থমকে গিয়েছে কালের যাত্রা! মুম্বইয়ের দাদরের রাস্তায় অঝোর বৃষ্টির মধ্যে পুলিশের গাড়ির সামনে একা রুখে দাঁড়িয়ে ধূসর হুডি পরা জেন জ়ি তরুণী। ২৭ বছর বয়সি সেই রিয়া আহির রাতারাতি হয়ে উঠেছেন শিক্ষায় দুর্নীতি ও অব্যবস্থার প্রতিবাদে দিল্লির গণ্ডি পার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া ছাত্র ও তরুণ প্রজন্মের আন্দোলনের মুখ। কেউ তাঁর মধ্যে দেখতে পাচ্ছেন তিয়েনআনমেন স্কোয়্যারের ট্যাঙ্কম্যানকে, কেউ মনে করছেন ফরাসি চিত্রশিল্পী দেলাক্রোয়ার ছবির স্বাধীনতার দেবীর প্রতিচ্ছবি।
গত কাল প্রতিবাদীদের পুলিশ ভ্যানে ঠেসে ভরে নিয়ে যাওয়ার সময়ে পথ আটকে অ্যারেস্ট মেমো দেখতে চেয়েছিলেন রিয়া। উত্তরে পুলিশ আমতা-আমতা করায় গাড়ির বনেটের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত পুলিশ বাধ্য হয় সবাইকে ছেড়ে দিতে। এর পাশাপাশি অন্য একটি ভাইরাল ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, একদল তরুণ চলন্ত পুলিশ ভ্যানের পিছনে ধাওয়া করে পিছনের ছিটকিনি খুলে দিচ্ছেন আর নেমে আসছেন আটক আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনকারীদের উদ্যোগী হয়ে স্কুলবাসকে পথ ছেড়ে দেওয়ার দৃশ্যও সামনে এসেছে। পেশায় মডেল ও অভিনেত্রী রিয়া পরে একটি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “পুলিশ নিজেদের কাজ করছে, কিন্তু সেটা দায়িত্বশীল ভাবে করছে না। যদি কেউ দায়িত্ব না নেয়, নাগরিকদের দায়িত্ব আমরাই নেব।”
তার পরেও অবশ্য মুম্বই পুলিশের বিরুদ্ধে উঠেছে আন্দোলনকারীদের দমিয়ে রাখার চেষ্টার বিভিন্ন অভিযোগ। যেমন, এফআইআরে নাম থাকা তরুণদের চাপ দেওয়া হচ্ছে মোবাইলের লাইভ লোকেশন পুলিশকে পাঠাতে। ভোররাতে মেসেজিং অ্যাপে আসছে আইনি নোটিস। বাবা-মাকে বাড়ি বয়ে গিয়ে বলা হচ্ছে, আইনি টানাপড়েনে ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ ঝরঝরে হয়ে যাবে। গত কাল রাতে নাগপুরে একদল তরুণ যখন প্রতিবাদ শেষে জাতীয় সঙ্গীত গাইছিলেন, ঠিক সেই সময়েই পুলিশ তাঁদের জোর করে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
‘বঞ্চিত বহুজন আঘাড়ি’ তাদের প্রতিবাদী কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে আরএসএসের বিরুদ্ধে। আগামী ২৬ জুলাই রাজনৈতিক পতাকা ছাড়া মিছিলের ডাক দিয়েছেন উদ্ধব ও রাজ ঠাকরে। আজ সকালে আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের সমর্থনে মহারাষ্ট্রের অহিল্যানগরে দু’ঘণ্টা প্রতীকী মৌন প্রতিবাদ করেছেন বর্ষীয়ান সমাজকর্মী অন্না হজারে। গত কালই প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়ে পুলিশি দমনপীড়নের নিন্দা করেছেন তিনি। লিখেছেন, শিক্ষামন্ত্রী ইস্তফা দিলে সরকার পড়ে যাবে না, বরং তাদের জবাবদিহি এবং কার্যকারিতা আরও বাড়বে।
বিহারের পাটনায় গত কাল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের খণ্ডযুদ্ধ পৌঁছে গিয়েছিল একেবারে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের কাছাকাছি। আহত হয়েছেন অন্তত ২২ জন পুলিশকর্মী। ওই বিক্ষোভে ‘বড্ড গরম’ বলে পুলিশকে জলকামান চালানোর জন্য পীড়াপীড়ি করতে শোনা গিয়েছে তরুণদের। আর সেই জলকামানের মুখে তাঁদের নাচের ভিডিয়ো নজর কাড়ছে সমাজমাধ্যমে। প্রতিবাদীদের একাংশকে দেখা গিয়েছে পুলিশের ব্যারিকেড, এমনকি আস্ত একটি লোহার ফটক তুলে নিয়ে চলে যেতে। বিধানসভায় যাওয়ার পথে আন্দোলনকারীদের হেনস্থার মুখে পড়ে দুই বিজেপি বিধায়কের পালানোর দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছে সমাজমাধ্যমে। এই সমস্ত নিয়ে শাসক-বিরোধী তুমুল হট্টগোলে মুলতুবি হয়ে যায় বিধানসভার অধিবেশন। আজ কাটিহারে চলেছে পুলিশি লাঠিচার্জ।
আজ কেরল জুড়ে এসএফআই-এর নেতৃত্বে পুলিশের জলকামান ও কাঁদানে গ্যাসের মুখে পড়ুয়ারা ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে গিয়েছেন। যন্তর মন্তরের প্রতিবাদীদের সমর্থনে করা ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ও ভিডিয়ো মুছে ফেলতে আইআইটি মাদ্রাজ কর্তৃপক্ষের পড়ুয়াদের দেওয়া নির্দেশে শুরু হয়েছে বিতর্ক। ঝাড়খণ্ডের রাঁচীতে কংগ্রেস সমর্থকদের বিজেপি কার্যালয় অভিযানে দু’পক্ষের ইট, ডিম ও টোম্যাটো ছোড়াছুড়িতে জখম হয়েছেন সাংবাদিক ও পুলিশ-সহ কয়েক জন। প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে মিজ়োরাম, হরিয়ানা এবং রাজস্থানেও।
প্রতিবাদে নজরে আসছে নানা অভিনব পন্থাও। ইন্টারনেট বন্ধ হতে পারে জেনে আগেভাগেই মোবাইলে ম্যাপ ডাউনলোড করে রাখছেন আন্দোলনকারীরা। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছেন ব্লুটুথে চলা অ্যাপে। পুলিশের লাঠির আঘাত থেকে বাঁচতে কাপড়ের নীচে কেউ গুঁজে রাখছেন থার্মোকল। কাঁদানে গ্যাসের জ্বালা কমাতে জলের সঙ্গে অ্যান্টাসিড মিশিয়ে নিয়ে আসছেন। ব্যাগে রাখছেন অতিরিক্ত জামাকাপড়, হেলমেট— নিজের জন্য, অচেনা অন্য প্রতিবাদীর জন্যও।