ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র আন্দোলনে প্রতিবাদীদের উপরে পুলিশি নিগ্রহের যে অভিযোগ উঠেছিল, তা খতিয়ে দেখতে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করবে সুপ্রিম কোর্ট। সেই কমিটিতে থাকার কথা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, প্রাক্তন ডিজিপি এবং সিবিআইয়ের প্রাক্তন অধিকর্তার। যদিও দিল্লি পুলিশ মঙ্গলবারই সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে জানিয়েছে, সিজেপি-র ‘চলো সংসদ’ কর্মসূচিতে কোনও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়নি। আইনবিরুদ্ধ কোনও কাজও করেনি বাহিনী। অন্য দিকে, বিহারে একে-৪৭ কাণ্ডে সিওয়ানের পুলিশ সুপারকে অপসারণ করা হল।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার ডিভিশন বেঞ্চ মঙ্গলবার জানিয়েছে, কমিটি গঠন নিয়ে নির্দেশ প্রকাশিত হবে বুধবার। প্যানেলে আর কারা থাকবেন, তা নিয়ে সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পরেই প্রকাশিত হবে নির্দেশ। সুপ্রিম কোর্ট এ-ও জানিয়েছে, গত ২০ জুলাই সংসদ অভিযানের সব সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিয়ো ফুটেজ খতিয়ে দেখবে ওই কমিটি। আলাদা ভাবে মহিলা আন্দোলনকারীদের অভিযোগও শুনবে।
নিট কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে গত মাসে আন্দোলন করেছিল সিজেপি। আন্দোলনকারীদের একাংশের অভিযোগ, পুলিশ সেই সময়ে অতিসক্রিয়তা দেখিয়েছে। তাঁদের নিগ্রহ করেছে। পুলিশ মিছিলকারীদের উপরে ‘অত্যাচার’ চালিয়েছে, এই অভিযোগ তুলে শীর্ষ আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন এক আইনজীবী। এ নিয়ে জরুরি শুনানির আবেদন খারিজ করে দেয় প্রধান বিচারপতি কান্তের ডিভিশন বেঞ্চ। সে দিনের ঘটনার ভিডিয়ো আদালতকে দেখাতে চেয়েছিলেন আবেদনকারী ওই আইনজীবী। প্রধান বিচারপতি সাফ বলে দেন, ‘‘আমাদের সময় নষ্ট করবেন না।’’
মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ সেই অভিযোগ নিয়েই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করার কথা বলল। আন্দোলন চলার সময় প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে যে সব এফআইআর হয়েছে, সেগুলির তথ্য সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে শীর্ষ আদালতে জমা করতে বলেছে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চ। সুপ্রিম কোর্টের আগের রায় অনুসারে, সেই এফআইআর খারিজ হওয়ার কথা (যাঁদের বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধের মামলা নেই)। এই প্রসঙ্গে বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ‘‘পড়ুয়াদের জীবন এখন ঝুঁকির মুখে। সেটা মাথায় রাখতে হবে। ওঁদের একটা ভবিষ্যৎ রয়েছে। সংবিধানের ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে ওঁদের প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে।’’ মেহতা জানিয়েছেন, পুলিশ আন্দোলনস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এমন ২,৮০০ ‘সমাজবিরোধী’কে শনাক্ত করেছে, যারা অতীতে অপরাধে জড়িয়েছিল। ২০ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে অশান্তি ছড়ানোর ক্ষেত্রেও তাদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ।
অন্য দিকে, দিল্লির আন্দোলনরত ছাত্র-যুবদের সংসদ অভিযানের দিন পুলিশি ‘বাড়াবাড়ি’র যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিয়ে মামলা হয় সুপ্রিম কোর্টে। ওই মামলায় মঙ্গলবার হলফনামা জমা দিয়ে নিজেদের অবস্থান জানায় দিল্লি পুলিশ। তারা জানায়, যখন পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে, শুধুমাত্র সেই সময়েই প্রতিক্রিয়া বাড়ানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার অন্য চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরেই কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে। পাশাপাশি করা হয়েছে ‘সীমিত’ লাঠিচার্জ।
সংসদ অভিযানের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের চিহ্নিত করতে পুলিশ ‘ফেশিয়াল রেকগনিশন সিস্টেম’ ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গণনজরদারি চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ। তবে হলফনামায় পুলিশ জানিয়েছে, এমন দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। গুরুতর অপরাধের পূর্ব রেকর্ড থাকা ব্যক্তিদেরই এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়। হলফনামা অনুযায়ী, ‘ফেশিয়াল রেকগনিশন সিস্টেম’ প্রতিবাদস্থলে উপস্থিত প্রত্যেকের প্রোফাইল স্বয়ংক্রিয় ভাবে সংগ্রহ করে না। পূর্বের কোনও অপরাধের রেকর্ড না-থাকলে সাধারণ প্রতিবাদীদের উপরে অবাধ নজরদারি বা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের জন্য এটি ব্যবহার হয় না।
আরও পড়ুন:
নিট প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে মূল আন্দোলন হয়েছিল দিল্লির যন্তর মন্তরে। তার সমর্থনে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের অন্যত্রও। বড় মাপের বিক্ষোভ হয় বিহার, অসম এবং মহারাষ্ট্রে। কলকাতার রাস্তাতেও চলে আন্দোলন কর্মসূচি। সে সব কর্মসূচিতে পুলিশের উপরে পাল্টা আক্রমণের অভিযোগ উঠেছিল। দিল্লি-সহ দেশ জুড়ে বহু জনকে আটক করে পুলিশ। সুপ্রিম কোর্ট জানায়, নিট আন্দোলনে দেশ জুড়ে যে সব নাবালক বিক্ষোভকারীকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও দমনমূলক নীতি প্রয়োগ করা যাবে না। শুধু তা-ই নয়, অপরাধের ইতিহাস নেই এমন নাবালক বিক্ষোভকারীদের আটক বা গ্রেফতার করে রাখা যাবে না। মুক্তি দিতে হবে সকলকেই। পাশাপাশি, এই আন্দোলনে অশান্তির ঘটনায় নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্তের পক্ষেও সওয়ালও করেছে সুপ্রিম কোর্ট। তখন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের ইঙ্গিতও দিয়েছিল। মঙ্গলবার শীর্ষ আদালত জানাল, কমিটি গঠন করা হবে। সেই সংক্রান্ত নির্দেশ প্রকাশিত হবে বুধবার।
অন্য দিকে, গত ২৫ জুলাই বিহারে পড়ুয়াদের আন্দোলন কর্মসূচিতে এক পুলিশকর্মীর একে-৪৭ ব্যবহারের ছবি প্রকাশ্যে এসেছিল। তা নিয়ে আরও সক্রিয় হল বিহার পুলিশ। ওই ঘটনায় সিওয়ানের পুলিশ সুপার পুরণকুমার ঝা-কে পদ থেকে অপসারণ করা হল। যে কনস্টেবলকে একে-৪৭ হাতে দেখা গিয়েছিল, তাঁকে আগেই সাসপেন্ড করা হয়। ওই ঘটনার জেরে মঙ্গলবার বিহারের মোট ১৭ জন আইপিএস অফিসারকে বদলি করা হয়েছে। আন্দোলনে পুলিশের ‘অতিসক্রিয়তা’ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেন আরজেডি সাংসদ মনোজকুমার ঝা।