সাদা পাজামা, বিস্কুট রঙা টি-শার্ট।
মঞ্চের উপরে ষাট ছুঁই ছুঁই মানুষটির চেহারা দেখলেই বোঝা যাবে, শারীরিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। ককরোচ জনতা পার্টির স্বেচ্ছাসেবকদের কাঁধে ভর দিয়ে শৌচাগারে যেতে হচ্ছে। মাঝপথে চেয়ারে বসে একটু বিশ্রাম নিতে হচ্ছে।
টানা ১৮ দিনের অনশন। ওজন কমেছে সাড়ে আট কেজি। রক্তচাপ ১০৫/৭৬। সোনম ওয়াংচুকের মুখ দেখে অবশ্য বোঝা যায়, শরীর দুর্বল হলেও মনের জোর কমেনি। বুধবার যন্তর মন্তরে দলিত নেতা চন্দ্রশেখর আজাদ রাবণ, স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান কুণাল কামরা, তৃণমূল সাংসদ দোলা সেন দেখা করতে এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার সময় দ্রুত মুখে মাস্ক পরে নিচ্ছেন ওয়াংচুক। সবাইকেই বলছেন, তাঁর কষ্টের থেকে নিট-এর মতো প্রশ্ন ফাঁসের ফলে যে সব ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের বাবা-মায়ের কষ্ট অনেক বেশি। ওয়াংচুকের চিকিৎসক সতীশ লাম্বা বলছিলেন, ‘‘উনি মানসিক ভাবে পুরোপুরি সচেতন রয়েছেন।’’
নিট কেলেঙ্কারির পরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে প্রথমে ককরোচ জনতা পার্টি যন্তর মন্তরে প্রতিবাদ শুরু করে। তার সাত দিন পরে সোনম ওয়াংচুক অনশন শুরু করেন। প্রথম দিকে আমজনতার তেমন উৎসাহ না থাকলেও গত কয়েক দিনে ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ ছড়াতে শুরু করেছে। ভিড়ও বাড়ছে যন্তর মন্তরে। জুলাইয়ে দিল্লির গরম উপেক্ষা করে ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, সাধারণ মানুষ, শিক্ষাবিদরা ওয়াংচুককে দেখতে আসছেন। নিট-এর প্রশ্ন ফাঁসের পরে দেশ জুড়ে অন্তত ২০ জন ছাত্রছাত্রী আত্মহত্যা করেছিলেন বলে অভিযোগ। তাঁদের অন্যতম, দেহরাদূনের রিয়া কুমারী থাপার বাবা-মা বুধবার ফোন করে সোনমের স্বাস্থ্যের খবর নিয়েছেন।
যন্তর মন্তর থেকে আড়াই-তিন কিলোমিটার দূরে কর্তব্য ভবনে মোদী সরকারের শীর্ষকর্তাদের কপালেও চিন্তার ভাঁজ। বুধবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ‘‘ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভ নিয়ে আমাদের চিন্তা ছিল না। বরং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ফলে মানুষের ক্ষোভ বেরোনোর রাস্তা ছিল সেটা। কিন্তু লাদাখ থেকে সোনম ওয়াংচুক এসে যে অনশন শুরু করে দেবেন, তা আমাদের হিসেবের মধ্যে ছিল না। টানা ১৮ দিন ধরে অনশন চললে তা নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রতিক্রিয়া হবেই। এমনিতেই শিক্ষাবিদ হিসেবে ওয়াংচুকের সুখ্যাতি রয়েছে।’’ দিল্লির বিজেপি সাংসদ মনোজ তিওয়ারির অভিযোগ, ককরোচ জনতা পার্টি, সোনম ওয়াংচুক— এঁরা সকলেই আপ-এর বর্ধিত অঙ্গ। এঁরা দেশের উন্নয়নের গতি রোধ করতে চান। বিজেপি তথা মোদী সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব অবশ্য মনে করছেন, ওয়াংচুকের অনশন শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা দাবির আন্দোলনকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তা ঠিক মতো সামাল দিতে না পারলে পরিস্থিতি প্রতিকূল হতে পারে।
যন্তর মন্তরে পুলিশি পাহারাও বাড়ানো হয়েছে। অনশনমঞ্চকে কার্যত লোহার ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলেছে দিল্লি পুলিশ এবং আধাসেনা। দু’দফায় মেটাল ডিটেক্টরের গেট, পুলিশের দেহতল্লাশি পেরিয়ে মঞ্চে যেতে হচ্ছে। মেটাল ডিটেক্টরের গেটের সঙ্গেই বিরাট লেন্সের সিসিটিভি ক্যামেরায় সকলের ছবি তুলে নেওয়া হচ্ছে। বসানো হয়েছে পুলিশের ওয়াচ-টাওয়ারও। সেখান থেকেও অনশন, বিক্ষোভের ভিডিয়োগ্রাফি চলছে সর্বক্ষণ। এই ‘নজরদারি’-কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বুধবার দিল্লি হাই কোর্টে মামলা দায়ের করেছেন এসএফআই নেত্রী ঐশী ঘোষ।
ওয়াংচুকের সঙ্গে ছাত্র সংগঠন আইসা-র ছ’জন নেতানেত্রী অনশন শুরু করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিন জনকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের নেহা, ইলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের মণীশ, অম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয়ের অমিন— এই তিন পিএইচডি স্কলার গত ১৮ দিন ধরে অনশন চালাচ্ছেন। তাঁদের শরীরে কিটোনের মাত্রা বেড়েছে। আজমগঢ়ের মণীশ বলছিলেন, ‘‘বাড়িতে বাবা-মা চিন্তা করছেন। কিন্তু লড়াই থেকে সরছি না।’’
বিভিন্ন বিরোধী দল এসে সমর্থন জানিয়ে গেলেও, এখনও কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের কাউকে যন্তর মন্তরে দেখা যায়নি। শশী তারুর অবশ্য ব্যক্তিগত ভাবে ওয়াংচুককে অনশন প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছেন। ককরোচ-প্রধান অভিজিৎ দীপকে বলছিলেন, ‘‘অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, কেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী আমাদের সমর্থন করেননি? কেন আমরা সকলে সোনম স্যরের সঙ্গে অনশন করছি না? আসল প্রশ্ন হল, কেন প্রধানমন্ত্রী আলোচনাই করতে চাইছেন না? কেন শিক্ষামন্ত্রীকে দায় নিতে বলা হচ্ছে না? এক জন নিজের জীবন বাজি ধরে আত্মঘাতী পড়ুয়াদের জন্য বিচার চাইছেন। কিন্তু সরকারের থেকে নীরবতা ছাড়া কিছু মেলেনি। এই সরকার নিষ্ঠুর।” তাঁর কথায়, ‘‘২০১১ সালে অণ্ণা হজারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যন্তর মন্তরে ১২ দিন অনশন করেছিলেন। সোনম ওয়াংচুক ১৮ দিন অনশন করলেও মোদী সরকার হাত গুটিয়ে বসে রয়েছে।’’
ককরোচ জনতা পার্টির নেতাদের আশঙ্কা, যন্তর মন্তরে ভিড় ও ওয়াংচুককে নিয়ে আমজনতার উদ্বেগ দেখে দু’-তিন দিনের মধ্যে অনশন ভাঙার চেষ্টা হতে পারে। বুধবারই দিল্লি হাই কোর্টে আইনজীবী রাকেশকুমার সাইনি মামলা করে দাবি তুলেছেন, ওয়াংচুককে জোর করে খাওয়ানোর নির্দেশ দিক আদালত। না হলে তিনি মারা যেতে পারেন। হাই কোর্ট এ বিষয়ে কেন্দ্রের বক্তব্য জানতে চেয়েছে। বৃহস্পতিবার ফের শুনানি। কেন্দ্রের তরফে আদালতের রায়কে হাতিয়ার করে অনশন ভাঙার চেষ্টা হবে কি না, তা নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বুধবার বিকেলে যন্তর মন্তরে যান অবসরপ্রাপ্ত আমলা, সমাজকর্মী হর্ষ মন্দার। তাঁর মতে, ‘‘কোনও সরকারের নাগরিক আন্দোলনকে এমন পুরোপুরি উপেক্ষার মনোভাব আগে দেখিনি। এ এক অন্য ভারত দেখছি।’’