বিহারে বাঁকিপুরের মতো শক্ত ঘাঁটিতে ‘আকস্মিক’ পরাজয়ে স্বাভাবিক ভাবেই অস্বস্তিতে বিজেপি। দলের সর্বভারতীয় সভাপতির ছেড়ে আসা আসনে কেন এ ভাবে হারতে হল, তা নিয়ে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যে আসন গত তিরিশ বছর ধরে বিজেপির গড় হিসেবে পরিচিত। কিন্তু বাঁকিপুরে বিজেপির হারে তেমন উল্লাসের ছবি নেই বিরোধী শিবিরে। কারণ, জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন প্রাক্তন ভোটকুশলী প্রশান্ত কিশোর, পিকে নামেই যিনি সমধিক পরিচিত। আরজেডি বা কংগ্রেসের মতো রাজ্যে প্রতিষ্ঠিত বিরোধী দলের কপালে শিকে ছেঁড়েনি। উল্টে তাদের ভোটও কমে গিয়েছে। পিকে শাসক বিজেপিকে হারিয়েছেন, হারিয়ে দিয়েছেন বিরোধী আরজেডি-কংগ্রেস জোটকেও।
ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র আন্দোলনের জেরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পাঁচ দিনের মাথায় ভোট হয়েছিল বাঁকিপুরে। চলতি ব্যবস্থার প্রতি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের যে ক্ষোভ, তা ভোটবাক্সে আছড়ে পড়েছে বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা। মনে রাখতে হবে, দিল্লির যন্তর মন্তরের বাইরে ‘ককরোচদের’ আন্দোলনের আর যে যে প্রাণকেন্দ্র ছিল, পটনা তাদের অন্যতম। সাবেক পটনা পশ্চিম এবং পটনা মধ্য বিধানসভা কেন্দ্র দু’টি ভেঙেই গড়ে উঠেছে নতুন কেন্দ্র বাঁকিপুর।
আরও পড়ুন:
পটনা পশ্চিম কেন্দ্র ১৯৯৫ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত পর পর চার বার জিতেছিলেন নিতিন নবীনের বাবা নবীন কিশোর প্রসাদ সিনহা। ২০০৮ সালে বাঁকিপুর কেন্দ্র তৈরি হওয়ার পরে ২০১০-এর নির্বাচন থেকে নিতিন নবীনের জেতা শুরু। গত বছর বিধানসভা নির্বাচনেও জিতেছেন, প্রায় ৫২ হাজার ভোটে। তিনিও পর পর চার বার। বিজেপি সভাপতি হওয়ার পরে বাঁকিপুর ছেড়ে রাজ্যসভায় গিয়েছেন নিতিন। তাই উপনির্বাচন। সেই ভোটে ৪৯.২৩ শতাংশ ভোট পেয়ে বাজিমাত করেছেন পিকে। বিজেপি প্রার্থী নীরজকুমার সিন্হা পেয়েছেন ৩৪.৪০ শতাংশ ভোট।
এটা মুদ্রার একটা পিঠ। অন্য পিঠটা হল, লালু-তেজস্বীর দল আরজেডি-র প্রার্থী রেখাকুমারী গুপ্তা রেখাকুমারী গুপ্ত মাত্র ১০.৯৫ শতাংশ ভোট পেয়ে তিন নম্বরে। বিধানসভা ভোট আর উপনির্বাচনের মধ্যে ফারাক আট মাসের। তার মধ্যেই আরজেডির ভোট কমেছে ১৮.৬০ শতাংশ বিন্দু। অর্থাৎ, বাঁকিপুর শুধু শাসককে প্রত্যাখ্যান করেনি, প্রধান বিরোধী দলকেও করেছে। প্রাথমিক বিশ্লেষণ বলছে, আরজেডির যাদব এবং মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে ভালরকম ভাগ বসিয়েছেন ব্রাহ্মণসন্তান পিকে। উচ্চবর্ণের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিও পিকে-র উন্নয়ন-সুশাসনের ডাকে সাড়া দিয়েছে। ফলে বিরোধী ব্যাটন আরজেডি-র হাতছাড়া। অন্তত বাঁকিপুরে।
আর এই ফলাফল দেখে আরজেডি-সঙ্গ ছাড়ার দাবি উঠেছে বিহার কংগ্রেসের অন্দরে। এই দাবি যাঁরা তুলছেন, তাঁদের যুক্তি, লালুর দল ‘জঙ্গলরাজের’ (লালু মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় বিহারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে বিরোধীরা জঙ্গলরাজের সঙ্গে তুলনা করতেন) তকমা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। জোটসঙ্গী হিসেবে তার খেসারত দিতে হচ্ছে কংগ্রেসকেও। এই নেতাদের মতে, রাজ্যে এনডিএ সরকারের উপরে উচ্চবর্ণের ভোটারেরা ক্ষুব্ধ। অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায় (ওবিসি)-এর নীতীশ কুমার প্রায় দু’দশক পটনার মসনদে ছিলেন। তাঁর জায়গায় বিজেপির যিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন, সেই সম্রাট চৌধরিও ওবিসি। উচ্চবর্ণের কাউকে মুখ্যমন্ত্রী করাটা মেনে নেবেন না বিজেপির জোটসঙ্গী নীতীশ। কিন্তু দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন এবং স্বচ্ছ ভাবমূর্তির কারণে নীতীশকে মেনে নিয়েছিলেন উচ্চবর্ণের ভোটারেরা। সম্রাটে তাঁদের তীব্র আপত্তি। নতুন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে নানা অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগও বিস্তর। প্রচারে সেগুলোই হাতিয়ার করেছিলেন পিকে। ভোটে জেতা পরে দাবি করেছেন, এটা সম্রাট চৌধরিকে সরানোর পক্ষে জনমত। কংগ্রেস নেতাদের একাংশ বলছেন, দলের উচিত পুরনো উচ্চবর্ণের ভোটব্যাঙ্ককে আবার কাছে টানার চেষ্টা করা।
অন্য বিরোধী দলগুলি অবশ্য বাঁকিপুরের ফলাফলকে কেবল বিহারের রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির বিক্ষোভের প্রভাব বিহারেও পড়েছে। তাই জাতপাতের চেনা সমীকরণে ভোটের ফল নির্ধারিত হয়নি। পুরোদস্তুর রাজনৈতিক দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে সিজেপি পিকে-র দলের সঙ্গে হাত মেলালে কী হবে, তা নিয়ে হিসাবনিকাশ শুরু করে দিয়েছে তারা।