শ্রীনগরের আদালতে এ বার হলফনামা জমা দিলেন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট (জেকেএলএফ)-এর নেতা ইয়াসিন মালিক। ১৯৯০ সালে কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়ের নার্স সরলা ভট্টকে ধর্ষণ এবং খুনের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বুধবার শ্রীনগরের বিশেষ আদালতে ২৫ পাতার হলফনামা জমা দিয়েছেন তিনি। ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ অনুযায়ী, হলফনামায় ইয়াসিন তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য বলেছেন। জানিয়েছেন, তিনি মামলা লড়বেন না। একই সঙ্গে এ-ও দাবি করেছেন, ওই হত্যাকাণ্ডে তাঁর কোনও ভূমিকা ছিল না।
২০১৯ সাল থেকে দিল্লির তিহাড় জেলে বন্দি রয়েছেন ইয়াসিন। ধর্ষণ এবং খুনের মামলায় অভিযুক্ত ইয়াসিনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসে মদত এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকালেপ জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। তাতে ২০২২ সালেই নিম্ন আদালত তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। বর্তমানে ইয়াসিন তিহাড় জেলের সাজাপ্রাপ্ত বন্দি।
সরলা হত্যাকাণ্ডের ৩৫ বছর পরে গত বছরের অগস্টে নতুন করে তদন্ত শুরু করে জম্মু ও কাশ্মীরের গোয়েন্দা সংস্থা ‘স্টেট ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি’ (এসআইএ)। গত জুনে শ্রীনগরের আদালতে ৭৩৭ পাতার চার্জশিট জমা দেন তদন্তকারীরা। এ বার ওই মামলায় হলফনামা জমা দিলেন ইয়াসিন।
‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’ অনুযায়ী, হলফনামায় ইয়াসিন লিখেছেন, “ব্যক্তিগত পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে, অনেক চিন্তাভাবনার পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এই বিচারপ্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করব না। আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক। তবে আমার এই সিদ্ধান্তের জন্য যেন এটা ধরে না নেওয়া হয় যে আমি দোষস্বীকার করছি।” জেলবন্দি ওই বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার দাবি, তাঁকে এই মামলায় ‘মিথ্যা ভাবে ফাঁসানো’ হয়েছে। হলফনামায় তাঁর বক্তব্য, “আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার বিরুদ্ধে আমার কোনও অভিযোগ নেই। তবে আমার ধারণা, এই মামলাটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সিদ্ধান্তের কারণেই উঠে এসেছে। এতে আমাকে মিথ্যা ভাবে ফাঁসানো হয়েছে বলে আমার বিশ্বাস।”
আরও পড়ুন:
ইয়াসিনের বক্তব্য, সরলা যে সময়ে খুন হন সে সময়ে তিনি গুরুতর আহত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর দাবি, “১৯৯০ সালের এপ্রিলের ওই সময়ে আমি গুরুতর আহত ছিলাম। অচেতন অবস্থায় ছিলাম। আমার চিকিৎসা চলছিল। ফলে প্রতিশোধ নিতে সরলা ভট্টকে খুনের নির্দেশ দেওয়ার যে অভিযোগ উঠেছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।” হলফনামায় ইয়াসিন এ-ও দাবি করেন, যে ব্যক্তি অচেতন অবস্থায় ছিলেন, তিনি কী ভাবে এই অপরাধ ঘটাতে পারেন, তা বোধগম্য নয়।
নিজের পাকিস্তানি স্ত্রী মুশল মালিকের সঙ্গেও বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইয়াসিন। তাঁর দাবি, স্ত্রীকে যাতে বিধবার জীবন বাঁচতে না-হয়, সেই কারণেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। স্ত্রীর উদ্দেশে ইয়াসিন লেখেন, “তুমি আমার চেয়ে ২০ বছরের ছোট। আমি চাই না তুমি বাকি জীবন আমার বোঝা বয়ে বেড়াও। তোমার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার সাহসী সিদ্ধান্ত নাও। ফাঁসি হওয়ার আগে আমি বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় পাকিস্তানি মদতপুষ্ট জঙ্গি ও দুষ্কৃতীদের হিংসার শিকার হয়ে কাশ্মীর উপত্যকা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন কাশ্মীরি পণ্ডিতেরা। সে সময় বেছে বেছে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের উপর নির্যাতন চালায় জঙ্গিরা। ওই সময়েই নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন শ্রীনগরের শের-ই-কাশ্মীর ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস-এর নার্স সরলা।
১৯৯০ সালের ১২ এপ্রিল রাতে সরলা হাসপাতাল থেকে ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থিত তাঁর হস্টেলে ফিরছিলেন। চার্জশিটে বলা হয়েছে, সে সময় মূল চক্রান্তকারী ইয়াসিনের সঙ্গীরা একটি গাড়িতে করে সরলাকে অপহরণ করেছিলেন। তাঁকে আটকে রেখে নৃশংস শারীরিক নির্যাতন এবং ধর্ষণ করা হয়েছিল। এর পরে তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিন দিন পরে, তাঁর নির্যাতনের চিহ্নযুক্ত ও গুলিবিদ্ধ দেহ শ্রীনগরের একটি সড়কে ফেলে দেওয়া হয়েছিল।