Advertisement
E-Paper

ককরোচদের আন্দোলনের জেরে নেতারা এখন ইনস্টাগ্রাম-মুখী! অ্যালগোরিদমের আড়ালে কি হারিয়ে যাবে রাজনৈতিক বিতর্ক?

এক ধাক্কায় ইনস্টাগ্রামের প্রতি রাজনৈতিক নজর বাড়িয়ে দিয়েছে আরশোলাদের আন্দোলন। কিন্তু যে অ্যালগোরিদমে জনপ্রিয়তা আসে, তাতে গভীর আলোচনা-বিতর্কের সুযোগ কম, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৮:৫৪
The Cockroach movement pushes the mainstream political leaders in Instagram more actively

ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ব্যক্তিত্ব-নির্ভর বিষয়বস্তুই ইনস্টাগ্রামে বেশি জনপ্রিয়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে, দিল্লির রাজপথে আরশোলাদের দাপাদাপির মাঝে এক দিন হঠাৎ মাঝরাতে সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি নিজের মুঠোফোন থেকে ভিডিয়ো বার্তা দিতে এলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একসঙ্গে প্রচারিত হল ফেসবুক, এক্স এবং ইনস্টাগ্রামে। এক ভিডিয়োয় হঠাৎ লাখের অঙ্কে বেড়ে গেল মোদীর ইনস্টাগ্রাম-দর্শক।

ইনস্টাগ্রাম আচমকাই ভারতীয় রাজনীতিতে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। এ দেশে সবচেয়ে প্রভাবশালী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছিল ফেসবুক, এক্স (টুইটার) ও ইউটিউব। এ ছাড়া, সরাসরি যোগাযোগের জন্য হোয়াটস্অ্যাপ। কিন্তু ককরোচ জনতা পার্টির উত্থানই ইনস্টাগ্রামে। রাতারাতি বিজেপির ইনস্টাগ্রাম ফলোয়ার-সংখ্যাকে ছাপিয়ে গিয়ে কার্যত গোটা বিশ্বের নজর কেড়ে নেন স্বঘোষিত আরশোলারা।

আরশোলারা রাজপথে নেমে এলে ও তাঁদের আন্দোলন ইনস্টাগ্রামে ঝড় তুললে মোদী নিজে ইনস্টাগ্রামে নজর দেন। সেখানে মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করা নিজস্বী ভিডিয়োর দাপট রয়েছে বলে মোদীও সেই ভাবেই বার্তা দেন। তাঁর মন্ত্রীদেরও বলেন, ইনস্টাগ্রামে নজর বাড়াতে।

তার পর থেকে হু হু করে বেড়েছে ইনস্টাগ্রামে মোদীর বার্তার দর্শকসংখ্যা। একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আরশোলাদের ‘সংসদ চলো’ অভিযানের পরে মোদীর প্রতি ইনস্টাগ্রাম পোস্টে সাড়া পড়ার সংখ্যা গড়ে ১৯ লাখ থেকে বেড়ে ৪৬ লাখ ৩০ হাজারে পৌঁছেছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গাঁধীর গড় ‘এনগেজমেন্ট’ও দেড় লাখ থেকে বেড়ে ৪ লাখ ২৬ হাজারে পৌঁছেছে। এই তথ্য ‘ডেটা বিইংস’-নামে একটি সংস্থার।

নেতাদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের তুলনায় দলীয় অ্যাকাউন্টগুলোর বৃদ্ধির হার অবশ্য অনেক কম। এর থেকে বোঝা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক প্রচারের তুলনায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ব্যক্তিত্ব-নির্ভর বিষয়বস্তুই ইনস্টাগ্রামে বেশি জনপ্রিয়। আগামীতে এই প্রবণতাকে মাথায় রেখে আরও অনেক নেতা তাঁদের বক্তব্য সাজাবেন, এটা ধরেই নেওয়া যায়।

আমেরিকার মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জয়জিৎ পালের মতে, ইনস্টাগ্রামের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার কারণ তার অ্যালগোরিদম। এক্স-এ যাঁর যত বেশি ‘ফলোয়ার’, তাঁর বার্তা ছড়াবে তত বেশি। সাধারণ মানুষের বার্তা জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা কম। তদুপরি, অযাচিত ও বিজ্ঞাপিত কন্টেন্টের ভিড়ের জন্য এই প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার সম্প্রতি কমে গিয়েছে। অন্য দিকে, ইনস্টাগ্রামে জনপ্রিয় হতে অনেক ‘ফলোয়ার’ থাকতে হয় না। বিষয়বস্তুর দৃষ্টিআকর্ষণকারী ক্ষমতা ও দর্শকদের মনোযোগ ধরে রাখার সম্ভাবনা অ্যালগোরিদম নিজেই যাচাই করে। “বার্তা বা বিষয়বস্তু আকর্ষণীয় হলে অ্যালগোরিদমই তাকে জনপ্রিয় করে দেবে,” বলেন জয়জিৎ।

অ্যালগোরিদম করে কী, আপনি যে ধরনের ভিডিয়ো একবার পছন্দ করা শুরু করেছেন, আপনাকে সে রকম ভিডিয়োই পাঠাতে থাকবে। রাজনৈতিক প্রচারের ক্ষেত্রে এর প্রভাব এই যে, আপনি কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের পক্ষে বা বিপক্ষে বেশি আগ্রহ দেখালে আপনার কাছে সেগুলিই বেশি আসবে, বিরোধী যুক্তি আসবে কম।

নেট দুনিয়া নিয়েই দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করছেন অদ্রিজা বোস, বর্তমানে ‘ডিকোড ইন্টারনেট’-এর সম্পাদক। তাঁর মতে, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ফেসবুক থেকে বেরিয়ে গিয়েছেন, কারণ ফেসবুকে তাঁদের আত্মীয়-পরিজনেরাও দলে দলে আছেন। মূলত পরিবারের লোকজনের নজরের বাইরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করার তাড়না থেকেই তরুণ বা মধ্যবয়সিদেরও একটা বড় অংশ ফেসবুক ছেড়ে ইনস্টাগ্রামে সক্রিয় হয়েছেন; তাই নেতারাও তাঁদের বার্তা পৌঁছে দিতে ইনস্টাগ্রামে ঝুঁকছেন।

বিভিন্ন তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ভারতে ইনস্টাগ্রামের মোটামুটি ২৫ কোটি ব্যবহারকারী। বড় অংশই ১৮-৩৪ বছর বয়সি। যদিও ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ইনস্টাগ্রামের প্রায় দ্বিগুণ, কিন্তু ইনস্টাগ্রামে দর্শকদের সাড়া পাওয়ার হার ফেসবুকের চেয়ে অনেক বেশি।

জয়জিতের মতে, এক্স (সাবেক টুইটার) আজও সিরিয়াস বার্তা প্রদানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখানে তরুণ প্রজন্মের অংশগ্রহণ কম। লিখিত বার্তার চেয়ে ছোট ভিডিয়ো দেখতে আজকের প্রজন্ম বেশি আগ্রহী। ইউটিউবও তাই দীর্ঘ ভিডিয়ো থেকে ছোট ভিডিয়োর দিকে নজর বাড়াচ্ছে। কিন্তু মূলত ইনস্টাগ্রামই হল ছোট ভিডিয়োর জায়গা। তবে, সেখানে শুধু তরুণ প্রজন্ম আছে, এটা ভুল ধারণা।

“ইনস্টাগ্রামে প্রচুর মধ্যবয়সিও আছেন। কেউ রান্না শেখাচ্ছেন, কেউ সাজগোজ, কেউ ব্যায়াম। এই সব ইনফ্লুয়েন্সার বা নেট-প্রভাবীদের অনেকেরই লক্ষ লক্ষ ‘ফলোয়ার’।” ইনস্টাগ্রামের বাড়তে থাকা জনপ্রিয়তার কারণেই এই প্ল্যাটফর্মের প্রতি নেতাদের ঝোঁক বাড়ছে বলে জয়জিতের অভিমত।

সক্রিয়তা ফেসবুক বা টুইটারের তুলনায় কম থাকলেও ইনস্টাগ্রামে ভারতীয় রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি আগেই ছিল। এমনিতেই ১০ কোটিরও বেশি ফলোয়ার নিয়ে নরেন্দ্র মোদী বিশ্বনেতাদের মধ্যে ইনস্টাগ্রামে শীর্ষস্থানে রয়েছেন। সেখানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফলোয়ার সাড়ে ৪ কোটিও নয়। কোটির ওপর ফলোয়ার আছে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ও কংগ্রেসের রাহুল গাঁধীরও।

তবে, অদ্রিজার মতে, আরশোলা আন্দোলনের আগে আর পরে ইনস্টাগ্রামে রাজনৈতিক প্রচারের পদ্ধতি বদলেছে। আগে বিজেপি মূলত নানান নেট-প্রভাবীরই মাধ্যমেই বার্তা ছড়ানোর কাজ করত। এঁদের নিয়ে কর্মশালা, পুরস্কার প্রদান, এ রকম নানা কর্মকাণ্ড করেছে বিজেপি এবং তাঁদের পরিচালিত নানান সরকার। কিন্তু আরশোলা আন্দোলনের সময় দেখা গেল এই নেট-প্রভাবীদের প্রচার বিশেষ কাজে আসেনি। তাই এ বার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব সরাসরি ব্যক্তিগত ভাবে জুড়ে যাচ্ছেন।

সম্প্রতি, রাহুলও ইনস্টাগ্রামে প্রশ্নোত্তরের আসরে অংশ নিয়েছেন। শিক্ষা, রাজনীতি থেকে শুরু করে ব্যাটম্যান পর্যন্ত নানা বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

কিন্তু অ্যালগোরিদম অনুযায়ী বার্তা সাজানোর বিপদও আছে। তার নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে পড়লে তবেই বিষয়বস্তু জনপ্রিয় হয়।

ফেসবুকে একটি ছবি-সহ দীর্ঘ লেখা বা একটু দীর্ঘ ভিডিয়ো বেশ জনপ্রিয় হয়। ইউটিউবেও দীর্ঘ ভিডিয়ো আলোচনার জনপ্রিয়তা আছে। কিন্তু ইনস্টাগ্রামে দৈর্ঘ্যের স্থান নেই। শান্ত, গভীর আলোচনা নয়, চমকসৃষ্টিকারী দৃশ্য বা রাগ, ঠাট্টা, ব্যঙ্গ ও ঘৃণার মতো তীব্র আবেগ-সঞ্চারী ছোট ভিডিয়োরই জনপ্রিয়তা। কোনও নেতাকে আক্রমণ বা ব্যঙ্গ করে করা একটি ২০-সেকেন্ডের রিল যেখানে কয়েক লক্ষ মানুষকে আকর্ষণ করতে পারে, সেখানে বেকারত্ব, শিক্ষা-নীতি বা সংবিধানের কোনও জটিল প্রশ্ন নিয়ে দশ মিনিটের যুক্তিনির্ভর আলোচনা তুলনামূলক ভাবে কম গুরুত্ব পাবে অ্যালগোরিদমের কাছে।

এ বছর জুনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় মহারাষ্ট্রের পুণের ফ্লেম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক দেশের ছয়টি প্রধান রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বেশি দেখা ইনস্টাগ্রাম রিল বিশ্লেষণ করে দেখান, তারা অ্যালগোরিদম মাথায় রেখে সর্বোচ্চ মনোযোগ ও সাড়া পাওয়ার জন্য তাদের বার্তা সাজাচ্ছে। উত্তেজনা সৃষ্টির তাড়নায়, তাদের বার্তা আরও প্রতিক্রিয়া-উদ্রেককারী ও আবেগনির্ভর হয়ে উঠছে।

বাংলায় এখনও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের কোনও বাড়তি প্রয়াস দেখা যায়নি। এ রাজ্যে ফেসবুকের দাপট অনেকটাই বেশি। তবে, দলগত ভাবে বিজেপি, মমতাপন্থী তৃণমূল, কংগ্রেস ও সিপিএম, সবাই ইনস্টাগ্রামে তাদের কর্মকাণ্ড বাড়ানো শুরু করেছে।

প্রশ্ন হল, রাজনীতি কি তা হলে অ্যালগোরিদমের মনোযোগ-দখলের নিয়ম মেনে চলতে গিয়ে নিজের জটিলতা হারাবে? সহজ-সরল, চটকদার সমাধানের জনপ্রিয়তা বেড়ে যাবে আরও?

Narendra Modi Abhijeet Dipke Rahul Gandhi Cockroach Janta Party Student Protest Delhi Protest

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy