৪০০০ বছর আগেও ধুনো পোড়ানো হত! সিন্ধুসভ্যতা থেকে বাঙালির ঠাকুরঘর, কী ভাবে পুজোর উপচার হল ধুনো
সিন্ধুসভ্যতাতেও ধুনোর ব্যবহার ছিল? কলকাতা বিষয়ক গবেষক জানিয়েছেন, প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে যে ধুপদানি ও পোড়ামাটির পাত্র পাওয়া গিয়েছে, তা থেকেই প্রমাণিত হয় ধুপ বা ধুনোর ব্যবহার ৪০০০ বছর আগেও ছিল।
সুগন্ধের সঙ্গে আধ্যাত্মের আত্মীয়তা প্রায় চিরায়ত বললেই চলে। যে কোনও ধর্মের উপাসনাস্থলে পা রাখলেই পাওয়া যায় প্রশান্তিদায়ক সুঘ্রাণ। দেবতাকে তুষ্ট করতে ও তাঁর সান্নিধ্য পেতে যুগে যুগে প্রয়োজন হয়েছে ধূপ, ধুনো, ফুল আর চন্দনের। গন্ধের মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে দৈবের এই অদৃশ্য আদান-প্রদান মনে করিয়ে দেয় যে, সুবাস নিয়ে চিন্তাভাবনা যেমন সুপ্রাচীন, তেমনই গভীর তার তাৎপর্য। সুগন্ধই বিক্ষিপ্ত মনকে মুহূর্তেই সুস্থিত করে, আধ্যাত্মিক চেতনায় নিবদ্ধ বা সংযুক্ত হতে সাহায্য করে। তাই পুজোর উপচারে ধুপ বা ধুনোর ব্যবহার সেই প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। অবশ্য ধুনো যে কেবলই পুজোর উপচার তা নয়, এর স্বাস্থ্যগত উপকারিতাও আছে।
ধুনো কবে থেকে পুজোর উপচারে এল, তার সঠিক তথ্য বোধ হয় পাওয়া যাবে না তেমন ভাবে। তবে পুরনো কলকাতার ইতিহাস বিষয়ক গবেষক হরিপদ ভৌমিক জানিয়েছেন, সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল থেকেই ধুনোর প্রচলন ছিল।
সিন্ধু সভ্যতার (হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো) প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে ধূপদানি বা পোড়ামাটির পাত্রের নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রায় ৪০০০ বছর আগেও সিন্ধু উপত্যকার মানুষজন যে সুগন্ধি রজন বা উদ্ভিজ্জ আঠা পুড়িয়ে ঘরবাড়ি সুরভিত করতেন এবং বিষাক্ত কীটপতঙ্গের উপদ্রব থেকে রক্ষা পেতেন, তার প্রমাণই হল ওই সব ধুপদানি ও পোড়ামাটির পাত্র।
বৈদিক যুগে হোম ও মহাযজ্ঞের প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠত ঘি, কাঠের টুকরো এবং বুনো লতাপাতার সুবাসিত আহুতিতে। বৈদিক ঋষিরা লক্ষ করেছিলেন যে, শালগাছের রজন বা ধুনো পোড়ালে যে সুগন্ধ ছড়ায়, তা চারপাশের বাতাস বিশুদ্ধ করে। আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি হয়।
চরক সংহিতার ‘সূত্রস্থান’ (পঞ্চম অধ্যায় বা মাত্রাশীতীয় অধ্যায়) এবং ‘শারীরস্থান’-এ ভেষজ ধোঁয়া বা বাষ্প গ্রহণের বিশদ বিবরণ রয়েছে। ধুনোকে অন্যান্য জীবাণুনাশক ভেষজের সঙ্গে মিশিয়ে 'ধূপন' বা ধোঁয়া তৈরির প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হত।
আরও পড়ুন:
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জনজীবন, লৌকিক সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে এই প্রাকৃতিক সুবাস পবিত্রতার চিহ্নক হয়ে ওঠে। হরিপদবাবুর মতে, মনের নেতিবাচকতা ও অশুভ শক্তি দূর করার অন্যতম উপায় হিসেবে পুজোয় ধুনো জ্বালানোর রেওয়াজ তৈরি হয়। যে কোনও ধর্মেই আরাধনার সময়ে সুগন্ধির ব্যবহার ও সুগন্ধি ধোঁয়া ছড়ানোর রেওয়াজ রয়েছে।
ধুনো আসলে শাল গাছ থেকে পাওয়া এক ধরনের সুগন্ধি রজন বা আঠা। শাল গাছের কাণ্ডে আঘাত করলে গাঢ় আঠালো তরল নিঃসৃত হয়, যা শুকিয়ে গেলে কড়া ও শক্ত রজনের রূপ নেয়। সেটি নারকেলের ছোবড়ায় দিয়ে আগুন ধরালে সুগন্ধি ধোঁয়া বার হয়।
প্রাচীন রাঢ় বাংলা (এখনকার বীরভূম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম) এবং ছোটনাগপুর মালভূমি ও ঝাড়খণ্ডের জঙ্গলঘেরা এলাকাগুলি ছিল শাল গাছে সমৃদ্ধ। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স ও তরাই অঞ্চলেও প্রচুর শাল গাছের দেখা মেলে। তাই ধুনোর সঙ্গে বঙ্গজীবনের পরিচয় আজকের নয়।
এই সব অরণ্য অঞ্চলের আদিবাসী ও স্থানীয় মানুষেরা এক সময়ে শাল গাছের কাণ্ড বিশেষ কায়দায় চিরে বা আঘাত করে সাদা ও আঠালো রস বা রজন সংগ্রহ করতেন। রোদে শুকোনোর পর এই রজন শক্ত ও কঠিন দানায় পরিণত হত, যা 'ধুনো' নামে পরিচিত। সাঁওতাল, কোল, মুন্ডা ও অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন ধুনো ব্যবহার করতে শুরু করেন তার ভেষজ ও সুগন্ধি গুণের জন্যই। বর্ষার স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় মশা, উইপোকা এবং ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ তাড়াতে কুটিরের চালে ও দরজায় ধুনো পোড়ানো ছিল তাঁদের দৈনন্দিন অভ্যাস।
আরও পড়ুন:
মানুষজন তখনও অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে পরিচিত নন। ভেষজ গাছগাছড়ার নির্যাসই ছিল ওষুধ। বৈদ্যেরা নিদান দিতেন, ধুপ বা ধুনোর ধোঁয়া ছড়ালে রোগমুক্তি হবে। তাই সন্ধ্যার সময়ে অনেক গৃহস্থ বাড়িতেই সন্ধ্যাদীপ দেওয়ার পাশাপাশি ধুনো পোড়ানোর চল ছিল। তা-ই পরে পুজোর অঙ্গ হয়ে ওঠে।
মুর্শিদাবাদের নবাবি আমলে ধুনো কেবল সাধারণ গৃহস্থালির সামগ্রী বা পূজার উপচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি একটি লাভজনক বাণিজ্যের অংশ হয়ে ওঠে। নবাবের প্রাসাদ, দেউড়ি এবং বেগমদের বিলাসবহুল অন্দরমহলে সুগন্ধি ছড়ানোর জন্য ধুপ ও ধুনোর ব্যাপক চাহিদা ছিল। বিশেষ করে, সুফি সাধক ও পির-ফকিরদের মাজার এবং আস্তানায় প্রতিদিন ধুনো ও লোবান জ্বালানোর রেওয়াজ ছিল।
বীরভূম ও জঙ্গলমহল থেকে সংগৃহীত ধুনো জলপথ (ভাগীরথী-হুগলি নদী) ও স্থলপথ দিয়ে মুর্শিদাবাদ এবং কলকাতার বাজারে আসত। নবাবি আমলে এই ব্যবসার উপর কড়া নজরদারিও ছিল।
১৯ শতকে কলকাতার বাবু সংস্কৃতি ও জমিদার পরিবারগুলির হাত ধরে দুর্গাপুজার জাঁকজমক বাড়ে। তখন তো আর ডিজে-র কান ফাটানো চিৎকার ছিল না। তাই ঢাকবাদ্যির তালে তালে ধুনুচি নাচ ছিলই পুজোর অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। তবে এখন ধুনুচি নাচ বা পুজোয় ধুনো দিয়ে আরতি করার চল সর্বত্রই। তা কোনও নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়।
ধুনোর সুগন্ধের মূল কারণ এতে থাকা উদ্বায়ী যৌগ। যার মধ্যে প্রধান হল টারপিন্স ও টারপিনয়েড। ধুনো পোড়ানোর সময়ে এই যৌগগুলি বাষ্পীভূত হয়ে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, এবং সুগন্ধ বার হয়।
ধুনোয় আরও একটি উপাদান আছে, যার নাম সাসকুইটারপিন্স। এটি এক প্রকার হাইড্রোকার্বন যৌগ, যা উত্তাপ পেলে কড়া সুবাস বার হয়। তা ছাড়া ধুনোয় নানা প্রকার রেজ়িন অ্যাসিড থাকে, যা তাপ পেলে ভেঙে যায় এবং ধোঁয়া ও সুগন্ধ বার হতে থাকে।
ধুনোর স্বাস্থ্যগুণও অনেক। ধুনোর অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল গুণ জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে। ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ করতেও ধুনো জ্বালানো হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ধুনোর ধোঁয়ায় ব্যাক্টেরিয়া, ছত্রাক ও নানা প্রকার অণুজীব ধ্বংস হয়। তাই ঘরের বাতাস জীবাণুমুক্ত রাখতেও এর প্রয়োজনীয়তা আছে।
মশা, মাছি, পোকামাকড় তাড়ানোর জন্য এখন যে সব স্প্রে বা কীটনাশক পাওয়া যায়, সেগুলি শরীরের জন্য ক্ষতিকর। বদলে ধুনোর সুবাসিত ধোঁয়া মশা-মাছি তাড়াতে যেমন কার্যকর, তেমনই শরীরের জন্য উপকারী।
সর্দি, কাশি এবং ফুসফুসের বিভিন্ন সমস্যায় ধুনোর ধোঁয়ার সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে প্রাচীন নানা চিকিৎসাশাস্ত্রে। ধুনোর ধোঁয়া কফ ও শ্লেষ্মা কমাতেও সাহায্য করে। শ্বাসনালি পরিষ্কার করতে পারে। অবশ্য শ্বাসকষ্ট বা হাঁপানি থাকলে, ধুনোর ধোঁয়া এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।
ধুনোর সুবাস স্নায়ুতন্ত্রের উপরেও প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ধুনোর টারপিনয়েড মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমকে উদ্দীপিত করে, যা মন শান্ত রাখতে, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা কমাতে সাহায্য করে। মনঃসংযোগ বৃদ্ধিতেও এর প্রভাব রয়েছে।
ধুনো কিন্তু ওষুধ হিসেবেও কাজ করত এক সময়ে। ধুনোর গুঁড়ো ঘি বা তেলের সঙ্গে মিশিয়ে কাটাছেঁড়া, ক্ষত পরিষ্কার, পোড়া স্থান উপশম এবং বাতের ব্যথায় প্রলেপ হিসেবে ব্যবহার করা হত।