পড়ুয়াদের প্রশ্ন করার অধিকার আছে কি? নিট-এ প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে দিল্লির যন্তর মন্তরে জেন জ়ি-দের যে আন্দোলন, তা দমনে সরকার ও শাসক দলের বিভিন্ন পদক্ষেপের পরে এমন প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। এই আবহেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া এ দিন বলেছেন, ছাত্রছাত্রীরা কোনও বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করলে বা প্রশ্ন তুললে তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়া যায় না। তাঁর আরও বক্তব্য, এই সব ক্ষেত্রে পড়ুয়াদের শাস্তির হুমকিদেওয়াটা অসাংবিধানিক।
যন্তর মন্তর থেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়— বিক্ষোভের অগ্রভাগে পড়ুয়ারা। অভিযোগ, এর ফলে দেশের শাসক শিবিরের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। এই আবহে আজ দিল্লির ন্যাশনাল ল ইউনিভার্সিটির স্নাতকোত্তর পড়ুয়াদের ১৩তম সমাবর্তনে যোগ দিয়েছিলেন বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া।
বিচারপতির মতে, বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা হওয়া উচিত, যেখানে স্বাধীন ভাবে চিন্তা করার অভ্যাসের সূচনা হয় এবং কঠিন প্রশ্ন করতে পড়ুয়া যেন দ্বিধা না করেন। কোনও রকম রাখঢাক না করেই শীর্ষ আদালতের এই বিচারপতি বলেছেন, ‘‘পড়ুয়ারা যখন ভিন্ন মত প্রকাশ করেন, প্রশ্ন করেন, তখন তাঁদের শাস্তির হুমকি দেওয়া যায় না। এটা অসাংবিধানিক, ক্ষমতা ও পদমর্যাদার অপব্যবহার।’’ তাঁর মতে, মতভেদের জন্য পড়ুয়াদের শত্রুমনোভাবাপন্ন ভাবাও অনুচিত।
বিচারপতি ভুঁইয়া মনে করেন, প্রশ্ন করার অধিকার বিদ্রোহ করা নয়। বরং ‘অসহিষ্ণু মানসিকতা’ ভারতীয় সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী। তিনি বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা, যেখানে ছাত্রছাত্রীরা ভিন্ন মতের মুখোমুখি হন, যেখানে প্রতিষ্ঠিত অবস্থান ও চলতি ধারণাগুলিকে পরীক্ষা করা, সেগুলিকে প্রশ্ন করা যায় এবং যেখানে মতপার্থক্য শত্রুতার বদলে যুক্তির মাধ্যমে প্রকাশ পেতে পারে। আমরা যদি এমন একটি গণতান্ত্রিক সমাজ চাই, যেখানে স্বাধীনতা ও মতপার্থক্যকে সম্মান করা হয়, তা হলে সেই সংস্কৃতির সূচনা হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই।”
আইনজীবী মহলের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনের কারণে শাসক শিবিরের মনোভাবের প্রেক্ষিতে বিচারপতির এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে যন্তর মন্তরে সিজেপি-র আন্দোলনে যে ভাবে জেন জ়ি-দের উপরে পুলিশি বলপ্রয়োগ হয় এবং পরেও নানা ভাবে তাঁদের উপরে দমনপীড়নের অভিযোগ ওঠে, সেই আবহে বিচারপতির এমন মন্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সহিষ্ণুতা সাংবিধানিক মূল্যবোধ বলে উল্লেখ করেন বিচারপতি ভুঁইয়া। তিনি মনে করেন, বুদ্ধ ও গান্ধীর দেশে ‘অসহিষ্ণু মানসিকতা’র কোনও জায়গা নেই। এই ধরনের মানসিকতা এক ধরনের হিংসা। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের সংবিধান ভিন্ন ভাবে কথা বলা, ভিন্ন চিন্তা এবং ভিন্ন বিশ্বাসের স্বাধীনতা রক্ষা করে। মতপার্থক্য বা ভিন্নমতকে যখন দমন, প্রত্যাখ্যান বা শাস্তি দেওয়ার বিষয় হয়ে ওঠে, তখনই অসহিষ্ণুতা সেই সাংবিধানিক কাঠামোকে দুর্বল করতে শুরু করে। তাই মতভেদকে মেনে নিয়ে সহাবস্থান করার সক্ষমতা নিছক সামাজিক গুণ নয়। এটি একটি উদারপন্থী সাংবিধানিক গণতন্ত্রের মূল সত্ত্বা।’’ তাঁর মতে, ভিন্ন মতের সহাবস্থান এবং তার প্রতি মর্যাদাপূর্ণ আচরণেই গণতন্ত্র অর্থবহ হয়ে ওঠে।