দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং নির্বাচন কমিশনার (ইসি) বাছাইয়ের প্যানেল থেকে দেশের প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা মামলা বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানো হবে কি না, তা-ই নিয়ে মতভেদ সুপ্রিম কোর্টে।
২০২৩ সালের ওই নির্দেশের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক আবেদন হয়েছে শীর্ষ আদালতে। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মাকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ পাঁচ দিন ধরে ওই মামলার শুনানিশেষে ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছে বুধবার। বিচারপতি দত্তের মন্তব্য, ‘‘আমরা যদি সর্বসম্মত রায় দিতাম, তবে তা প্রাতিষ্ঠানিক সংহতির স্বার্থেই হত। দুর্ভাগ্যবশত, এখানে মতপার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্যের কারণেই আমাকে আরও বিস্তারিত একটি নির্দেশনামা লিখতে হয়েছে।’’
বস্তুত, বিচারপতি দত্ত কেন্দ্রের ওই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যেখানে বলা হয়, আবেদনগুলি সাংবিধানিক গুরুত্বের মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। তাই সেগুলিকে পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানো উচিত। বিচারপতি শর্মা আবার বিচারপতি দত্তের সঙ্গে একমত হননি। কিন্তু উভয় বিচারপতিই একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে এবং সাংবিধানিক বিষয় নিষ্পত্তির জন্য সেই বেঞ্চকে স্থায়ী করা যায় কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রশাসনিক দিকটি দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছে পাঠাতেই সম্মত হয়েছেন।
বিচারপতি দত্ত মন্তব্য করেন, ‘‘বিচারকেরাই বিচারক নিয়োগ করেন— এটা অলীক ধারণা। দীর্ঘদিনের প্রচলিত এই ভুল ধারণা দূর করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।’’ তাঁর অভিযোগ, স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে একটি বয়ান ছড়িয়েছে এবং তাঁরা প্রায়শই বিচার বিভাগীয় নিয়োগ সংক্রান্ত কিছু বিতর্কিত রায় থেকে শক্তি সঞ্চয় করে আসছেন।
২০২৩ সালের ২ মার্চ দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এবং নির্বাচন কমিশনারদের (ইসি) নিয়োগকে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যে একটি রায়ে পাঁচ বিচারপতির একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ এই সিদ্ধান্ত দেয় যে, প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং দেশের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত একটি কমিটির পরামর্শে রাষ্ট্রপতি তাঁদের নিয়োগ করবেন।
নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব প্রসঙ্গে বিচারপতি দত্ত ক্রিকেটের উদাহরণ টানেন। তাঁর কথায়, “যে দল ব্যাট করবে, তারাই যদি আম্পায়ার নির্বাচন করে, তবে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এমনকি, আম্পায়ার যদি সঠিক সিদ্ধান্তও নেন, তার পরেও তাঁর নিরপেক্ষতা সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়।’’ তাঁর ব্যাখ্যা, এ ধরনের আম্পায়ার সবসময় একটি দলের প্রতিই অনুগত বলে সন্দেহ করা হয়। নির্বাচন কমিশনারের নিয়োগ প্রক্রিয়াও এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে মুক্ত হওয়া উচিত, যাতে তাঁদের স্বাধীনতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে কোনও সন্দেহ না থাকে।
বিচারপতির পর্যবেক্ষণের সারমর্ম, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন হতে হলে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকতে হবে। তাঁর মন্তব্য, ‘‘অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন একটি সত্যিকারের স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের উপর নির্ভর করে। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন হওয়াই যথেষ্ট নয়, তাকে স্বাধীন বলে প্রতীয়মান হতে হবে।’’
প্রসঙ্গত, এই রায়ের দিনই ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদন নিয়ে শোরগোল শুরু হয়েছে। অভিযোগ, দুই নির্বাচন কমিশনারকে অন্ধকারে রেখে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।