দশ দিন হয়ে গেল লোকসভার বাদল অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য মুলতুবি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনও অধিবেশন শেষের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়নি। সরকার তলে তলে বিশেষ অধিবেশন ডেকে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের জন্য ঝাঁপানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে কি না, এই নিয়ে চর্চা শুরু হল বিরোধী শিবিরে।
অধিবেশন চলাকালীনই হাওয়া উঠেছিল, সংবিধান সংশোধনের এই বিলটি পাশ করাতে সরকার ঘুঁটি চালছে। সংখ্যা জোগাড় হয়ে গেল বলে। বাদল অধিবেশন শেষ হওয়ার পরেই বিশেষ অধিবেশন ডেকে বিল পাশ করিয়ে নেওয়া হবে। যুক্তি এটাও রয়েছে, যে আর দেরি করলে তার হাতেগরম সুফল (উত্তর ভারতে আনুপাতিক আসন বৃদ্ধি) ২০২৯-এর লোকসভা ভোটে শাসক দল না-ও পেতে পারে। কংগ্রেসের আশঙ্কা, সে কারণেই বিলটি নিয়ে বিজেপি এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আজ নিজের এক্স হ্যান্ডলে বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশ। তাঁর কথায়, সংসদীয় রীতি অনুযায়ী লোকসভা অনির্দিষ্ট কালের জন্য মুলতুবি হওয়া এবং রাষ্ট্রপতির দ্বারা আনুষ্ঠানিক ভাবে অধিবেশন শেষ হওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারির মধ্যে সাধারণত দুই থেকে চার দিনের ব্যবধান থাকে। আবার এমন নজিরও রয়েছে, যখন একই দিনে লোকসভা মুলতুবি এবং শেষ হওয়ার বিবৃতি জারি — দুই প্রক্রিয়াই সম্পন্ন হয়েছে। এর পরেই তিনি প্রশ্ন তোলেন, “এ বারে এই অস্বাভাবিক বিলম্বের কারণ কী? সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত সাংবিধানিক সংশোধনী বিল বিশেষ অধিবেশন ডেকে পাশ করানোর জন্য প্রয়োজনীয় তথাকথিত ‘বহুকলঙ্কিত’দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা জোগাড়ের সন্ধানে কি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখনও ব্যস্ত?”
কংগ্রেসের দিক থেকে বিষয়টি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করা হলেও তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, বিষয়টি স্রেফ শাসক দলের চাপ বাড়ানোর কৌশল। তারা প্রয়োজনীয় সংখ্যার ধারেকাছেও নেই। দলের রাজ্যসভার নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেন, ‘‘শুধু আজ নয়, আমরা অধিবেশনের গোড়া থেকেই বলে যাচ্ছি, লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত বিলটি আনা সম্ভবই নয় সরকারের পক্ষে। তার কারণ আমরা ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বাইরে থাকা দল ডিএমকে-র সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছি। ডিএমকে নেতৃত্ব অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন, এই বিল তাঁরা সমর্থন করবেন না। সরকার অধিবেশনের ইতি টানছে না, কারণ তারা বিরোধীদের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের কৌশল নিয়ে চলছে।’’ ডেরেক আজ জয়রামের পোস্টে গিয়ে লিখেছেন, ‘‘ভঙ্গুর বিজেপি-নেতৃত্বাধীন জোটের কাছে লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মতো প্রয়োজনীয় সংখ্যা নেই। তাই তাদের এই আস্ফালন বা হুঙ্কারে আমি মোটেই বিচলিত নই।’’
এই চর্চায় আরও উস্কানি দিয়েছে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দক্ষিণের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে করা জ়োনাল কাউন্সিল-এর বৈঠক। তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী সি বিজয় জোসেফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন শাহ। সূত্রের খবর, বৈঠকের বাইরে বিজয় সাংবাদিকদের কাছে আসন পুনর্বিন্যাস বিলটির ফলে দক্ষিণ ভারতের সাংবিধানিক প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগের কথা তুললেও বৈঠকের ভিতরে কেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর সমঝোতা হয়েছে। তামিলনাড়ু তথা দক্ষিণের আসনসংখ্যার আনুপাতিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখা হলে তাদের সায় রয়েছে বলেও জানিয়েছেন বিজয়। সদ্য সমাপ্ত বাদল অধিবেশন চলাকালীন সংসদ চত্বরে এই একই শর্তের কথা ডিএমকে-র নেতারাও জানিয়েছেন।
নিজের পোস্টে জয়রাম বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে মুলতুবি আর তার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণার মধ্যে ব্যবধান দীর্ঘ হতে দেখা গিয়েছে। যেমন, ২০১৫ সালের বাদল অধিবেশনে এই ব্যবধান ছিল ২৮ দিন এবং ২০২১ সালে ২০ দিন’। তাঁর কথায়, “তখন তো কোনও গোপন বা কুটিল পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছিল না।” জয়রাম তাঁর পোস্টের সঙ্গে এম. এন. কৌল এবং এস. এল. শাকধরের লেখা 'প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রসিডিওর অব পার্লামেন্ট' বইটির একটি পাতার ছবিও প্রকাশ করেন। সেখানে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৮৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন। সেই পরামর্শ রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর আগে মন্ত্রিসভার সঙ্গে পরামর্শ করা হতে পারে।