নিঠারী হত্যা মামলায় বেকসুর খালাস পেয়ে জেল থেকে বেরিয়েছিলেন সুরেন্দ্র কোলি। কিন্তু তার পরে মাসের পর মাস কাজ এবং মাথা গোঁজার একটা ঠাঁইয়ের জন্য হন্যে হয়ে ঘুরেছেন তিনি। ঘুরতে ঘুরতে হরিদ্বারে গিয়ে এক চায়ের দোকান ভাড়া নেন সুরেন্দ্র। শুক্রবার সকালে সেই চায়ের দোকান থেকে ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয় তাঁর।
প্রায় দুই দশক কারাগারে কাটানোর পর গত বছরের নভেম্বরে জেল থেকে বার হন সুরেন্দ্র। জেলমুক্তির পর কখনও চেন্নাই, কখনও বেঙ্গালুরুতে গিয়েছেন তিনি। তাঁর দাদা চন্দন কোলির কথায়, ভাই যেখানেই যেতেন, সেখানেই তাঁকে ছেঁকে ধরতেন অনেকে। তাঁদের দাবি ছিল, সুরেন্দ্রের জীবনের উপর তথ্যচিত্র বানানো! ওই মানুষদের থেকে বাঁচতে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন সুরেন্দ্র।
চলতি বছরের জুনে দিল্লিতে যান সুরেন্দ্র। সেখানে দাদার সংসারে উঠেছিলেন তিনি। সঙ্গে চলছিল কাজের সন্ধান। চন্দনের কথায়, ‘‘দিল্লিতে একটা চাকরির জন্য হন্যে হয়ে ঘুরছিল ভাই। কিন্তু বার বারই বলত, কেউ তাকে চাকরি দিচ্ছে না।’’ প্রায় মাসখানেক দিল্লিতে থাকার পর হরিদ্বারে চলে যান সুরেন্দ্র। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, হরিদ্বারের রোশনাবাদে একটা থাকার জায়গার খোঁজ শুরু করেছিলেন সুরেন্দ্র। কিন্তু যেখানেই ঘরের জন্য যাচ্ছিলেন, সেখানেই পরিচয়পত্র বা আধার কার্ড চাইতেন মালিকেরা। পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার ‘ভয়ে’ কখনওই নিজের আধার কার্ড কাউকে দেখাতে পারেননি সুরেন্দ্র।
থাকার জায়গার সঙ্গে সঙ্গে একটি কাজেরও সন্ধান শুরু করেন সুরেন্দ্র। একটি কারখানায় নিরাপত্তারক্ষীর কাজ নেন। তবে বেশি দিন সেখানে টিকতে পারেননি। পরে পরিচিত ধর্মেন্দ্র কৌশিক তাঁকে অন্য একটি কাজ খুঁজে দেন। এ বারও নিরাপত্তারক্ষীর কাজ শুরু করেন। তবে কোনও কারখানায় নয়, আবাসনে। কিন্তু সেই কাজও বেশি দিন করেননি তিনি। রোশনাবাদেই জয় কাশ্যপ নামে এক ব্যক্তির আলাপ হয় সুরেন্দ্রের। তাঁর অসহায় অবস্থার কথা শুনে সুরেন্দ্রের থাকা এবং কাজ খুঁজে দিতে সাহায্য করেছিলেন। তবে সুরেন্দ্র তাঁর কাছে নিজের আসল পরিচয় দেননি। জয়ের দাবি, সুরেন্দ্র তাঁকে জানিয়েছিলেন তিনি অলমোড়া থেকে আসছেন। তাঁর নাম সদারাম।
আরও পড়ুন:
মৃত্যুর দিন তিনেক আগে ধর্মেন্দ্রের পরিচয়পত্র ব্যবহার করে একটি চায়ের দোকান ভাড়া নেন সুরেন্দ্র। রোশনাবাদ থেকে নিজের সব জিনিসপত্র নিয়ে ওই দোকানেই ওঠেন। সেখানেই থাকতে শুরু করেন। জেলমুক্তির পর থেকে সুরেন্দ্র যে আর্থিক অনটনে ভুগছিলেন, তা জানিয়েছেন তাঁর অনেক পরিচিত। অলমোড়ার বাসিন্দা নারায়ণ সিংহ রাওয়াত বলেন, ‘‘আমি ১৫ বছর চিনি সুরেন্দ্রকে। সম্প্রতি সে আমার কাছে ১৫ হাজার টাকা চেয়েছিল। বলেছিল, একটা চায়ের দোকান খুলতে চায়। যখন তার প্রয়োজন হত, সামর্থ্য অনুযায়ী টাকা পাঠাতাম।’’
ধর্মেন্দ্রের সঙ্গেও নারায়ণের যোগাযোগ ছিল। এই ধর্মেন্দ্রের থেকে সুরেন্দ্রের খোঁজখবর পেতেন নারায়ণ। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতে ধর্মেন্দ্র তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, টাকাপয়সার টানাটানির কারণে মানসিক অবসাদে ভুগছেন সুরেন্দ্র। বার বার ফোন করেও বৃহস্পতিবার ফোন তোলেননি তিনি। সকালে ওই চায়ের দোকানে ঝুলন্ত অবস্থা পাওয়া যায় সুরেন্দ্রকে। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, আত্মহত্যাই করেছেন। তবে আত্মহত্যার নেপথ্যে কারণ এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
২০০৫-২০০৬ সাল নাগাদ উত্তরপ্রদেশের নিঠারীতে একের পর যুবতী, কিশোর-কিশোরী নিখোঁজ হতে শুরু করে। তার তদন্তেরই সূত্র ধরে ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর নিঠারির ব্যবসায়ী মণীন্দ্র সিংহ পান্ধেরের বাড়ির পিছনের এলাকা ও নালা থেকে উদ্ধার হয় ১৯টি কঙ্কাল এবং কিছু দেহাবশেষ। এই ঘটনায় গোটা দেশ জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। তদন্তকারীদের অভিযোগ ছিল, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের অপহরণ, যৌন নির্যাতন ও খুনের পর তাঁদের দেহের অংশ কেটে ফেলা হয়েছিল। কোলির কথিত স্বীকারোক্তিতে দেহের অংশ খাওয়ার দাবিও ছিল। তবে পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়ায় ওই স্বীকারোক্তি প্রমাণের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। এই মামলায় পান্ধের এবং কোহলিকে ফাঁসির সাজা শুনিয়েছিলেন সিবিআই আদালতের বিশেষ বিচারক পবন তিওয়ারি। ২০২৩ সালে এলাহাবাদ হাই কোর্ট ১২টি মামলায় কোহলি ও পান্ধেরকে খালাস করে, পরে ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই খালাসের বিরুদ্ধে রাজ্য এবং সিবিআইয়ের আবেদন খারিজ করে।
দীর্ঘ শুনানি পর্বের পর ২০২৫ সালে তাঁকে বেকসুর খালাস করে সুপ্রিম কোর্ট। তার পর জেল থেকে মুক্তি দেওয়া হয় তাঁকে। সুরেন্দ্রের বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা দায়ের হয়েছিল। ১২টি মামলায় বেকসুর খালাস পেয়ে যান। একটি মামলা ঝুলে ছিল। সেই মামলায় তিনি শাস্তি মকুবের আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টে। সেই আবেদনে সাড়া দেয় শীর্ষ আদালত। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাঁকে শেষ মামলাটিতেও বেকসুর খালাস করে সুপ্রিম কোর্ট।