্পায়ার নির্বাচন করে, তবে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এমনকি, আম্পায়ার যদি সঠিক সিদ্ধান্তও নেন, তার পরেও তাঁর নিরপেক্ষতা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়।’’ তাঁর ব্যাখ্যা, এ ধরনের আম্পায়ার সবসময় একটি দলের প্রতিই অনুগত বলে সন্দেহ করা হয়। নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ প্রক্রিয়াও এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হওয়া উচিত, যাতে তাঁদের স্বাধীনতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনও সন্দেহ না থাকে। বিচারপতির পর্যবেক্ষণের সারমর্ম— নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন হতে হলে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে হবে। তাঁর মন্তব্য, ‘‘অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন একটি সত্যিকারের স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের উপর নির্ভর করে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন হওয়াই যথেষ্ট নয়, তাকে স্বাধীন বলে প্রতীয়মান হতে হবে।’’