রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শেষ করতে প্রয়োজন কেবলমাত্র আলোচনা ও কূটনীতি। তেল, সার ও খনিজ পদার্থের মতো পণ্য কেনা বন্ধ করে দিলেই সমাধান মিলবে না। শুক্রবার ওয়ারশতে পোল্যান্ডের বিদেশমন্ত্রী র্যাডোস্ল সিকোরস্কির সঙ্গে আলোচনার পর এ কথা জানালেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
শুক্রবার ইউক্রেন সফর শেষে সিকোরস্কির সঙ্গে ওয়ারশতে বৈঠক করেন জয়শঙ্কর। পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারল নাভরোৎস্কির সঙ্গেও দেখা করেন তিনি। দু’পক্ষের আলোচনায় বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, ডিজিটালাইজ়েশন, উদ্ভাবন এবং পেশাদারদের যাতায়াতের ক্ষেত্রে সহযোগিতার উপর জোর দেওয়া হয়। সামুদ্রিক বাণিজ্যের সুরক্ষাও এই আলোচনায় উঠে এসেছে। তার কারণ ভারত এবং পোল্যান্ড, উভয় দেশই বাণিজ্যিক জাহাজ পরিবহণ শিল্পে একে অপরের সহযোগিতা করে। দু’দেশই নাবিক পাঠায়।
ইউক্রেনের সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থকদের মধ্যে অন্যতম দেশ পোল্যান্ডের দাবি, রাশিয়া থেকে ভারত জ্বালানি কেনায় ভ্লাদিমির পুতিনের দেশ আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছে। এ বিষয় জয়শঙ্কর বলেন, “এটি একটি অত্যন্ত কঠিন বৈশ্বিক পরিস্থিতি। তার সঙ্গে ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তার স্বার্থও জড়িয়ে রয়েছে। দেশবাসীর চাহিদা পূরণ করার দায়িত্ব ভারতের রয়েছে। ফলে আমি মনে করি রাশিয়া-ইউক্রেনের এই সংঘাত, যা এখন পঞ্চম বছরে পদার্পণ করেছে, সেটি শেষ করার জন্য কূটনীতি এবং আলোচনা দরকার। তেল, সার, ধাতু ও খনিজ কেনার সিদ্ধান্ত কেউ নিল কি নিল না, তার উপর নির্ভর করে না।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের সমস্যাটি সঠিক ভাবে চিহ্নিত করা উচিত। আসল বিষয়টি হল এটি একটি যুদ্ধ এবং এর সমাধান বাণিজ্য বন্ধ করার মধ্যে নেই। আলোচনার মাধ্যমেই এর সমাধান মিলবে।”
এই সপ্তাহের শুরুতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একটি বৈঠক করেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে শোনা গিয়েছে, এই যুদ্ধ যে ভাবেই হোক শেষ করতে হবে। শুক্রবার সিকোরস্কি এবং জয়শঙ্করের মধ্যে আলোচিত বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বিষয়গুলির মধ্যে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ অন্যতম ছিল। সেখানে মোদীর বার্তাটিকেই জোর দেন জয়শঙ্কর। এক দিন আগে কিভে ইউক্রেনের বিদেশমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহার সঙ্গে বৈঠক হয় তাঁর। সেখানেও একই বিষয় তুলে ধরা হয়।
আরও পড়ুন:
বৈঠক শেষে জয়শঙ্কর বলেন, “এই যুদ্ধগুলিতে কোনও পক্ষই জয়ী হয় না। এই যুদ্ধগুলি চলতে থাকলে আরও বেশি মৃত্যু, ধ্বংস, দু’দেশের আরও বেশি ক্ষতি হবে। পাশাপাশি, এই যুদ্ধের ফলে বাকি বিশ্বকেও এর জন্য মাশুল দিতে হবে।” তাঁর সংযোজন, “তাই আমাদের প্রচেষ্টা আলোচনা এবং কূটনীতির মাধ্যমে আমাদের যতটা সম্ভব আমরা সাধ্যমতো সমাধান করার চেষ্টা করব। এই সংঘাত শেষ করতে অন্যদের প্রচেষ্টাকেও সমর্থন করা উচিত। এটিই ভারতের দৃঢ় বিশ্বাস এবং আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি।”
শুক্রবারের বৈঠকে দু’পক্ষ পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়েও আলোচনা করে। সিকোরস্কি পারস্য উপসাগরে জাহাজে থাকা ভারতীয় ও পোলিশ নাবিকদের নিরাপত্তাকে একটি পারস্পরিক উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “আমাদের দেশের নাগরিকদের প্রায়শই নিশানা করা হয়। কিছু জায়গা থেকে কখনও তাঁদেরকে অপহরণও করা হয়। তাই সমুদ্রে নিরাপত্তা ও সুরক্ষা আমাদের উভয় দেশের জন্যই একটি সাধারণ উদ্বেগের বিষয়।”
পোল্যান্ডে ভারতীয় কর্মীদের সম্ভাব্য অবৈধ নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয় জয়শঙ্কর বলেন, “ভারত সরকার আইনি পথে দু’দেশের মধ্যে বৈধ যাতায়াতকে সমর্থন করে এবং অবৈধ অভিবাসন বা যাতায়াতের বিরোধিতা করে।” একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, “একটি বিশ্বায়িত অর্থনীতি কেবল পুঁজি এবং পণ্যের প্রবাহে নিয়ে নয়, বরং এটি একটি নিয়ন্ত্রিত এবং পারস্পরিক ভাবে লাভজনক উপায়ে মেধা ও দক্ষতার প্রবাহকে সহজতর করার বিষয়।”