‘ভোটচুরি’র অভিযোগ তুলে পথে নেমেছেন রাহুল গাঁধী। প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দিকে আঙুল তুলে মঙ্গলবার সকালে সংসদ ভবন থেকে নির্বাচন সদনের দিকে মিছিল করেন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সাংসদেরা। কিন্তু তাঁদের নির্বাচন সদন পর্যন্ত যেতে দেয়নি পুলিশ। তার আগেই আটকে দেয়। আটকও করে বেশ কয়েক জনকে। এরই মধ্যে রাহুল ঢুকে পড়েন নির্বাচন সদনের কাছে আকাশবাণী অফিস চত্বরে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানেই বসে রয়েছেন তিনি। সঙ্গে রয়েছেন প্রিয়ঙ্কা গাঁধী। আকাশবাণী অফিস চত্বর থেকেই নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, মোহন ভাগবত এবং জ্ঞানেশ কুমারকে এক বন্ধনীতে ফেলে আক্রমণ শানান তিনি। দাবি করেন, জ্ঞানেশের সঙ্গে দেখা করে তাঁরা বলবেন যে, তিনি ‘ভোটচুরি’ করেছেন।
মঙ্গলবার রাহুল আকাশবাণীর সামনে বসে বলেন, ‘‘সাংসদেরা জ্ঞানেশের সঙ্গে দেখা করবেন। গোটা দেশের কণ্ঠরুদ্ধ করা হয়েছে। আমরা জ্ঞানেশের সঙ্গে দেখা করতে বলতে চাই, আপনি ভোটচুরি করেছেন। এখানে বসে থাকতে আমাদের কোনও অসুবিধা নেই।’’ তিনি জানিয়েছেন, সেখানে তাঁদের বসায় যদি কোনও সমস্যা হয় প্রশাসনের, তা হলে একটি জায়গা দেখিয়ে দেওয়া হোক, যেখানে তাঁরা অবস্থান বিক্ষোভ করবেন।
এ দিন বিরোধীদের নির্বাচন সদন অভিযান ঘিরে যে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়, যে ভাবে পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে আকাশবাণী অফিসে ঢোকার চেষ্টা করেন রাহুল, তা নিয়ে খোঁচা দিতে শুরু করেছে বিজেপি। পদ্মশিবিরের দাবি, রাহুলকে ফের এক বার রাজনীতিতে ‘লঞ্চ’ করার চেষ্টা করছে কংগ্রেস। বিজেপির ওই খোঁচা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রাহুল বলেন, “বিজেপি কী বলল, তাতে আমার কিছু যায়-আসে না। আমরা শুধু ওদের মোকাবিলাই করছি না। আমরা ওদের ধ্বংস করে দেব।”
মঙ্গলবার সকাল ১১টা নাগাদ সংসদের মকরদ্বার থেকে নির্বাচন সদন অভিমুখে মিছিল শুরু করেন ‘ইন্ডিয়া’র প্রায় ৩০০ সাংসদ। প্রিয়ঙ্কা, মল্লিকার্জুন খড়্গেদের পাশাপাশি রাহুলের সঙ্গে ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র, ডেরেক ও’ব্রায়েন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, সুপ্রিয়া সুলে-সহ বিরোধী শিবিরের বিভিন্ন নেতারা। নির্বাচন সদনের অদূরে নীতি আয়োগের অফিসের সামনে বিরোধী সাংসদদের আটকে দেয় পুলিশ। সেখানেই বসে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন রাহুল, অভিষেকরা। সেখান থেকে প্রিয়ঙ্কা-সহ বেশ কয়েক জনকে আটকও করে পুলিশ। পরে আবার তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এরই মধ্যে আকাশবাণী অফিস চত্বরের ভিতর দিয়ে নির্বাচন সদনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করেন রাহুল। কিন্তু সেখানেও পুলিশ তাঁকে আটকে দেয়। তত ক্ষণে প্রিয়ঙ্কা-সহ আরও কয়েকজন সাংসদ পৌঁছে যান আকাশবাণী অফিস চত্বরে। দুপুরে আকাশবাণী অফিস চত্বর থেকেই সাংবাদিকদের উদ্দেশে রাহুল বলেন, “আমি এখানে আছি দেশের গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য। আমার সঙ্গে আরও ৩০০ জন সাংসদ এখানে এসেছিলেন। তাঁরাও গণতন্ত্রকে বাঁচাতে চান। অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদী, মোহন ভাগবত এবং জ্ঞানেশ কুমার দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছেন।”
আরও পড়ুন:
এর পরেই তাঁর সংযোজন, “নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ এবং মোহন ভাগবত ‘ভোট চুরি’ করে দেশকে ‘হাইজ্যাক’ করে নিয়েছেন। জ্ঞানেশ কুমার তাঁদের সাহায্য করেছেন। তাঁদের সকলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে। তাঁরা আমাদের দেশের সঙ্গে যা করেছেন, তা বিশ্বাসঘাতকতা। কেউ-ই পার পাবেন না”
বিরোধী শিবিরের এত জন সাংসদ দেখা করতে চাইলেও জ্ঞানেশ কেন তাঁদের সঙ্গে দেখা করছেন না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন রাহুল। তিনি বলেন, “আমরা প্রায় ৩০০ জন সাংসদ জ্ঞানেশ কুমার এবং অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পুলিশ আমাদের এখানেই আটকে দিয়েছে। আমরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। অথচ কেন আমাদের এখানে আটকে রাখা হল, তা আমরা জানি না। নির্বাচন কমিশন মাত্র ৫০ গজ দূরে রয়েছি আমরা। কোথায় সমস্যা, আমরা বুঝে উঠতে পারছি না। বিরোধী দলের ৩০০ সাংসদ জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন, কিন্তু তিনি ভয় পেয়ে রয়েছেন। দেশে কী হচ্ছে? নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে যদি নির্বাচন কমিশন দেখাই না করে, তা হলে গণতন্ত্রের মানে কী!”
কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি খড়্গে এ দিন মিছিলে বলেন, “আমাদের লড়াই অবিচারের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতার পর আমরা যে সর্বজনীন ভোটাধিকার পেয়েছিলাম, সরকার তা খর্ব করার চেষ্টা করছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার সরকারের হাতের পুতুল হয়ে গিয়েছেন। মোদী ও শাহ যা বলেন, তিনিও তা-ই করেন। এমনটা চলতে থাকলে একনায়কতন্ত্রের সূচনা হবে। এর বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই জারি থাকবে।”
জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে এ দিন মিছিল থেকে সুর চড়ান অভিষেকও। তাঁর অভিযোগ, “পশ্চিমবঙ্গে একতরফা ভাবে ৯০ লক্ষ লোককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। ট্রাইবুনালে এখনও পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ আবেদন অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।” জ্ঞানেশের গ্রেফতারির দাবি তুলে অভিষেক বলেন, “নির্বাচন কমিশনের চুরি ধরা পড়ে গিয়েছে।”
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ বলেন, “নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অতীতেও অভিযোগ উঠেছে। ২০১৭, ২০১৯, ২০২২ এবং ২০২৪ সালে কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল। এ বার তো পশ্চিমবঙ্গে ওরা পুরো নির্লজ্জের মতো আচরণ করেছিল।”
এ দিনের মিছিলে রয়েছেন কালীঘাট তৃণমূলের মহুয়া মৈত্র, সৌগত রায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন, রাজীব কুমার, কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা পি চিদম্বরম, এনসিপি (শরদ)-এর সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে, আরজেডির মনোজ ঝা-সহ বিরোধী জোটের অন্য সাংসদেরাও।