অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ করবে ভারত। বৃহস্পতিবার মার্কিন কংগ্রেস বিল পাস করে রুশ তেলের ক্রেতা দেশগুলির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে তুলে দেওয়ার পরেই স্পষ্ট ভাষায় এ কথা জানিয়ে দিল নয়াদিল্লি। বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘ভারত তার ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃঢ় ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তার বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’’
ওয়াশিংটনের চাপে নতিস্বীকার করে মস্কো থেকে তেল কেনা ভারত বন্ধ করবে না বলেও বার্তা দেওয়া হয়েছে বিদেশ মন্ত্রকের তরফে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘‘বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে তেল সংগ্রহ এবং পরিবর্তনশীল বাজার পরিস্থিতির ভিত্তিতে পদক্ষেপ ভারত অব্যাহত রাখবে।’’ নয়াদিল্লির তরফে বলা হয়েছে, বিল পাসের বিষয়টির উপর সরকার নজর রাখছে। প্রসঙ্গত, মার্কিন আইনসভার (কংগ্রেস) উচ্চকক্ষ সেনেটের পাস হওয়ার পরে বুধবার নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টিটিভসের পাস হয়েছে ‘লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাঙ্কশনিং রাশিয়া এবং ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬’ শীর্ষক বিলটি। এর ফলে ভারত, চিনের মতো রুশ তেলের ক্রেতাদের উপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসাতে পারবেন ট্রাম্প।
আরও পড়ুন:
বর্তমানে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের উপর শুল্কের হার ১২ শতাংশের কাছাকাছি। যদি ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতা ব্যবহার করে শুল্ক ১০০ শতাংশ করে দেন, তবে মার্কিন বাজারে ভারতীয় পণ্যের দাম একলাফে অনেক বেড়ে যাবে, যা ভারতীয় রফতানিকারক সংস্থাগুলি এমনকি, সামগ্রিক অর্থনীতিকে বড়সড় ধাক্কা দিতে পারে। তা ছাড়া, সম্ভাব্য সংঘাত-পরিস্থিতিতে ভারত-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে যাবে বলে কূটনীতি পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন। তবে নয়াদিল্লির পক্ষে আশার কথা হল বিলটি পাস হওয়া মানেই ভারত-সহ ১০টি দেশের উপর স্বয়ংক্রিয় ভাবে ১০০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়ে যাওয়া নয়। এই বিলে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ওয়েভার’ বা বিশেষ ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মনে করছেন, ভারত আলোচনার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বা ‘কোটা’ অনুযায়ী রুশ তেল কেনার ছাড় আদায় করে নিতে পারে ট্রাম্পের থেকে।
গত ৭ অগস্ট সেনেটে বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ৮৬ জন। আর বিপক্ষে ১১ জন। বুধবার এই বিল পেশ করা হয় নিম্নকক্ষে। সেখানে বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ২৬২টি। আর বিপক্ষে ১৫৯টি। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির ২০৩, বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ৫৮ এবং এক নির্দল সদস্য বিলের পক্ষে ভোট দেন। বিপক্ষে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ১৫২ এবং ৭ রিপাবলিকান। আইনসভার দুই কক্ষেই বিলটি পাস হয়ে যাওয়ায় এখন এটি সরাসরি হোয়াইট হাউসে চলে যাবে। বিলে ট্রাম্প স্বাক্ষর করলেই আইনে পরিণত হবে এটি। রাশিয়া থেকে তেলে কেনার জন্য কোন দেশের উপর কত শুল্ক বসবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে। প্রসঙ্গত, বাণিজ্যবিষয়ক তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের রিপোর্ট অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পরের সপ্তাহগুলিতে রুশ তেল আমদানির উপর সাময়িক ছাড় দিয়েছিল ওয়াশিংটন। সে সময় ভারতীয় শোধনাগারগুলি রাশিয়া থেকে দিনে গড়ে ২০ লক্ষ ২৫ হাজার ব্যারেল তেল আমদানি করেছিল। গত জুলাইয়ে রাশিয়া থেকে ভারতের তেল আমদানি দৈনিক ২০ লক্ষ ৮১ হাজার ব্যারেলে পৌঁছায়। এর পর অগস্টে তা কমে ২০ লক্ষ ৭০ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে। মার্কিন শুল্কের চাপে রুশ তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে নতুন করে ঘরোয়া বাজারে জ্বালানি-অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।