বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য মূলত দায়ী করা হয় কারখানা, যানবাহনের ধোঁয়াকেই। কিন্তু নজরের আড়ালে বিশ্বের কৃষিজমি থেকে প্রতি বছর কোটি কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড বেরিয়ে মিশে যাচ্ছে বাতাসে। বিজ্ঞানীদের দাবি, এটাই বিশ্ব উষ্ণায়নের বড় কারণ। এই অদৃশ্য সঙ্কটের মোকাবিলায় ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের বিজ্ঞানী অর্ণব মজুমদারের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার মাটিতে পরীক্ষা চালিয়ে ‘ফারো টিলেজ’ প্রক্রিয়ায় চাষের এক অভূতপূর্ব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছে। ‘অ্যাডভান্সড সায়েন্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল সেই গবেষণার ফলাফল।
বিশ্বের প্রচলিত কৃষি পদ্ধতি হল, মাটি গভীর ভাবে খুঁড়ে চাষ বা ‘কনভেনশনাল ডিপ টিলেজ’। কিন্তু গভীর চাষে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড বেরিয়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। এ কথা জানার পরে পশ্চিমের দেশগুলিতে মাটি না খুঁড়ে, জল দিয়ে ও বীজ ছড়িয়ে ‘নো-টিলেজ’ চাষের পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। এতে কার্বন নির্গমন অনেক কম হলেও মাটির পুষ্টি কমে যায়, কৃষি-সহায়ক ব্যাক্টেরিয়ার সক্রিয়তা হ্রাস পায়। ফলে ফসলের মান ভাল হয় না।
সেই সমস্যার সমাধানেই গবেষণা চালান আদতে দুর্গাপুরের বাসিন্দা অর্ণব। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ শেষ করে, মারি ক্যুরি পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ পেয়ে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। এখন সেখানকার প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর অর্ণবের নেতৃত্বে নদিয়ার ১২টি পরীক্ষামূলক জমিতে ‘ফারো টিলেজ’ পদ্ধতি সফল ভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণায় সহায়তা করেছে ব্রিটেন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়। ফিল্ড ট্রায়ালে নজরদারি করেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।
অর্ণবদের ‘ফারো টিলেজ’ পদ্ধতিতে জমিতে একাধিক ‘ফারো’ বা নালা কেটে, সেই নালাগুলির মাঝে থাকা জমিতে তথা ‘মিড বেড’-এ চাষ করা হয়েছে। নালাগুলিতে চাষের গোটা সময়কাল ধরে জল জমিয়ে রাখা হয়। সাধারণত মিড বেড-এর প্রস্থ প্রায় ৪ ফুট এবং প্রতিটি নালার প্রস্থ ও গভীরতা প্রায় ১ ফুট করে রাখা হয়। এ ভাবে পর্যায়ক্রমে নালা ও ‘মিড বেড’ তৈরি করে পুরো জমিটি প্রস্তুত করা হয়। কয়েক দিন পর-পর হাত-চালিত ছোট লাঙল দিয়ে ওই নালা নতুন করে কুপিয়ে দেওয়া হয়, যাতে মাটিতে বায়ু চলাচল এবং অক্সিজেন সরবরাহ সচল থাকে। এই পদ্ধতি মাটির রন্ধ্রে থাকা গ্যাসের সঙ্গে বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের আদান-প্রদান এবং মাটির পুষ্টিচক্রকে সর্বোত্তম মাত্রায় সক্রিয় রাখে। ‘নো টিলেজ’ পদ্ধতির নীতি মেনে এখানেও মাটি না চষেই চাষাবাদ করার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। কৃষকরা চাইলে নালার মধ্যে দাঁড়িয়ে ‘মিড বেড’-এ সরাসরি বীজ ছড়িয়ে দিতে পারেন, যদি আলাদা করে চারা তৈরি করা না হয়। আর যদি ধানের চারার মতো চারা ব্যবহার করা হয়, তবে মাঝের জমিতেই দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক নিয়মে চারা রোপণ করা যায়। এতে জমিতে পায়ের ছাপ পড়লেও মাটি খোঁড়া হয় না।
কৃষিজমিতে জল ব্যবহারের উদ্ভাবনী কৌশলের উপরেই দাঁড়িয়ে আছে অর্ণবদের পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় নামার আগে মাটি, উদ্ভিদ এবং অণুজীবের বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন তাঁরা। অর্ণব বলেন, ফারো টিলেজ পদ্ধতিতে কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয়েছে প্রতিদিন প্রতি বর্গমিটারে মাত্র ৩.৯৪ থেকে ৪.৩৮ গ্রাম, যা নো-টিলেজের মাত্রার কাছাকাছি, কিন্তু গভীর চাষের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ কম। ফারো টিলেজে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালশিয়াম, তামা ও দস্তা-সহ প্রয়োজনীয় সব পদার্থ মাটিতে যতটা মিশেছে, তা গভীর চাষের সমতুল্য। ফলে, ফারো টিলেজে ধান উৎপাদন হয় নো-টিলেজের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। তা-ও গভীর চাষের সমতুল্য। পরিবেশের সঙ্গে গাছের মানিয়ে নেওয়া (অভিযোজন), ফসলের বৃদ্ধির সহায়ক প্রাকৃতিক পচন (জৈব-ভঙ্গুরতা), অ্যামাইনো অ্যাসিড বিপাক— প্রতিটি বিষয়ই ফারো টিলেজে বিশেষ ভাবে সক্রিয় ছিল। এই গবেষণার সবচেয়ে অভিনব অবদান হল, মাটির ব্যাক্টেরিয়ার কোষপর্দায় কার্বন ডাই-অক্সাইড পরিবহণের আণবিক রহস্য উন্মোচন। মাটির কার্বন ধারণক্ষমতার আণবিক ভিত্তি বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে এই আবিষ্কার।
আমেরিকা, ইংল্যান্ড এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কৃষিবিজ্ঞানীরা এই নয়া পদ্ধতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। অর্ণব ভারতের কৃষি মন্ত্রকের কাছেও এই নয়া পদ্ধতি পরীক্ষার জন্য প্রস্তাব পাঠাতে চলেছেন।